বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
টঙ্গীবাড়ী ইসলামী ব্যাংকের স্কুল ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত ঢাকার বার্তা মোদিকে জানাতে দিল্লি গেলেন দীনেশ ত্রিবেদী চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গুতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৮৪ ২০২৭ সাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বিষয় Bigg Boss 20’s ScoutOP Hints At Feelings For ‘Sister’ Love Gill: ‘Usse Pehle Friend Hota Hai Naa…’ | Television News Head coach Zinedine Zidane celebrates first home win as France crush Belgium 4-1 at Nations League | Football News কর্ণফুলীতে ডেঙ্গু পরীক্ষার কীট ও মশক নিধন সামগ্রিক বিতরণ কূটনীতিকদের সম্মানে খেলাফত মজলিসের নৈশভোজ কর্ণফুলীতে এস আলম গ্রুপের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে অবৈধ দখল উচ্ছেদ কর্ণফুলীতে বিতর্ক উৎসবের উদ্বোধন, দিনব্যাপী কর্মশালা সম্পন্ন ‘আজকের বিতার্কিকরাই আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে’

বকশীবাজার খানকাহ: পুরান ঢাকার সুফি ঐতিহ্যের জীবন্ত স্মারক

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৬৬৯ সময় দেখুন
বকশীবাজার খানকাহ: পুরান ঢাকার সুফি ঐতিহ্যের জীবন্ত স্মারক

পুরান ঢাকার ইতিহাস মানেই কেবল জীর্ণ প্রাসাদের সারি নয়, বরং এর প্রতিটি অলিগলিতে মিশে আছে এক গভীর আত্মিক আভিজাত্য| ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে ঢাকা যখন একটি নতুন প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, তখন থেকেই বকশীবাজার এলাকাটি সুফি সাধনা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক মহিমান্বিত কেন্দ্রে পরিণত হয়| তখনকার ঢাকার চিত্রটি ছিল আজকের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন—সরু গলির মাথায় খোলা উঠান, পুরনো দালানের ছাদে বিকেলের আড্ডা, আর বাতাসে ভেসে আসা উর্দু ও ফার্সি নাতের সুর| বইয়ের পাতায় পড়া সেই ইতিহাস যখন নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মেলাতে যাই, তখন বকশীবাজার খানকাহর (ফকির জহুরুল হক মোবারকী) গুরুত্বটি আরও প্রখর হয়ে ধরা দেয়|
এই ঐতিহ্যের প্রাণপুরুষ ছিলেন হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী আল-ক্বাদরী (রহ.)| তিনি কেবল একজন সুফি সাধকই ছিলেন না, বরং একাধারে শায়ের, প্রখ্যাত বাগ্মী এবং বহুভাষাবিদ ছিলেন| উর্দু, ফার্সি ও আরবি ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁকে সে সময়ের সুধী মহলে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল| তাঁর রচিত ‘গজলামে হারাম’ কাব্যগ্রন্থটি আজও সুফি সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত| ১৯৪৮ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফরের সময় রেসকোর্স ময়দানে তাঁর নাত পাঠ এবং রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আল্লামা ইকবালের কালাম আবৃত্তি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে| তাঁর সেই সুমধুর কণ্ঠ ও কাব্যপ্রতিভার কারণে তাঁকে ‘বুলবুল-এ-বাঙাল’ বা বাংলার বুলবুল উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল| ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত নন্দ কুমার দত্ত রোডের সেই বিখ্যাত মোশায়েরা বা কবিতা পাঠের আসরগুলো ছিল ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র|
সময়ের বিবর্তনে আধুনিক ঢাকার বুক থেকে সুফি ঐতিহ্যের সেই জৌলুস আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে| প্রযুক্তির দাপটে মানুষ যখন আত্মিক সংযোগ হারিয়ে ফেলছে এবং আজিমপুর দায়রা শরীফের মতো অনেক ঐতিহাসিক স্থান যখন সময়ের স্রোতে অনেকটা থমকে গিয়েছে, সেখানে বকশীবাজার খানকাহ এক জীবন্ত ও প্রাণবন্ত ব্যতিক্রম| পাকিস্তান আমল থেকে শুরু হওয়া জাঁকজমকপূর্ণ ধর্মীয় সুফি আসরগুলো আজও এখানে বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি| বিশেষ করে বর্তমান গদ্দীনশীন শাহ সুফি সাঈদ আনওয়ার মোবারকীর একান্ত উদ্যোগ ও নিষ্ঠা এক কথায় বিস্ময়কর| আজকের এই যান্ত্রিক শহরে এমন দরবার খুঁজে পাওয়া ভার, যেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও নিজস্ব তহবিল থেকে বিশাল খরচ বহন করে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়| প্রতিদিন ৫০০০ বার দরুদ পাঠ এবং মাসিক ‘গিয়ারবী শরীফ’-এর মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে বিনামূল্যে খাওয়ানোর পাশাপাশি সুফি ঐতিহ্যকে তার স্বকীয়তায় টিকিয়ে রাখা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক বিশাল ও বিরল দৃষ্টান্ত|
আমার দেখা এই খানকাহর পরিবেশে আজও সেই হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী (রহ.)-এর রেখে যাওয়া রুহানি প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যায়| এটি কেবল একটি সুফি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ১৯৪৭ থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিস্তৃত ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক জীবন্ত সাক্ষী| ইতিহাস পাঠকদের জন্য এটি এক অনন্য গবেষণার কেন্দ্র, কারণ যেখানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক দরবার আজ নীরব, সেখানে বকশীবাজার খানকাহ আজও তার আধ্যাত্মিক মশাল জ্বেলে ঢাকার প্রকৃত পরিচয়কে আগলে রেখেছে| হাফেজ জহুরুল হক মোবারকীর সেই ঐতিহ্যকে সাঈদ আনওয়ার মোবারকী যেভাবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে রেখেছেন, তা আমাদের জাতীয় স্বকীয়তা রক্ষার এক শক্তিশালী হাতিয়ার|

কায়ছার উদ্দিন আল-মালেকী
কলামিস্ট ও গবেষক

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর