খায়রুল খন্দকার, টাঙ্গাইল :টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দিলশাদ, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনির ও গ্রাম পুলিশের যোগসাজশে সরকারি ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি বা VWB) প্রকল্পের চাল অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় কিছু ভিডিও চিত্র গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে এলে তা আমলে নিয়ে দ্রুত চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুব হাসান।
জানা গেছে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ভিডব্লিউবি প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি কার্ডধারী সুবিধাভোগী ৩০ কেজি করে চাল পান। গত ২৯ জুলাই বুধবার দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী অর্জুনা ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখতে পান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন থেকেই চালের বস্তা স্থানীয় ব্যবসায়ী ইউসুফের লোকজন ভ্যানে করে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।
এ সময় ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ইউপি সদস্য মনির, গ্রাম পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন উপস্থিত থাকলেও চাল সরিয়ে নেওয়া বন্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে মুঠোফোনে প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দিলশাদ ও ট্যাগ অফিসার সৈয়দ মনিরুজ্জামানকে বিষয়টি জানানো হলে তারাও তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা নির্দেশনা দেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে নাটকীয় ভাবে ১৩ বস্তা চাল জব্দ করে ব্যবসায়ী ইউসুফকে ইউনিয়ন পরিষদে আটক রাখা হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, ততক্ষণে প্রায় ১০০ বস্তা চাল গোপালপুর উপজেলার একটি গ্রামে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সুবিধাভোগীদের ছবি বিহীন কার্ড ব্যবহার করে চাল বিতরণ না করে অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত তা শনাক্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা যাতে নিয়ম অনুযায়ী তাদের বরাদ্দের চাল পান, তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় রেজাউল করিম ও কুদ্দুস মিয়াসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, সরকার অসহায় নারীদের জন্য যে চাল বরাদ্দ দিয়েছে, সেটি কোনোভাবেই অনিয়ম বা অবৈধভাবে বিক্রির সুযোগ নেই। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
চাল কেনার বিষয় স্বীকার করে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী ইউসুফ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ সংশ্লিষ্টদের অনুমতি নিয়েই কয়েকটা চালের বস্তা কিনেছি এবং সেগুলো গ্রাম পুলিশরাই সাথে থেকে কিনে দিচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয় অস্বীকার করে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মনির বলেন, চাল বিক্রির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ঘটনাটি নিয়ে করা অভিযোগ সঠিক নয় ও কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।
এদিকে প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দিলশাদ ও ট্যাগ অফিসার সৈয়দ মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকর্মীদের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের কাজে বিভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা সহ হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযুক্ত প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দিলশাদ বলেন, তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সঠিক নয়। ঘটনার সময় তিনি পরিষদে উপস্থিত ছিলেন না এবং চাল কোথায় কীভাবে গেছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
সাংবাদিকদের ম্যানেজ চেষ্টার বিষয় অস্বীকার করে ট্যাগ অফিসার পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্মকর্তা সৈয়দ মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি সরকারি দায়িত্ব অনুযায়ী ভিডব্লিউবি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। চাল অবৈধভাবে বিক্রি বা সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব হাসান বলেন, ঘটনাটি নজরে আসার পরে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুতই তদন্ত কমিটি সরেজমিনে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।