সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
ঢাকা: নাগরিক ব্যস্ততায় স্কুলজীবনে এক বেঞ্চে দিনের পর দিন বসে থাকা বন্ধুটির সঙ্গেও দূরত্বটা যোজন যোজন। প্রযুক্তির সুবাদে মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপে সেই দূরত্ব ঘুচানোর প্রয়াস। তাতে সাধ মেটে না। ফেসবুক প্রোফাইল ফটোতে বন্ধুর মুখটা ভেসে ওঠে। কিন্তু তাতে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলার তৃপ্তিটা খুঁজে পাওয়া যায় না। কাঁধে হাত রেখে বন্ধুকে বলা যায় না, কী খবর বল? ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো আড্ডার সময়টুকুর যে অতীত, তার সঙ্গে দূরত্বটাও যে বেড়েই চলে। অজান্তেই অস্ফূট স্বরে মন বলে ওঠে— ‘আমাদের যেদিন গেছে, তা কি একেবারেই গেছে!’
না, সেদিন একেবারেই যায়নি, সেদিন একেবারেই যায় না। বন্ধুত্বের টান সব বাঁধা উপেক্ষা করেই বন্ধুকে নিয়ে আসে কাছে। কুমিল্লা জিলা স্কুলের এসএসসি ‘৯৯ ব্যাচের বন্ধুরাও বাস্তবতার প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই এক হলো। দেখা হলো, কথা হলো, আড্ডা হলো, হলো খুনসুটি। আলিঙ্গনে জানানো গেল, বন্ধুত্বের বাঁধন ছিন্ন করার নয়। সুমন-অঞ্জনের সেই ধ্রুপদী গীতিকবিতার মতোই অনুচ্চারিত হয়েও যেন বেজে উঠল— ‘অনেকদিন পর আবার চেনা মুখ/ বন্ধু কী খবর, মুহূর্ত বলুক…’।
শুক্রবার (১২ নভেম্বর) কুমিল্লা জিলা স্কুল প্রাঙ্গণে এমনই এসএসসি ‘৯৯ ব্যাচের বন্ধুদের চেনামুখের মেলা বসেছিল। দিনভর সে মিলনমেলায় ঘুরেফিরে এসেছে কৈশোরের সেই ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ। প্রিয় বন্ধুকে দীর্ঘদিন পর কাছে পাওয়ার আনন্দে চোখের কোণে জমেছে অশ্রু।
বন্ধুদের মিলনমেলা হলেও তাতে সঙ্গী হয়েছিলেন জীবনের পথে বেড়ে ওঠার পাঠ দেওয়া শিক্ষকরাও। অনির্বাণ আলোকশিখা ছড়িয়ে যাওয়া এই বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষকরাও প্রিয় শিক্ষার্থীদের কাছে পেয়ে কম স্মৃতিকাতর হননি। তাদের প্রাণবন্ত আলোচনায় তারা আজও ছড়িয়েছেন আলোর শিখা।
১৯৯৯ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা বন্ধুরা বর্তমানে নানা পেশায় কর্মরত দেশের বিভিন্ন স্থানে। পুনর্মিলনীর এই উৎসবে বন্ধুদের সঙ্গে যোগ দিতে এ দিন সকাল ৮ টা থেকে স্কুল প্রাঙ্গণে আসা শুরু হয়।
ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে কৈশোরের পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে একত্রিত হয়ে স্কুল প্রাঙ্গন থেকে একটি র্যালি শুরু করা হয় সকাল ৯টায়। বন্ধুদের হাতে হাত রেখে শুরু হওয়া র্যালিটি শহরের বিভিন্ন স্থান প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসে স্কুল প্রাঙ্গণেই৷
ব্যস্ত কর্মজীবনের সকল ক্লান্তি ভুলে কৈশোরের বন্ধুদের সঙ্গে নতুন করে কাটানো সময় ক্যামেরাবন্দী করে রাখতে সবাই ছিলেন ব্যস্ত। স্কুল জীবনের গন্ডি পার হওয়ার পরে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্বের এক একটা পরিচ্ছেদকে আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় ও স্মৃতিচারণে কাটে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব।
সকাল ১১ টায় পুনর্মিলনী অনুষ্টানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করা হয়। স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষকদের উপস্থিতিতে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে এই পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। । এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাশেদা আক্তার। ১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মাঝে যারা প্রাণ হারিয়েছে তাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এই পর্বে।
স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী তুষার রাজীব ও সৈকত ভৌমিকের সঞ্চালনায় কেক কেটে শুরু করা হয় আলোচনা সভা। এ সময় স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সহকারি প্রধান শিক্ষক আবদুল হাফিজ, মোসলেউদদিন, খগেন্দ্র বাবু, ওয়াহাব তাজুল ইসলাম, রিক্তা বড়ুয়াসহ অন্যান্যরা।
পুরনো দিনের স্মৃতিচারণসহ শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন শিক্ষকরা৷ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন শরিফ মাহবুব।
দিনের শেষভাগে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
দিনের শেষভাগে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয় আয়োজকদের। একই সঙ্গে যারা এবার নানা কারণে উপস্থিত থাকতে পারেনি তাদের সঙ্গে নিয়ে পরবর্তী পুনর্মিলনী উৎসব আয়োজন করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
সারাবাংলা/এসবি/টিআর