ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গ্রাম ছতুরা কেবল একটি জনপদের নাম নয়; এটি জ্ঞান, সাধনা, নেতৃত্ব ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল স্মারক। এই পুণ্যভূমিতেই ১৮৯২ সালে জন্মগ্রহণ করেন পাক-ভারত উপমহাদেশের সুপ্রসিদ্ধ শিক্ষাবিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ, সুফিতত্ত্ববিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রখ্যাত ওলী হযরত মাওলানা অধ্যাপক আব্দুল খালেক এম.এ. (রহ.)।
তিনি ইসলামি শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষায়ও অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৫ সালে ভাষা বিষয়ে দুটি এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দুবার স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য তাঁকে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্বানে পরিণত করেছিল।
কর্মজীবনে তিনি ফেনী কলেজে ফারসি বিভাগের অধ্যাপক ও হোস্টেল সুপারিন্টেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক ও উপাধ্যক্ষ, কলকাতা লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে অধ্যাপক এবং দেশভাগের পর ঢাকার বদরুন্নেছা মহিলা কলেজে অধ্যাপক ও পরবর্তীতে ইডেন মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশের একাধিক শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর শিক্ষাদান, গবেষণা ও প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁকে শিক্ষাজগতে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে তাঁর জীবন কেবল শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাপ্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৪৬ সালের কলকাতার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টেইলর হোস্টেলের ছাত্রদের রক্ষায় অসাধারণ সাহস, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার পরিচয় দেন, যা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে। চারদিকে যখন আতঙ্ক, হত্যা ও অরাজকতা ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তিনি নির্ভীকভাবে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাঁর এই সাহসিকতার প্রতিফলন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তেও পরোক্ষভাবে প্রতীয়মান হয়। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে তিনি কেবল একজন বিদ্বান অধ্যাপক ছিলেন না; সংকটকালে মানবতার সেবায় আত্মনিবেদিত এক নির্ভীক নেতাও ছিলেন।
রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর দেশটির সংবিধানকে ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নানামুখী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল ১৯৪৯ সালের ১২ মার্চ পাকিস্তান গণপরিষদে ‘অবজেক্টিভস রেজোলিউশন’ পাস হওয়া। এই রেজোলিউশনের আলোকে শরিয়াহ আইন ও ইসলামি মূলনীতির যথার্থ প্রতিফলন নিশ্চিত করতে ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে গণপরিষদের ‘মৌলিক নীতি কমিটি’র অধীনে ‘বোর্ড অব তালিমাতে ইসলামিয়া’ নামক একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সরকারি উপদেষ্টা বোর্ড গঠিত হয়। তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ইসলামি চিন্তাবিদ হিসেবে অধ্যাপক আব্দুল খালেক এম.এ. (রহ.)-কে এই ঐতিহাসিক বোর্ডের অন্যতম সম্মানিত সদস্য মনোনীত করা হয়। সমসাময়িক আলেম ও গবেষকদের মধ্যে তিনি বিশেষভাবে স্বতন্ত্র ছিলেন, কারণ তিনি ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক উচ্চশিক্ষায়ও সমানভাবে দীক্ষিত ছিলেন।
এই বোর্ডে তিনি পাকিস্তানের গ্র্যান্ড মুফতি মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফি, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আল্লামা সৈয়দ সুলায়মান নদভী, মাওলানা জাফর আহমদ উসমানি এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর মতো উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় মনীষীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এই বোর্ডে থাকাকালে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের যোগ্যতা নির্ধারণ, আইনসভার রূপরেখা প্রণয়ন, শাসনব্যবস্থার ইসলামীকরণ এবং কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী আইন প্রণয়ন রোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক সুপারিশমালা তৈরিতে সরাসরি অবদান রাখেন। পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি এই মহান মনীষীর সুপারিশসমূহের পরোক্ষ প্রভাব পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে প্রতিফলিত হয়েছিল। এই বোর্ডে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি পরিবারসহ পাকিস্তানের করাচি শহরে বাস করতেন।
১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলন-এও তিনি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সচেতন ভূমিকা পালন করেন এবং মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে নৈতিক ও চিন্তাগত সমর্থন প্রদান করেন।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চল থেকে এম.এল.এ. পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীকে বিপুল ভোটো পরাজিত করেন। শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতি ও ধর্মীয় অঙ্গনে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে সমকালীন সমাজে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।
অধ্যাপক আব্দুল খালেক (রহ.) কেবল একজন শিক্ষাবিদ, সুফি ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ লেখক ও সীরাত-গবেষকও। বাংলা ভাষায় রচিত তাঁর বিখ্যাত সীরাতগ্রন্থ ‘সাইয়েদুল মুরসালীন’ দীর্ঘদিন ধরে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়ে আসছে। রাসূলে কারীম (সা.)-এর জীবনাদর্শকে সহজ, প্রাঞ্জল ও গবেষণামূলক ভাষায় উপস্থাপন করায় গ্রন্থটি বাংলা সীরাতসাহিত্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
তাঁর জ্ঞান, চরিত্র ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে বহু সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত মানুষ তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন তাঁর অন্যতম মুরিদ। একসময়ের বামপন্থী এই কবি অধ্যাপক সাহেবের সঙ্গে ধর্ম বিষয়ে ইংরেজিতে দফায় দফায় দীর্ঘ তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধ্যাপক সাহেবের অকাট্য যুক্তি, গভীর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের কাছে নতিস্বীকার করে বিনয়াবনত চিত্তে তাঁর হাতে মুরিদ হন। অধ্যাপক আব্দুল খালেক (রহ.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে কবি ফররুখ আহমদ তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সিরাজাম মুনীরা’ তাঁকে উৎসর্গ করেন। পরবর্তীকালে ফররুখ আহমদ বাংলা ইসলামি সাহিত্যকে যে উচ্চতায় নিয়ে যান, তার পেছনে অধ্যাপক আব্দুল খালেক (রহ.)-এর প্রভাব বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত্তি ছিল তরিকতের খেদমত ও আত্মশুদ্ধির সাধনা। তিনি ছিলেন হযরত শাহ সুফি মাওলানা ছদরুদ্দীন আহমদ শহীদ (রহ.)-এর খলিফা ও প্রিয় শিষ্য। হযরত ছদরুদ্দীন আহমদ (রহ.) ছিলেন ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে জামান হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর অন্যতম খলিফা এবং ইংরেজি, উর্দু ও ফারসি ভাষার সুপণ্ডিত।
কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার সময় অধ্যাপক আব্দুল খালেক (রহ.) সপরিবারে সেখানে বসবাস করতেন। সেই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, ব্রিটিশ নাগরিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, গবেষক ও কবি-সাহিত্যিকদের অবাধ বিচরণ ছিল। সেই শিক্ষিত সমাজে ইসলামি আদর্শ, আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্যই তাঁর পীর হযরত শাহ সুফি মাওলানা ছদরুদ্দীন (রহ.) স্বয়ং কলকাতার খানকায় উপস্থিত হয়ে মুজাদ্দিদে জামান হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর নিকট তাঁর এই প্রিয় শিষ্যকে উপস্থাপন করেন। তাজদিদের কাজে অধ্যাপক সাহেবের অতুলনীয় যোগ্যতা অনুধাবন করে মুজাদ্দিদে জামান তাঁকে বায়আত করান এবং খেলাফতের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন।
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জওহরলাল নেহেরু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধুখ মুজিবুর রহমান, খাজা নাজিমুদ্দিন, লিয়াকত আলী খান, শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম এবং জেনারেল আইয়ুব খানসহ পাক-ভারত উপমহাদেশের বহু শীর্ষস্থানীয় নেতা, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব ও আধ্যাত্মিকতার যে অপূর্ব সমন্বয় তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল, তা তাঁকে সমকালীন সমাজে এক অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।
১৯৫৫ সালে তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর সুযোগ্য সন্তান হযরত শাহ সুফি পীরজাদা মোবাশ্বার আহমদ কাউছার (রহ.) এই আধ্যাত্মিক খেদমতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন। পরবর্তীতে তাঁর সুযোগ্য পুত্র বিশিষ্ট সুফি সাধক, শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ী পীরজাদা আশেক হোসেন সাহেব সেই দায়িত্ব আরও বিস্তৃত পরিসরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
এই ঐতিহ্যের আধুনিক ও যুগোপযোগী রূপ হলো ‘ছতুরার নূর’—একটি সাপ্তাহিক তালিম ও জিকির মাহফিল। প্রতি সোমবার বাদ মাগরিব থেকে বাদ এশা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই মাহফিল আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষী মানুষের কাছে শরিয়ত, তরিকত, মারিফত ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছে। ফেসবুক লাইভসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রায় আট লক্ষ মানুষ এই মাহফিলের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে তালিম, জিকির ও আধ্যাত্মিক চর্চায় অংশগ্রহণ করেন।
‘ছতুরার নূর’ কেবল একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান নয়; এটি ছতুরার মাটি থেকে উৎসারিত শতবর্ষব্যাপী জ্ঞান, তাজদিদ, আধ্যাত্মিকতা, মানবকল্যাণ ও দ্বীনি খেদমতের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার। হযরত মাওলানা অধ্যাপক আব্দুল খালেক এম.এ. (রহ.)-এর জীবন, কর্ম, ত্যাগ, জ্ঞান, রূহানিয়াত ও মানবপ্রেমের যে দীপ্ত উত্তরাধিকার যুগে যুগে মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে আছে, ‘ছতুরার নূর’ সেই আলোরই আধুনিক প্রতিচ্ছবি।
কলামিস্ট ও গবেষক: কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী