রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৬ অপরাহ্ন

মুক্তির বারতা নিয়ে এলো যে দিন,১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস পালন

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: শুক্রবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ২৪৭ সময় দেখুন
মুক্তির বারতা নিয়ে এলো যে দিন,১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস পালন


মোঃ আজিজুর রহমান ভূঁঞা বাবুল, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি ::

‘৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ পাক হানাদারদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছিলো। মুক্তির বারতা নিয়ে আসা এ দিনটি ‘ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস’ হিসেবে প্রতি বছর পালন করা হয়।এবারও দিবসটি উদ্ধসঢ়;যাপন উপলক্ষ্যে শুক্রবার সকালে নগরীর ছোটবাজার মুক্তমঞ্চে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন বিভাগীয় কমিশনারশফিকুর রেজা বিশ্বাস।

পরে বণার্ঢ্য বিজয় র‌্যালী নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় ডিআইজি ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আহমার উজ্জামান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল হক খোকা সহ জেলা আওয়ামী লীগ,বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দসহ নানা শ্রেণীর পেশার মানুষ অংশ নেন। জেলা
প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আয়োজনে সন্ধ্যায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে বলেও আয়োজক সূত্র জানায়।

যেভাবে ময়মনসিংহ শত্রুমুক্ত হয়- ‘৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর এই দিনে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা শম্ভুগঞ্জ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পার
হয়ে দলে দলে শহরের সার্কিট হাউজ মাঠে জমায়েত হতে থাকে। অবরুদ্ধ শহরবাসী এ খবর পেয়ে আনন্দ উল্লাসে রাস্তায় নেমে আসে। মুহুর্তেই মধ্যেই শহর মিছিলের নগরীতে পরিনত হয়। একদিকে বিজয় উল্লাস অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনা সব মিলিয়ে দিনটি অত্যন্ত বেদনা বিধুর। তারপরও দিনটি ছিল অত্যন্ত খুশির, আনন্দের ও মুক্তির দিন। ‘৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ময়মনসিংহকে দখলমুক্ত রেখে ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ২৩ এপ্রিল পাক হানাদারদের হাতে ময়মনসিংহ বাসীর সাময়িক পতন ঘটলে মুক্তিযোদ্ধারা শহর ছেড়ে সীমান্তের ওপারে চলে যায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের
অতিথি ভবনে স্থাপন করা হয় পাক হানাদার বাহিনীর বিগ্রেড হেড কোয়ার্টার। হানাদারদের সহযোগী হিসাবে গড়ে তোলা হয় আলবদর, আল সামস, রাজাকার বাহিনী। জেলা পরিষদ ডাক বাংলোটিতে ‘শান্তি ভবন’ নাম দিয়ে টর্চার সেল ও কিলিং সেন্টার গড়ে তোলে পাক হানাদার বাহনী। ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে গড়ে তোলে আরও
২টি আস্তানা।

এছাড়াও অবাঙ্গালী বিহারিরা শহরের ছোট বাজারে গড়ে তোলে ‘কিলিং জোন’। এ সময় পাক সেনা আর রাজাকার, আল বদররা এসব আস্তাানায় বাঙ্গালী নিধনে মেতে উঠে ছিলো। প্রতিদিনের সেই নৃশংসতার নিদর্শন দেখা যেত ব্রহ্মপুত্রের চরে। মুক্তাগাছা, গৌরীপুর ও নান্দাইলের এই নৃশংসতার মাত্রা ছিল আরো ভয়াবহ। প্রায় ৭ মাস পাক সেনাদের দখলে থাকার পর নভেম্বরের শেষের
দিকে এসে প্রতিদিনই মুক্ত হতে থাকে ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলা। ‘৭১ সালের ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহে নেত্রকোনা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ অগ্রসর হয় ময়মনসিংহের দিকে।একই সময় হালুয়াঘাট, ফুলপুর হয়ে মিত্র বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের
আরেক একটি দল অগ্রসর হয় শহরে অভিমুখে। ৯ই ডিসেম্বর রাতে ২টি দল অবস্থান নেয় ব্রহ্মপুত্রের ওপারে শম্ভুগঞ্জে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর অবস্থান টের পেয়ে শহরে কারফিউ জারী করে পাক হানাদার বাহিনী। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই পাকসেনাদের পরাজয়ের ঘন্টা বাজতে শুরু হয়। তবে শত্রুদের চূড়ান্তভাবে বধ করার পরিকল্পনা আঁটা হয়েছিলো একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর।

জেলার সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট উপজেলা দিয়ে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে তখন থেকেই দিশেহারা পাকহানাদাররা। মুক্তিপাগল মানুষদের অদম্য সাহসে সীমান্ত ঘেঁষা জনপদ থেকে আক্রমণ পর্যায়ক্রমে সাফল্য পেতে থাকলো প্রতিটি উপজেলাতেই। চারদিকে বিজয়ের রণধ্বনি। পায়ের তলা থেকে ক্রমশ মাটি সরে যাওয়া শত্রুসেনারা পালাতে শুরু করলো মুক্তাগাছা উপজেলা দিয়ে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকার দিকে।

১০ ডিসেম্বর ভোরে ময়মনসিংহের মুক্তিকামী বাঙালি রচনা করলো নতুন ইতিহাস। সেই ভোরের আলো ফোটার আগেই হানাদারমুক্ত স্বাধীন ময়মনসিংহ। আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে দিয়ে ধরা দিলো আকাক্ষিত ঐতিহাসিক এক বিজয়। সবার কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান। পত পত করে বাতাসে উড়লো শহীদে রক্তে আর নির্যাতিত মা- বোনের সম্রের দামে কেনা লাল-সবুজের পতাকা।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ১১ নম্বর সেক্টরের এফ জে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট ও ৯৫ ব্রিগেডের ৫৭ মাউন্ট ডিভিশন যৌথভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চলে অবস্থানরত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা আঁটে। পরে মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ঘেঁষা উপজেলা হালুয়াঘাট দিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে দিশেহারা টিকতে না পেরে পিছু হটতে শুরু করে হানাদাররা।

৯ ডিসেম্বর পাকিস্তানীরা প্রথমে ফুলপুর ও পরবর্তীতে তারাকান্দা, শম্ভুগঞ্জ ও ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে ঢাকার দিকে পালিয়ে যেতে শুরু করে। ১০ ডিসেম্বর ভোর হবার আগেই পাকহানাদার বাহিনী ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। সেইসাথে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকার দিকে পালিয়ে যেতে থাকে পাক সেনারা। এ সুযোগে ‘৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর সকালে মুক্তবাহিনী ও মিত্রবাহিনী ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করে।

এ সময় মুক্তিবাহীনীর নেতৃত্বে ছিলেন ঢালু যুব শিবির প্রধান বীরমুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানএবং মিত্রবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন বিগ্রেডিয়ার সামস শিংহ বাবাজি। ‘৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর ময়মনসিংহ শহরের সার্কিট হাউজ মাঠে বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন বর্তমান ধর্মমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মোঃ মতিউর রহমান। মিত্রবাহিনীর কমান্ডার বাবাজির নেতৃত্বে শহরে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধারা। এভাবেই ময়মনসিংহবাসী হানাদার মুক্ত হন।
‘৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর ময়মনসিংহবাসীর জীবনে একটি অবিস্মরনীয় দিন হয়ে উঠে আজকের দিনটি।

স্বাধীনতার পরেও শহীদ পরিবারের কান্না আর দীর্ঘ শ্বাসে এখনো ভারী হয়ে আছে ময়মনসিংহবাসীর হৃদয়। এই দিনটিকে স্মরণ করে রাখতে ১৯৮৩ সালে ময়মনসিংহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ‘ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস’ হিসেবে দিনটি পালন করতে উদ্যোগ গ্রহন করেন। ওই বছরই জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের একান্ত ইচ্ছা ও দায়িত্বশীল ভুমিকায় সামরিক আমলেও ‘১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস’ পালন করতে সামর্থ হন তারা। নগরীর ছোট বাজার জিকেএমসি সাহা রোডে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল কার্যালয়ে একদিনের একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ‘ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস’ পালনের আনুষ্ঠানিক সুচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে এক আলোচনা সভায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার সেলিম সাজ্জাদ বলেন, ‘ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস’ পালনে ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসনামলে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড উদ্দোগ নেয়।

সামরিক আমলেও তৎকালীন উপ-আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক বিগ্রেডিয়ার সরদার মোঃ আলী হাসান, বিগ্রেডিয়ার এম শাখাওয়াত হোসেন, জেলা সামরিক আইন প্রশাসক লেঃ কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহমেদ ও জেলা প্রশাসক মোঃ আনসার আলী সিদ্দিকী সামরিক আইন বলবৎ থাকার পরও কোন ধরণের প্রতিবন্ধকতা না করায় আমরা ‘১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস’
হিসেবে ১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথমবারের পালন শুরু করতে পারি। এর পর থেকে প্রতি বছর প্রথমে এক দিন থেকে তিন দিন এবং পরে তিনদিন থেকে সাত দিনব্যাপী কর্মসূচীর মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। যা বর্তমানে শহরের ছোট বাজার বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা স্মরণীতে পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও এদিনটি উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আয়োজনে সাতদিন ব্যাপী কর্মসূচী পালিত হবে।

Print Friendly, PDF & Email



Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর