শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কালিয়াকৈরে শিল্পাঞ্চল পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পর অনেকটায় স্বাভাবিক কর্ণফুলীতে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২-এর উদ্বোধন ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৫৩৫ অধ্যক্ষকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ইরান, গাজা, ইউক্রেনের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের মানে কী Ramayana Box Office Collection Day 1: Ranbir Kapoor, Yash’s Film Mints Rs 64.85 Crore On Opening Day | Bollywood News ‘Ordinary bowler’: Ex-India captain slams CSK’s ‘confusing’ trade, says SRH are the real winners | Cricket News শিল্পকারখানায় অস্থিরতা সৃষ্টিতে পলাতক আ.লীগের ইন্ধন রয়েছে: রিজভী মইজ্জ‍্যারটেকে আবাসিক হোটেলের আড়ালে দেহ ব্যবসার অভিযোগ ‎শ্যামনগরে লবণাক্ততা নিরসন ও কৃষি অভিযোজনবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত

সবুজ ক্যাম্পাসে জলপাই-রঙা বিভীষিকা

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: সোমবার, ২৩ আগস্ট, ২০২১
  • ৩১৬ সময় দেখুন
সবুজ ক্যাম্পাসে জলপাই-রঙা বিভীষিকা


রাহাতুল ইসলাম রাফি, ঢাবি করেসপন্ডেন্ট

২০০৭ সালের আগস্ট মাস। সারাদেশে তখন সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাজ। ক্যাম্প বসানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসেও। জলপাই-রঙা গাড়ি আর কালো বুটের শব্দে এই শান্ত শিক্ষাঙ্গন হয়ে পড়ে ভীষণ এক অনিশ্চিত ডেরা।

২০ আগস্ট বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ফুটবল ম্যাচ চলছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সঙ্গে লোকপ্রশাসন বিভাগের। পাশেই জিমনেসিয়াম। সেখানেই আস্তানা গেঁড়ে বসেছে সেনাবাহিনী। খেলার মাঝে কথা-কাটাকাটি, পরে সেনাবাহিনীর হাতে হেনস্তার শিকার কয়েকজন শিক্ষার্থী। লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে লাঞ্ছিত করেন ক্যান্টনমেন্টের ব্যারাক ছেড়ে ঢাবি ক্যাম্পাসে ক্যাম্প গেঁড়ে বসা সেনাসদস্যরা।

প্রতিবাদে রণক্ষেত্র হয়ে যায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। গ্রেফতার হন শিক্ষার্থীরা। প্রতিবাদ জানালে গ্রেফতার করা হয় শিক্ষকদেরও। আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে ২১ আগস্ট ক্যাম্পাস থেকে সেনাক্যাম্প তুলে নেয় সরকার। তবে তীব্র ক্ষোভ থেকে ২২ আগস্ট দিবাগত রাতে আটক করা হয় প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হারুন-অর রশিদকে।

২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘটিত এই শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিবছর ২৩ আগস্ট দিনটিকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোড সংলগ্ন টাওয়ার ভবন থেকে আটক হয়েছিলেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। সেই দগদগে স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।

অধ্যাপক আনোয়ার সারাবাংলাকে বলেন, ‘২২ আগস্ট দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাওয়ার বিল্ডিং থেকে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। একই সময় আমার সহকর্মী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হারুন-অর-রশীদকেও তুলে নেয়। সেনা-গোয়েন্দা দফতরে আমাদের ১২ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এসময় তারা নানানভাবে হেনস্তা করে আমাদের।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রথমবারের মতো সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে উল্লেখ করে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা এই অধ্যাপক বলেন, ‘দেশের কঠিন সংকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিল— এ বিষয়টি স্পষ্টই জানা ছিল তাদের। সে কারণে তারা শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধী অবস্থান নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে ক্যাম্প বসায়। এক পর্যায়ে খেলার মাঠে একটি ঘটনার জের ধরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করে। প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরই মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রথমবারের মতো সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে।’

এ ঘটনায় কয়েকদিন পর আরও দু’জন শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ওই সময়কার সভাপতি ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ওই সময় অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক।

আগস্ট মাসের ঘটনার পরপরই প্রথম দফায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দীন ইসলাম অ্যাঞ্জেল, রফিকুল ইসলাম সুজন, মনিরুজ্জামানসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার হয়েছিল। পরে ২২ আগস্ট দেশব্যাপী কারফিউ ঘোষণার পর সেনাশাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অনেক শিক্ষার্থীই আত্মগোপনে চলে যান।

পরে সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমেদ ঘোষণা দেন, আর কোনো শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হবে না। তবে প্রধান উপদেষ্টা তার কথা রাখেননি। ঘোষণা শুনে অনেকেই আত্মগোপন ছেড়ে বেড়িয়ে এসে গ্রেফতার হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী মানবেন্দ্র দেব ছিলেন তাদের একজন।

মানবেন্দ্র সারাবাংলাকে বলেন, প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা শুনে আমরা অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিলাম। কিন্তু ১৫/১৬ তারিখের (সেপ্টেম্বর) দিকে তাঁতিবাজারের বাসা ঘেরাও করে এক আত্মীয়কে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আমাকে গ্রেফতার করে সম্ভবত তাদের এক ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে চার দিন, পরে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় আমাকে। সামরিক বাহিনীর ইন্টারোগেশন-রিমান্ডে যেটা হয়, এই কয়দিন ব্যাপক হেনস্তা করে আমাকে। এরপর সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে ২২ জানুয়ারি শিক্ষকরা ছাড়া পান, আমরা ছাড়া পাই ২৩ জানুয়ারি।

মামলা প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘তারা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। সিএমএম কোর্টে (ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত) সেই সাজানো মামলার বিচারও সম্পন্ন করে। এক বছর সাজা দেয় আমাদের। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবার সেই সাজা মওকুফও করেন। এগুলো সবই ছিল সাজানো। মামলা, সাজা, মওকুফ— এগুলোর কিছুই আমরা গ্রহণ করিনি। তারা বুঝতে পেরেছিল, বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসন চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই তারা আমাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।’

সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ২০০৭ সালে প্রথম ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষকদের এভাবে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সবাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তারা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সামরিক শাসনবিরোধী সেই আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়— বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি প্রতিপক্ষ শক্তি হিসেবে ধরে নেয় তৎকালীন পুলিশ ও সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঢাবি শিক্ষার্থীদের আটক, হয়রানির অভিযোগ ওঠে।

ওই সময় ২২ আগস্ট তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমেদও এক ভাষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরাসরি অভিযুক্ত করেন। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে নির্যাতনের প্রতিবাদ জানানোর ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘উসকানিদাতা’ বলে সম্বোধন করেন পুলিশের তৎকালীন আইজিপি নূর মুহাম্মদ।

দেশব্যাপী সেনাশাসন ও পরবর্তী দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদ বই লিখেছেন ‘এক-এগারো বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮’ শিরোনামে। ওই সময়কার ক্যাম্পাসের ঘটনাপ্রবাহ প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে ছাত্রদের সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়। মনে হলো সরকার একটি আলাদা ফ্রন্ট খুলেছে এবং ছাত্রদের সঙ্গে সরাসরি বিবাদে জড়িয়েছে।’

হাসনাত আব্দুল হাই ‘এক এগারো অন্য জীবন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ওই কয়েকদিনের ঘটনা সম্বন্ধে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি মন্তব্য করেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের শান্ত না করে উল্টো আন্দোলন করতে উসকে দিয়েছিলেন।’

২০০৭ সালের পর প্রায় ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থী নির্যাতনের সেই ঘটনার কোনো বিচার আজও হয়নি। ওয়ান-ইলেভেনের পর নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেছিল। তবে সেই ব্যবস্থার দেখা মেলেনি আজও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, তা আমি জানি না। তবে ভবিষ্যতে যেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর এরকম ঘটনা না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করার জন্য বিচার হওয়া উচিত। এ দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্ত করতে হলেও এ ধরনের ঘটনার বিচার হওয়া উচিত।’

সারাবাংলা/আরআইআর/টিআর





Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর