শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০৯:০০ অপরাহ্ন

মাজমাউল বাহরাইন মুফতী আব্দুল গণি: কিতাবের ধূলিকণা থেকে আরশের নূর

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬২৮ সময় দেখুন
মাজমাউল বাহরাইন মুফতী আব্দুল গণি: কিতাবের ধূলিকণা থেকে আরশের নূর

(গবেষক ও কলাম লেখক: কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী)

নূরানী ইলমি নক্ষত্র: আউয়াল ছাহেব হুজুর
চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের পুণ্যভূমি থেকে উদিত এক ইলমি নক্ষত্র, যাঁর জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে মিশে আছে কঠোর সাধনা, আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং প্রিয় হাবীবের প্রতি অশেষ মুহাব্বত| জাগতিক ক্ষুধাকে তুচ্ছ মনে করে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কিতাবের ধূলিমলিন পাতার গভীরে মাশুকের দিদার খোঁজার এক কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেন—সেই দুষ্কর সফরের এক সার্থক মঞ্জিলে ছিলেন ‘মাজমাউল বাহরাইন’ হযরতুল আল্লামা শাহ&& সুফি আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.)| মুফতীয়ে আজম হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি, কিন্তু হৃদয়ের আভায় সকলের মুখে গুঞ্জরিত নামটি ছিল একনামে—আউয়াল ছাহেব হুজুর| তাঁর ধমনীতে যেমন প্রবাহিত ছিল উচ্চ বংশীয় আভিজাত্যের খুশবু, তেমনি তাঁর সিনায় সিক্ত ছিল ভারতের ইলমি কাননের সৌরভ এবং ফুরফুরার মুজাদ্দিদে জামানের সোহবতে প্রাপ্ত নূরি চিরাগের আলো| তিনি কেবল কিতাবি পাণ্ডিত্যের ধারক ছিলেন না; বরং ছিলেন শরীয়তের কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ এক মারেফতের মুক্ত বিহঙ্গ| তাঁর কাছে শরীয়তের প্রতিটি বিধান ছিল তৃষ্ণার্থ রুহের অমৃত সুধা, আর তরিকতের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল আরশের নূরের পানে এক এক ইশকির উড্ডয়ন| মীরসরাইয়ের নিভৃত জনপদ থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা ভারতের ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ মি¤^র হয়ে ফুরফুরার আধ্যাত্মিক খানকায় গিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে| মাদ্রাসার দরসগাহ থেকে শুরু করে হাজারো তালিবে মারেফতের হৃদয়ে হিদায়াতের চেরাগ জ্বালানো এই মহান রাহবারের খিদমত আজ ইতিহাসের এক সুমহান দাস্তান, যা শুরু হয়েছিল কিতাবের শুকনো অক্ষরের কঠোর মুজাহাদা থেকে এবং মিলেছে গিয়ে আধ্যাত্মিকতার পরম শিখরে|
জন্ম ও আভিজাত্যের নূরি শেকড়:
১৮৬৪ সালের ৫ই জুলাই| চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই উপজেলার ইছাখালী মৌজার বাঁশখালী গ্রামের এক পুণ্যময় ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন এই ক্ষণজন্মা রূহের মুসাফির| তাঁর পিতা মাওলানা শেখ করম আলী ভূঁইয়া ছিলেন এক নিষ্ঠাবান দ্বীনি পুরুষ| ১৯১৯ সালের এক ঐতিহাসিক পারিবারিক দলিল সাক্ষ্য দেয়, তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত ছিল সুপ্রসিদ্ধ ‘শেখ বংশের’ সুমহান আভিজাত্যের খুশবু|
ইলমি সফর: মারেফতের অšে^ষণে এক রূহের মুসাফির
ˆশশবেই পিতৃচ্ছায়া হারানো সেই নূরানী মেধার বালকটি বুঝতে পারেননি—তাঁর কপালে লেখা আছে আরশের নূরের অনন্ত সন্ধান| দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ছায়া সরে গেলে, আল্লাহ তাআলা তাঁর অন্তরে জ্বালিয়ে দেন ইলমের প্রদীপ| মাওলানা মোবারক আলী (র.) ও মাওলানা শাহ& গোলাম রহমান (র.)-এর স্নেহময় তরবিয়তে মক্তবের প্রাথমিক পাঠ সমাপ্ত করে তিনি প্রবেশ করেন ইলমের গহীন দরিয়ায়—যেখানে প্রতিটি ঢেউ যেন হক্কের ইশারা বহন করে| মাওলানা আবদুস সোবহান (র.)—যাঁর স্নেহময় তত্ত্বাবধানে ঐতিহ্যবাহী ‘আকরামিয়া মাদ্রাসা’য় শিক্ষালাভ ছিল যেন এক রূহানী সফরের সূচনা| মাদ্রাসাটি কেবল বাঁশ, বেড়া ও ছাউনির নির্মাণ ছিল না; এটি ছিল এক নূরানী সিলসিলার প্রাণবন্ত প্রতিফলন, যেখানে আলেম, মুরীদ ও রূহের আলো একত্রিত হয়| এর প্রতিষ্ঠাতা ¯^য়ং মাওলানা আবদুস সোবহান (র.)—যিনি তাঁর পিতা মাওলানা আকরাম আলী (রহ.)-এর নামানুসারে এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, পিতার ইলমি, জিহাদি ও রূহানী উত্তরাধিকারের প্রতি গভীর মহব্বত ও ইখলাসের নিদর্শন হিসেবে| মাওলানা আকরাম আলী (রহ.)—তিনি ছিলেন গাজীয়ে বালাকোট, ঈমানি শৌর্য, ত্যাগ ও বীরত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক; যার জীবন ইতিহাসের বুকে আজও দীপ্তিময় নূরের রেখা হয়ে জ্বলজ্বল করছে| আর তাঁর পীর ও মুরশিদ ছিলেন শায়খুল হাদিস শাহ& সুফি নূর মুহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.)—যাঁর সোহবতের নূরে সিক্ত হয়ে আকরাম আলী (রহ.)-এর অন্তর হয়ে উঠেছিল ইখলাস, তাওয়াজ্জুহ ও মারেফতের এক জীবন্ত দরিয়া| এই পীর-মুরীদের নূরানী সম্পর্কই যেন প্রমাণ করে—যখন সঠিক সোহবত লাভ হয়, তখন একজন সালিক কেবল আলেমই হন না; বরং হয়ে ওঠেন হক্কের পথে এক অটল মুজাহিদ, যার ত্যাগ ও বীরত্ব যুগে যুগে উম্মাহকে পথ দেখায়| সেই নূরানী বংশধারা, সেই ত্যাগ ও ইখলাসের উত্তরসূরি মাওলানা আবদুস সোবহান (র.)-এর হাতে এই কিশোরের ইলমের ভিত এমনভাবে পোক্ত হয়ে ওঠে, যেন একটি কোমল চারাগাছ ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক ছায়াময় বৃক্ষে—যার শাখা-প্রশাখা একদিন অগণিত তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের জন্য হয়ে উঠবে স্নিগ্ধ প্রশান্তির আশ্রয়, আর যার মূল গেঁথে থাকবে ইখলাস, ইলম ও হকের গভীর মাটিতে| এরপর তিনি মীরসরাইয়ের ঐতিহাসিক ‘মিঠাছড়া ফয়েজে আম’ মাদ্রাসায় পদার্পণ করেন—যেখানে ইলম কেবল পাঠ্য ছিল না, বরং ছিল রহমতের উন্মুক্ত দরিয়া| ১৮৮১ সালে মাওলানা সাজেদুল্লাহ (রহ.)-এর হাতে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যাপীঠ ধীরে ধীরে ‘ফয়েজে আম’—অর্থাৎ সর্বসাধারণের জন্য কল্যাণের স্রোতধারা—হিসেবে পরিচিতি লাভ করে| এখানেই তিনি দরসে নিজামীতে কৃতিত্বের সাথে পাঠ সমাপ্ত করেন; তাঁর অন্তরে তখন ইলমের পাশাপাশি জন্ম নেয় হিকমতের দীপ্ত আলো| এরপর তাঁর পদচারণা পৌঁছে যায় তৎকালীন বাংলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ‘কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা’য়—যেন ইলমের আরেক দিগন্ত উন্মোচিত হলো তাঁর সামনে| ১৮৯৩-১৮৯৬ সালে তিনি ‘দরসে নিজামী’ পাঠ্যক্রমে তিন বছরের নিবিড় সাধনার পর ‘ফাজিল’ ডিগ্রি অর্জন করেন| সে সময় মাদ্রাসার শিক্ষা ও প্রশাসনিক নেতৃত্বে ছিলেন প্রখ্যাত আলেম মাওলানা বেলায়েত হোসেন, মাওলানা নজির আহমদ, আল্লামা ইয়াহইয়া, মাওলানা ইসমাঈল এবং ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ এ. এফ. আর. হোর্নেল|
তাঁর ছাত্রাবস্থাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ‘এলিয়ট হোস্টেল’—যা ছিল তৎকালীন মুসলিম ছাত্রদের জন্য এক নূরানী আশ্রয়স্থল| সেখানে মানতিক (তর্কশাস্ত্র), হিকমত (দর্শন), ফিকহ (ইসলামি আইন) এবং আরবি সাহিত্যের কঠিন পাঠ তাঁর অন্তরকে শুদ্ধ করত, মননকে প্রসারিত করত| কঠোর সাধনা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন এমন এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বে, যাঁর ইলম ছিল আলো, আর আমল ছিল তার প্রতিফলন| ১৮৯৬ সালের সেই প্রাতিষ্ঠানিক ¯^ীকৃতি তাঁর ভবিষ্যৎ খেদমতের এক দৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে দাঁড়ায়| ইলমের পিপাসা তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি| ১৮৯৭ সালে তিনি পা রাখেন দিল্লির ঐতিহাসিক ‘মাদ্রাসা আমিনিয়া’য়—যেখানে ইলম আরও সূক্ষ্ম, আরও গভীর রূপে আত্মপ্রকাশ করে| এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা আমিন উদ্দিন দেহলভি (রহ.)| সেখানে তিনি দুই বছর তথা ১৮৯৭-১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ উচ্চতর ধ্রুপদী শিক্ষায় নিমগ্ন থাকেন—আরবি সাহিত্য, বালাগাত, ফিকহের জটিল মাসায়েল ও মানতিকের গভীর অনুশীলনে| এই সময় তিনি লাভ করেন মহান ওস্তাদদের সান্নিধ্য—মাওলানা আমিন উদ্দিন দেহলভি (রহ.), মুফতি কেফায়েতুল্লাহ দেহলভী, মাওলানা হাবীবুল মুরছালিন এবং বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ& কাশ্মীরি (রহ.)-এর মতো মনীষীদের সরাসরি তত্ত্বাবধান| তাঁদের দরসে বসে তিনি কেবল ইলম অর্জন করেননি; বরং হৃদয়ে ধারণ করেছেন ইখলাস, তাওয়াজ্জুহ ও রূহানিয়াতের সূক্ষ্মতম শিক্ষা| দিল্লির পাঠ চুকিয়ে ১৮৯৯ (প্রথমার্ধ) সালে তিনি যাত্রা করেন ইলমের শীর্ষ শিখরের দিকে—দারুল উলুম দেওবন্দে| সেখানে তিনি হাদিসের মহাসাগরে নিমজ্জিত হয়ে সিহাহ সিত্তাহর ওপর উচ্চতর ইজাজত লাভ করেন এবং একজন পূর্ণাঙ্গ মুহাদ্দিস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন| এই পর্যায়ে তিনি শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহ.), মাওলানা রিয়াজ উদ্দীন, মাওলানা আজিজুর রহমান (রহ.) এবং মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.)-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে ইলমে হাদিসের অমূল্য রত্ন আহরণ করেন| যদিও হাকিমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর শ্রেণিকক্ষের সরাসরি ওস্তাদ ছিলেন না, তবুও তাঁর রূহানী ফয়েজ ও আধ্যাত্মিক দর্শন মাওলানা আবদুল গণি (রহ.)-এর অন্তরজগতে গভীর ছাপ রেখে যায়| তৎকালীন প্রথা ছিল—দারুল উলূম দেওবন্দের ছাত্র ও নবীন উলামায়ে কেরাম কেবল কিতাবি ইলমেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতেন না; বরং তারা রূহানিয়াতের তৃষ্ণা মেটাতে ছুটে যেতেন থানভবনের নূরানী মজলিসে| হযরত থানভী (রহ.)-এর দরবার ছিল যেন ইলম ও মারেফতের এমন এক সাগর, যেখানে জ্ঞানপিপাসু হৃদয়গুলো প্রশান্তির ঠিকানা খুঁজে পেত| শায়খুল হিন্দের এই সৌভাগ্যবান ছাত্র—মাওলানা আবদুল গণি (রহ.)—ও সেই রূহানী রীতির অনুসারী হয়ে নিয়মিত শরিক হতেন ঐ মজলিসে| তিনি লাভ করতেন হযরত থানভী (রহ.)-এর নূরানী সোহবত, তাওয়াজ্জুহ ও অন্তরশুদ্ধির সূক্ষ্ম শিক্ষা| এই যাতায়াত কেবল আনুষ্ঠানিক ছিল না; বরং তা ছিল এক অন্তর্গত রূহানী সংযোগ—যেখানে তাঁর হৃদয়ে কিতাবি ইলম ও আমলের নূর এমনভাবে একত্রিত হয়, যেন জ্ঞানের আলো ইখলাসের সুবাসে পূর্ণতা লাভ করে| এ ছিল কেবল একটি শিক্ষাজীবন নয়—এ ছিল এক রূহানী মিরাজ, এক অন্তর্গত সফর; যেখানে প্রতিটি ধাপ তাঁকে নিয়ে গেছে হক্কের আরও সন্নিকটে| তাঁর এই দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ অথচ নূরানী সফরই তাঁকে তৎকালীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে পরিণত করেছে—যাঁর জীবন ইলম, আমল ও ইখলাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে যুগে যুগে পথিকদের আলোকিত করবে|
উচ্চশিক্ষা ও ¯^দেশে প্রত্যাবর্তন (১৮৯৩-১৮৯৯):
ইলমের তৃষ্ণায় দগ্ধ এক সালিক, হক্কের নূর অšে^ষণের অদম্য বাসনা বুকে নিয়ে মাওলানা আবদুল গণি (রহ.) ১৮৯৩ সালে রওনা হন ইলমের মহাসফরে| এটি ছিল না কেবল শিক্ষা অর্জনের পথচলা; বরং ছিল এক রূহানী মুজাহাদা—নফসের পরিশুদ্ধি ও হক্কের ˆনকট্য লাভের এক অন্তর্গত সাধনা| ১৮৯৩ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি অবস্থান করেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায়| এরপর ১৮৯৭ সালে তাঁর পদধ্বনি শোনা যায় দিল্লির নবপ্রতিষ্ঠিত মাদরাসা আমিনিয়ায়| অবশেষে, ১৮৯৯ সালে তাঁর এই ইলমি সফর পৌঁছে যায় চূড়ান্ত পরিণতির দিকে—দারুল উলুম দেওবন্দের পবিত্র আঙিনায়| অবশেষে, ১৮৯৩ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ সাত বছরের এই ইলমি ও রূহানী সফর শেষে, হৃদয়ে ইলমে দ্বীনের অফুরন্ত ভাণ্ডার ধারণ করে ১৮৯৯ সালের শেষভাগে তিনি ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় ¯^দেশে| তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ছিল না নিছক ফেরা—এ ছিল নূরের প্রত্যাবর্তন, ছিল হিদায়াতের সুবাতাসের আগমন| তাঁর আগমনে নিজ জনপদে যেন সূচিত হয় এক নতুন যুগ—ইলমের জাগরণ, আমলের শুদ্ধি এবং সমাজ সংস্কারের এক বরকতময় অধ্যায়|
সুফিয়া নুরিয়ার নূরানী পথচলা: এক মুরশিদের খেদমতের গাঁথা
১৮৯৯ সালে ইলমে দ্বীনের অফুরন্ত ভাণ্ডার বুকে ধারণ করে যখন তিনি ¯^দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাঁর অন্তর ছিল নূরের ভারে নত, আর দৃষ্টি ছিল উম্মাহর খেদমতে নিবদ্ধ| ফিরে এসেই তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন ইলমে নববীর খেদমতে| প্রথমে তিনি মীরসরাইয়ের ঐতিহাসিক ‘মিঠাছড়া ফয়েজে আম’—বর্তমান ‘মিঠাছড়া ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা’য় যোগদান করেন| সেখানে টানা তিন বছর তিনি দরসে নববীর দায়িত্ব পালন করেন| সে সময়কার পূর্ববাংলায় যে কয়টি দ্বীনি বিদ্যাপীঠ ইলমের আলো ছড়াচ্ছিল—ঢাকা আলিয়া, চট্টগ্রাম মোহসেনিয়া মাদ্রাসা, চট্টগ্রামের আল জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া, সন্দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাসমূহ, সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন দারুল উলুমসমূহ এবং ঢাকা অঞ্চলের কওমি শিক্ষাকেন্দ্রগুলো—তাদের কাতারে এই মাদ্রাসাটিও তাঁর খেদমতের ছোঁয়ায় এক উজ্জ্বল অবস্থান লাভ করে| তাঁর দরস ছিল শুধু পাঠদান নয়; বরং ছিল রূহানী তারবিয়ত, ইখলাসের শিক্ষা এবং সুন্নাহর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি| পরবর্তীতে ১৯০২ সালে তিনি যোগদান করেন ‘আফসারীয়া মাদ্রাসা’য়—যা পরবর্তীকালে ‘সুফিয়া নুরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা’ নামে সুপরিচিত হয়| এই প্রতিষ্ঠানই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মূল ময়দান, তাঁর ইলমি ও রূহানী খেদমতের কেন্দ্রবিন্দু| তিনি আজীবন এখানেই অতিবাহিত করেন—একজন মুরব্বি, একজন মুদাররিস, একজন মুরশিদ হিসেবে| ১৯০৪ সালে ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে জামান হযরত আবু বকর সিদ্দীকী (রহ.) এ মাদ্রাসায় তাশরিফ আনেন| তখন এর নাম ছিল ‘আফসারীয়া মাদ্রাসা’| এক রূহানী মুহূর্তে, গভীর তাওয়াজ্জুহের মাঝে তিনি বলেন—“আমি এই মাদ্রাসার দুই পার্শ্বে দুটি নূর দেখতে পাচ্ছি|” একদিকে গাজীয়ে বালাকোট, শায়খুল হাদিস সুফি নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.), আর অপরদিকে গাজীয়ে বালাকোটের খলিফা মাওলানা আকরাম আলী (রহ.)| এই রূহানী ইশারার পর সর্বসম্মতিক্রমে এবং মুজাদ্দিদে জামানের দৃষ্টি ও একাগ্রতার বরকতে মাদ্রাসাটি ‘সুফিয়া’ নাম ধারণ করে| পরবর্তীতে গাজীয়ে বালাকোট, হাদীয়ে মিল্লাত শাহ& সুফি নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.)-এর নামানুসারে এর নাম রাখা হয়—“সুফিয়া নুরিয়া মাদ্রাসা”| এই দুই বুযুর্গের মাজার শরীফ ছিল এ প্রতিষ্ঠানের নিকটে; ফুরফুরাভী হুজুর যখনই পূর্ববঙ্গে সফরে আসতেন, সুযোগ পেলেই এখানে ছুটে আসতেন—জিয়ারত করতেন, ফয়েজ গ্রহণ করতেন এবং এই নূরানী পরিবেশে কিছু সময় অতিবাহিত করতেন| মাওলানা আবদুল গণি (রহ.)-এর সুদক্ষ পরিচালনা, অটল সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার কারণে মাদ্রাসাটি দ্রুত উন্নতির শিখরে আরোহণ করে| তাঁর হাতে এ প্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষাকেন্দ্র ছিল না; বরং হয়ে ওঠে এক রূহানী খানকাহ&, যেখানে ইলমের সাথে সাথে অন্তরের পরিশুদ্ধিও সাধিত হতো| ১৯৫৩ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে এখানে বেসরকারিভাবে দাওরায়ে হাদিস চালু করেন—যা ছিল তাঁর ইলমি দূরদর্শিতা ও নববী সুনাহর প্রতি গভীর ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন| এর মাধ্যমে মাদ্রাসাটি উচ্চতর হাদিস শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে| প্রায় সাত দশক—১৯০২ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত—তিনি এই মাদ্রাসার খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করেন| এ দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি শুধু একজন পরিচালক ছিলেন না; বরং ছিলেন এক মুরশিদে কামিল, যাঁর ছায়ায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য আলেম, দরবেশ ও খাদেমে দ্বীন| তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন খেদমত, ইখলাস ও ত্যাগ আজও এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইটে, প্রতিটি কক্ষে, প্রতিটি দরসে নীরবে সাক্ষ্য বহন করে—যেন এখনো সেই নূরের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে|
সুফিয়া নুরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা: এক নূরানী সিলসিলার ইতিহাস
চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের বুকে অবস্থিত সুফিয়া নুরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি এক প্রবহমান নূরের ঝর্ণাধারা—যেখান থেকে যুগে যুগে ইলম, আমল ও ইখলাসের আলো বিকিরিত হয়ে উত্তর চট্টগ্রামের আকাশকে আলোকিত করেছে| প্রতিষ্ঠা ও নামকরণ (১৯০৪): ১৯০৪ সালে, এক রূহানী দরবেশ, আধ্যাত্মিক সাধক ও আলেমে দ্বীন—শাহ&& সুফি আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.)—হক্কের সন্তুষ্টি লাভের নিয়তে এই মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন| এটি ছিল তাঁর ইলমি খেদমত ও রূহানী ফয়েজ বিলানোর এক অনন্য প্রয়াস| তিনি তাঁরই সিলসিলার শায়খুল মাশায়েখ শাহ& সুফি নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.)-এর নামানুসারে এর নাম রাখেন—‘সুফিয়া নুরিয়া মাদ্রাসা’; যেন এই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে নূরের প্রতিচ্ছবি এবং সিলসিলার বরকতের ধারক| ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু হলেও অচিরেই এর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, আর ইলমপিপাসু হৃদয়গুলো এখানে ছুটে আসতে থাকে নূরের সন্ধানে| প্রাতিষ্ঠানিক ¯^ীকৃতি ও দাখিল স্তর: প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই বিদ্যাপীঠে ইলমের সাথে ছিল আমলের শুদ্ধি ও আখলাকের তাজকিয়া| ধীরে ধীরে এটি দাখিল স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে এবং ১৯৫০-এর দশকের পূর্বেই প্রয়োজনীয় সকল আনুষ্ঠানিক ধাপ অতিক্রম করে| ১৯৫৩ সালে প্রথমবার বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে মাদ্রাসাটি যেন এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করে—যেখানে ইলমের সাথে যুক্ত হয় প্রাতিষ্ঠানিক ¯^ীকৃতির দৃঢ়তা| উচ্চতর শিক্ষা ও সরকারি মঞ্জুরি (১৯৫০-১৯৫২): ইলমের এই দরিয়া ক্রমশ প্রশস্ত হতে থাকে| ১৯৫০ সালে মাদ্রাসাটি আলিম স্তরের ¯^ীকৃতি লাভ করে—যা ছিল উচ্চতর জ্ঞানের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ সোপান| এর মাত্র দুই বছর পর, ১৯৫২ সালে এটি ফাজিল (ডিগ্রি সমমান) স্তরের স্থায়ী মঞ্জুরি অর্জন করে| এর ফলে এ অঞ্চলের অসংখ্য তালিবে ইলমের জন্য উন্মুক্ত হয় উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষার দরজা—যেখানে ইলমের সাথে যুক্ত হয় হিকমত ও তাওয়াজ্জুহের আলো| দাওরায়ে হাদিস ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ (১৯৫৩): ১৯৫৩ সাল মাদ্রাসার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়| এই বছরেই প্রতিষ্ঠাতা নিজ হাতে, নিজ¯^ উদ্যোগে এখানে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) চালু করেন| এটি ছিল কেবল একটি পাঠক্রম চালু করা নয়; বরং ছিল হাদিসের নূরকে জনপদে ছড়িয়ে দেওয়ার এক রূহানী মিশন| তাঁর এই সাহসী ও দূরদর্শী উদ্যোগের ফলে মাদ্রাসাটি পরিণত হয় হাদিস শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থলে—যেখানে নববী সুনাহর আলো হৃদয়ে হৃদয়ে প্রবাহিত হতে থাকে| বর্তমান অবস্থা ও অর্জন: বর্তমানে এই মাদ্রাসাটি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল স্তরে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে| ইলমের মান, শৃঙ্খলা ও ˆনতিকতার সমš^য়ে এটি এক আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে| ২০১১ সালে জেএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় ৪ জন শিক্ষার্থীর মেধাবৃত্তি লাভের মধ্য দিয়ে যে সাফল্যের সূচনা হয়েছিল, ২০১২ সালে দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় শতভাগ পাসের হার অর্জনের মাধ্যমে তা আরও বেগবান হয়| সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবং সমাজসেবা ও দ্বীনি খেদমতের ¯^ীকৃতি¯^রূপ ২০১৪ সালে এটি মীরসরাই উপজেলার ‘সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’ হিসেবে ভূষিত হয়, যা প্রতিষ্ঠানটির মানসম্মত শিক্ষা ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত| আজও এই প্রতিষ্ঠানটি ইলমে দ্বীন ও যুগোপযোগী শিক্ষার সমš^য়ে এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলছে, যারা হবে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বাহক—ইলমে আলোকিত, আমলে সুসজ্জিত, আর ইখলাসে পরিপূর্ণ|
প্রাতিষ্ঠানিক অবদান: নূরের চেরাগ থেকে স্থায়ী সিলসিলা
মুফতীয়ে আজম, হযরত শাহ& সুফি মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.)-এর দৃষ্টিতে ইলমে নববী ছিল কেবল পাঠ্য নয়; বরং তা ছিল এক প্রবহমান নূরের ধারা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জারি রাখা এক আমানত| এই নূরের চেরাগকে স্থায়িত্ব দানের মহান বাসনায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এক সুদূরপ্রসারী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা—যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘সুফিয়া নুরিয়া মাদ্রাসা’| তিনি গভীর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার আলোকে এ মাদ্রাসাকে বিভিন্ন খাতে সুসংগঠিত করেন| বেসরকারিভাবে দাওরায়ে হাদিসে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘হাদিস ফান্ড’—একটি নূরানী তহবিল, যেখানে তিনি নিজ হাতে ক্রয়কৃত জমি যুক্ত করেন, যেন ইলমে হাদিসের তৃষ্ণার্ত তালিবে ইলমরা আর্থিক সংকট ছাড়াই নববী জ্ঞানের সুধা পান করতে পারে| এই দরসগাহে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত ইলমপিপাসু শিক্ষার্থীরা হাদিসের গভীর জ্ঞান অর্জন করত এবং পরবর্তীতে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সনদ লাভ করত| জনশ্রুতি আছে—এই নূরানী মজলিসে এমনকি জ্বীন শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণ করত, যেন ইলমের এ দরিয়া ছিল দুনিয়া ও গায়েব—উভয় জগতের জন্য উন্মুক্ত|
হাদিসের ছাত্রদের জন্য তিনি পৃথকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন এক সমৃদ্ধ ‘কুতুবখানা’—যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত মূল্যবান হাদিসগ্রন্থ ও দুষ্প্রাপ্য কিতাব সংরক্ষিত থাকত| এ কুতুবখানা ছিল যেন এক নীরব নূরের ভাণ্ডার, যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা তাদের ইলমের দিগন্ত প্রসারিত করত, জ্ঞানের মরতবা শাণিত করত| অনুরূপভাবে, মানবতার প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে তিনি এতিম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘এতিম ফান্ড’| এতে তিনি জমি-জমা সংযুক্ত করেন, যেন এই অসহায় সন্তানদের ভরণপোষণ নির্বিঘ্নে চলতে পারে এবং তারা ইলমের পথে নির্ভয়ে অগ্রসর হতে পারে| শিক্ষার্থীদের কষ্ট ও প্রয়োজন অনুধাবন করে তিনি তাদের আবাসন সমস্যার সমাধানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন একটি সুশৃঙ্খল বোর্ডিং ব্যবস্থা—যা ছিল কেবল থাকার স্থান নয়; বরং ইলম, আদব ও রূহানিয়াতের এক নীরব তরবিয়তখানা, যেখানে ছাত্ররা দিন-রাত ইলম ও আমলের পরিবেশে নিজেদের গড়ে তুলত| এছাড়াও, ইবাদত ও ইলমের সমš^য়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুফিয়া জামে মসজিদ’—যা ছিল মাদ্রাসার রূহানী প্রাণকেন্দ্র| এখানে নামাজ, জিকির, মোরাকাবা ও তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইলম ও আমলের এক অপূর্ব সমš^য় সাধিত হতো| আর উম্মাহর সম্মিলিত ইবাদতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি ঈদের জামাতের জন্য পৃথকভাবে জমি ক্রয় করে প্রতিষ্ঠা করেন একটি ‘ঈদগাহ’—যেখানে ঈদের দিন হাজারো মুসল্লি একত্রিত হয়ে তাকবিরের ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করত, আর ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের এক অপূর্ব দৃশ্য প্রতিফলিত হতো| উল্লেখ্য, মাদ্রাসা ও মসজিদের স্থায়ী পরিচালনার জন্য তিনি প্রায় ১০০ কানি জমি ক্রয় করে ওয়াক&ফ¯^রূপ নির্ধারণ করেন—যা বিভিন্ন তহবিলের সম্মিলিত রূপ হিসেবে আজও তাঁর দূরদর্শিতা, ইখলাস ও রূহানী প্রজ্ঞার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করছে| এ যেন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি নয়; বরং এটি এক নূরানী সিলসিলার এমন এক বীজরোপণ—যার ফল আজও ইলম, আমল ও ইখলাসের রূপে প্রজন্মের পর প্রজন্মে বিকশিত হচ্ছে|
দারুল ইফতা: হক্কের মীমাংসায় নূরের দরবার
১৯০৪ সালে মুফতীয়ে আজম, হযরত শাহ& সুফি মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘সুফিয়া নুরিয়া মাদ্রাসা’ কেবল একটি ইলমি বিদ্যাপীঠ ছিল না; বরং এটি ছিল হক্কের মশালবাহী এক নূরানী কেন্দ্র| সূচনালগ্ন থেকেই এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি পূর্ণাঙ্গ দারুল ইফতা—যা শরয়ী জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের এক নির্ভরযোগ্য দুর্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে| এই দারুল ইফতা ছিল যেন কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের নূরে আলোকিত এক বিচার দরবার; যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জটিল সমস্যার মীমাংসা হতো গভীর ইলমি বিশ্লেষণ ও তাকওয়ার আলোকে| উত্তরাধিকার বণ্টন, দাম্পত্য বিরোধ কিংবা যুগের নিত্যনতুন উদ্ভূত প্রশ্ন—সবকিছুর শরয়ী সমাধান এখানে প্রদান করা হতো এমন প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যে, যা মানুষের অন্তরে প্রশান্তি বয়ে আনত| মুফতীয়ে আজম (রহ.)-এর এই উদ্যোগ ছিল না কেবল একটি ফতোয়া বিভাগ প্রতিষ্ঠা; বরং এটি ছিল যোগ্য মুফতি ও ফকীহ গড়ে তোলার এক নূরানী গবেষণাকেন্দ্র| এখানেই ইলমের সূক্ষ্মতা, ফিকহের গভীরতা এবং হিকমতের পরিপক্বতা একত্রে বিকশিত হতো—যা আজকের ‘তাকাসসুস’ বা বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থার এক প্রাচীন ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে| সে সময় অবিভক্ত বাংলায় যখন হাতে গোনা কয়েকটি দারুল ইফতা কার্যকর ছিল, তখন এই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই এক নির্ভরতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে| সমকালীন ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে জামান হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর পরিচালিত ফতোয়া কেন্দ্র, চট্টগ্রামের মোহসেনিয়া মাদ্রাসা এবং দারুল উলূম হাটহাজারীর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এটি এক নূরানী সিলসিলায় আবদ্ধ হয়ে মুসলিম সমাজকে দিকনির্দেশনা প্রদান করত| বিশ্বপরিমণ্ডলেও এই ধারা ছিল এক সুদৃঢ় ঐতিহ্যের অংশ—দারুল উলূম দেওবন্দের নিয়মতান্ত্রিক ফতোয়া বিভাগ এবং মিশরের ‘দারুল ইফতা আল-মিসরীয়াহ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর আদর্শ ও পদ্ধতির সঙ্গে এর গভীর সাযুজ্য ছিল| ব্রিটিশ শাসনামলের জটিল বাস্তবতায়, যখন মুসলিম পারিবারিক আইন ও সামাজিক শৃঙ্খলা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল, তখন এই দারুল ইফতাগুলোই ছিল উম্মাহর জন্য এক প্রকার ‘নূরানী আশ্রয়স্থল’—যেখানে শরিয়তের আলোয় ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হতো| আজকের যুগেও এই দারুল ইফতার গুরুত্ব অন¯^ীকার্য| প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, ডিজিটাল অর্থনীতির জটিলতা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন প্রশ্ন—সবকিছুর মাঝে শরয়ী দিকনির্দেশনা পেতে একটি সুসংগঠিত দারুল ইফতা অপরিহার্য| ইন্টারনেটের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তির অন্ধকারে যখন মানুষ দিশেহারা, তখন এই দারুল ইফতা হয়ে ওঠে এক আলোকবর্তিকা—যা সহীহ আকিদা, বিশুদ্ধ আমল এবং শরয়তের সঠিক পথের দিকনির্দেশনা প্রদান করে| এভাবে ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই নূরানী ধারাটি আজও কেবল একটি ঐতিহ্য নয়; বরং এটি এক জীবন্ত সিলসিলা—যা ফিতনায় আচ্ছন্ন সময়ে মুসলিম উম্মাহর আকিদা রক্ষা, ˆনতিক স্থিতি বজায় রাখা এবং আধুনিক জীবনের শরয়ী রূপরেখা নির্ধারণে এক অবিচল আস্থার প্রতীক হয়ে আছে|
নূরের ধারাবাহিকতা: প্রাতিষ্ঠানিক খেদমত ও মশালবাহী উত্তরসূরিরা
মুফতীয়ে আজম, হযরত শাহ& সুফি মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.)-এর জীবন ছিল এমন এক নূরানী পরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ইলম কেবল ব্যক্তিগত সাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে যুগ থেকে যুগে প্রবাহিত হওয়ার ব্যবস্থা পেয়েছে| তাঁর প্রতিষ্ঠিত সুফিয়া নুরিয়া মাদ্রাসা, দারুল ইফতা, হাদিস ফান্ড, কুতুবখানা, এতিম ফান্ড, বোর্ডিং ব্যবস্থা ও ইবাদতের কেন্দ্রসমূহ মিলিত হয়ে যেন এক পূর্ণাঙ্গ নূরানী ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছিল—যেখানে ইলম, আমল, তারবিয়ত ও খেদমত একত্রে বিকশিত হতো| এই নূরানী কাঠামোর মধ্যেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এমন এক ছাত্রসমাজ, যারা পরবর্তীতে বাংলার বুকে ইলমে নববীর মশাল হাতে নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে| মুফতি মাওলানা নুরুচ্ছালাম (রহ.) তাঁর প্রিয় উত্তরসূরি হিসেবে সুফিয়া নুরিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদ অলংকৃত করে ইলম ও রূহানিয়াতের সেই ধারা অব্যাহত রাখেন; মাওলানা নুরুল ইসলাম (রহ.) উপাধ্যক্ষ হিসেবে দরস, তারবিয়ত ও প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করেন; আর মুফতি মাওলানা ছেরাজুল ইসলাম (রহ.) অধ্যক্ষ হিসেবে একই প্রতিষ্ঠানে ইলম ও শৃঙ্খলার সমš^য়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলেন| অন্যদিকে, মুফতি মাওলানা মুজাফ&ফর আহমদ (রহ.) চট্টগ্রামের নেছারিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে এক নতুন ইলমি কেন্দ্রের সূচনা করেন, যেখানে অসংখ্য শিক্ষার্থী দ্বীনের আলো লাভ করে; মাওলানা আবদুল আউয়াল ফোরকানী (রহ.) জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে হাদিসের গভীর পাঠদান করে নববী জ্ঞানের শুদ্ধতা সংরক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন; মাওলানা মেশকাত উদ্দীন (রহ.) নেছারিয়া মাদ্রাসায় হেড মাওলানা হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত মজবুত করেন| মাওলানা আবদুল কাইয়ুম (রহ.) সোনাকান্দা দারুল হুদা বহুমুখী কামিল মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে হাদিসের দরসকে প্রাণবন্ত করে তোলেন; মাওলানা হাদিস আহমদ (রহ.) সীতাকুণ্ড কামিল এমএ মাদ্রাসায় নববী ইলমের আলো ছড়ান; মাওলানা শামসুদ্দীন (রহ.) ও মাওলানা জয়নুল আবেদীন (রহ.) ছোবহানিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে ইলমে হাদিসের ধারাকে সুদৃঢ় করেন; আর মাওলানা ফজলুল বারী (রহ.) দৌলতগঞ্জ গাজীমুড়া কামিল মাদ্রাসায় তাঁর দরসের মাধ্যমে অসংখ্য তালিবে ইলমকে আলোকিত করেন| একইভাবে, মাওলানা সাইফুর রহমান নিজামী (মা.জি.আ.) শায়খুল হাদিস হিসেবে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসায় হাদিসশাস্ত্রের উচ্চতর শিক্ষাকে শিখরে পৌঁছে দেন; মাওলানা ছিদ্দিকুর রহমান (মা.জি.আ.) সোনাকান্দা দারুল হুদা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও ইলমি পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; আর মাওলানা আবদুল হাই নিজামী (মা.জি.আ.) চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসায় ইলমের চর্চা ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে নূরের এই স্রোতকে অব্যাহত রাখেন| এই সকল আলোকিত ব্যক্তিত্ব কেবল একজন শিক্ষকের ছাত্র ছিলেন না; বরং তাঁরা ছিলেন এক নূরানী সিলসিলার জীবন্ত ধারক| তাঁদের প্রত্যেকের খেদমত যেন মুফতীয়ে আজম (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোরই বিস্তার—যেখানে একটি মাদ্রাসা হয়ে ওঠে বহু মাদ্রাসার জননী, একটি দরস হয়ে ওঠে অসংখ্য দরসের উৎস, আর একটি নূর হয়ে ওঠে অগণিত হৃদয়ের আলোকবর্তিকা| এভাবেই মুফতীয়ে আজম (রহ.) তাঁর ইলমকে কেবল কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি সেটিকে একটি সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে এমন এক জীবন্ত ধারায় পরিণত করেছেন, যা আজও প্রবাহিত—ইলমে, আমলে, আকিদায় ও রূহানিয়াতে| তাঁর এই খেদমতই প্রমাণ করে—একজন সত্যিকারের আলেমের উত্তরাধিকার কেবল তাঁর কিতাব নয়, বরং তাঁর গড়ে তোলা মানুষ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ, যা যুগে যুগে নূরের মশাল জ্বালিয়ে রাখে|
আলেমে রব্বানি, কামেল ওলী ও সুন্নাহর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি
হযরত শাহ& সুফি মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.) ছিলেন একাধারে আলেম, পীর ও কামেল ওলী| তিনি কেবল জ্ঞান ছড়াননি, বরং তাঁর জীবন নিজেই ছিল এক ধারাবাহিক রূহানী সফর, যেখানে ইলম, নেক আমল, মোরাকাবা এবং অন্তরের পরিশুদ্ধি একসাথে বিকশিত হয়েছিল| তিনি আলেমে রব্বানি—আল্লাহর মারেফতপ্রাপ্ত আলেম, এবং আলেমে হক্কানি—যিনি সর্বদা সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়ের পথে অবিচল ছিলেন| মুহাক্কিক, ফকিহ, মুফাসসির এবং শায়খুল হাদিস হিসেবে তাঁর প্রতিটি ব্যাখ্যা, গবেষণা এবং শিক্ষাদান ছিল নূরের প্রতি এক নিবেদিত সাধনার ফল| রাতের শেষভাগে তিনি তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন—এটি ওলীদের জন্য ফরজের সমতুল্য| গভীর মুনাজাত ও অনন্ত মোরাকাবার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর রহমত লাভ করতেন| জামাতে ফজর নামাজের পর অজিফা ও খতম শরীফের মাধ্যমে তিনি তরিকতের আলোকে অনুভব করতেন| এরপর মুরাকাবা, অন্যান্য নামাজের খতমে খাজেগান এবং কুরআন তেলাওয়াত—এই সকল রূহানী সাধনার মধ্য দিয়ে প্রভাতের সূর্যোদয় তাঁর নূরানী জীবনের ¯^াক্ষর হয়ে উঠত| সকালের নাস্তা ও কিতাব অধ্যায়নের পর তিনি ˆদনন্দিন কাজ শুরু করতেন, এবং দিনের মূল সময় ইলম অর্জন ও তদরিসে নিবিষ্ট হতো| জুহরের পর সংক্ষিপ্ত কায়লুলা ও খাবারের পর তিনি আবার শিক্ষাদান ও তদরিসে নিমগ্ন হতেন| মাগরিবের নামাজের পর তিনি মুরিদদের জন্য প্রতিটি রূহানী শিক্ষাদান সম্পন্ন করতেন| মাগরিবের নামাজের পর ফাতিহা শরীফ পাঠ, তরিকতের মোরাকাবা এবং মুরিদ সন্তান ও ছাত্রদের তালিম—সবই তাঁর পবিত্র জীবনধারার অংশ ছিল| এশার পর তিনি নির্দিষ্ট তরিকতের অনুশীলন এবং কমপক্ষে ৫০০ বার দরুদ শরীফ পাঠ ও মুরাকাবা করতেন| এরপর খাবার গ্রহণ ও বিশ্রামের মধ্য দিয়ে শরীর ও মনকে পুনঃসজ্জিত করতেন| এই সূচিপূর্ণ রূহানী জীবনপথে ইলম, ইবাদত, মোরাকাবা, শিক্ষাদান ও নেক আমল—সবই একত্রে প্রবাহিত হতো| তাঁর চরিত্রে নিহিত ছিল তাকওয়া, পরহেজগারী, বিনয়, আমানতদারিতা এবং অসীম সংযম| কথাবার্তায় কোমলতা, আচরণে সদাচার, শিক্ষার্থীদের প্রতি স্নেহময়তা—এগুলো তাঁকে এক আদর্শ আলেম ও পীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল| আগন্তুকদের জন্য ছিল অবারিত আতিথেয়তা, আর পশুপাখি ও নিস্তেজ প্রাণীর প্রতি তাঁর অসামান্য দয়া ও মমত্ববোধ তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ কামেল ওলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল| নিজ শিক্ষকদের প্রতি তাঁর গভীর ভক্তি এবং দ্বীনি দায়িত্ব পালনে অটল নিষ্ঠা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম ˆবশিষ্ট্য| এই বিরল ও পবিত্র গুণাবলির আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত তাঁর নিকটে| ছাত্ররা শিক্ষাজীবন শেষে তাঁর একনিষ্ঠ মুরিদে পরিণত হতো| তাঁর এই রূহানী নেতৃত্ব ও দীক্ষার ধারা আজও সুফিয়া নুরিয়া মাদ্রাসার প্রতিটি দরসে, প্রতিটি কোণায় এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে প্রবাহিত হচ্ছে| ওয়াজিব ইবাদতের পাশাপাশি তিনি সুন্নাত ও মুস্তাহাব আমলসমূহকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতেন| নিয়মিত জিকির-আযকার, মুরাকাবা-মোশাহ&াদা, তাহাজ্জুদ, এশরাক, আওয়াবিন, চাশত, হাজত নামাজ—এসব ছিল তাঁর প্রতিদিনের আমল| তাঁর সোহবতে এসে বহু পথহারা মানুষ আলোর দিশা পেয়ে কামেল ওলীতে রূপান্তরিত হয়েছেন| শরীয়তের প্রতি তাঁর পূর্ণপাবন্দিত্ব ছিল অপরিসীম| তিনি বেপর্দা, বেনামাজি, সুদখোর, ঘুষখোর বা অন্য কোনো হারাম কার্যক্রমে লিপ্ত ব্যক্তির দাওয়াত ও হাদিয়া গ্রহণ করতেন না| সবকিছুই তাঁর ˆনতিকতা, রূহানীতা এবং সত্যনিষ্ঠার দৃষ্টিতে সুগঠিত ছিল| হযরত শাহ& সুফি মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.)-এর জীবন কেবল ইতিহাস নয়; এটি এক রূহানী শিক্ষা, নূরানী পথচলার মূর্ত প্রতিচ্ছবি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাচ্ছে| তিনি ছিলেন আলেমে রব্বানি, কামেল ওলী এবং সুন্নাহর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যিনি সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, জ্ঞান, ধ্যান, দয়া, বিনয় ও অন্তরের পরিশুদ্ধি একসাথে প্রদর্শন করেছেন| তাঁর জীবন ও খেদমত সকলকে রূহানী আলোর দিকে পরিচালিত করছে, সুন্নাহর পথে চলার অনুপ্রেরণা জাগিয়ে রাখছে, এবং প্রতিটি হৃদয়ে আলোর দীপ প্রজ্জ্বলিত করছে|
মুজাদ্দিদের দামানে লালিত এক রূহানী জীবনের ইতিহাস :
আল্লাহ& তা‘আলার অপরিমেয় ফজল, করম ও অদৃশ্য রহমতের ছায়াতলে এক শুভ মুহূর্তে তাঁর জীবন আলোকিত হয়ে ওঠে—যখন তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আলিম, মুজাদ্দিদে জামান, বাংলা-ভারতের বরেণ্য পীরানে তরিকত হযরত মাওলানা শাহ& সুফি আবু বকর সিদ্দিকী আল-কুরাইশী আল-ফুরফুরাভী (রহ.)-এর নূরানী সান্নিধ্যে ধন্য হন| এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না; বরং তকদীরের লাওহে মাহফুজে পূর্বলিখিত এক রূহানী ইশারা—যেন তিনি মুজাদ্দিদে জামানের পবিত্র দামান আঁকড়ে ধরে একদিন প্রকৃত আরিফ বিল্লাহর মর্যাদায় অভিষিক্ত হবেন| এক বরেণ্য ইমামের ভাষায় বলা হয়—শুধু শরিয়তের কিতাবি জ্ঞান অর্জন করলেই কেউ পূর্ণ আলিম হয়ে ওঠে না; বরং যখন তরিকত ও মারিফতের নূর তার সিনার গভীরে দীপ্তি ছড়ায়, তখনই সে আলেমের জ্ঞান পরিপূর্ণতা পায়| সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, নূরের আকর্ষণে উদ্বেলিত হয়ে তিনি মুজাদ্দিদে জামানের হাতে তরিকতের বায়আত গ্রহণ করেন| এরপর শুরু হয় কঠোর রিয়াজত, মুজাহাদা ও আত্মশুদ্ধির এক দীর্ঘ সফর—যার প্রতিটি ধাপে ধাপে তাঁর অন্তর পরিশুদ্ধ হতে থাকে, রূহ পায় এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি| এই সাধনা-সফরের পরিণতিতে তিনি পৌঁছে যান ইলমে বেলায়াতের সেই রহস্যময় দরজায়, যেখানে আল্লাহর ওলীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে নূরের গুপ্ত ভাণ্ডার| সেখানে তিনি লাভ করেন চার প্রসিদ্ধ তরিকার খেলাফত—কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া ও মুজাদ্দেদিয়া—যা তাঁর রূহানী মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে এবং তাঁকে এক পরিপূর্ণ দরবেশ ও পথপ্রদর্শকে রূপান্তরিত করে| জীবদ্দশায় তিনি তাঁর তিন পুত্রকে খেলাফতের নূরানী আমানত অর্পণ করেন| সিলসিলার ধারাবাহিক খেদমতে তাঁর সুযোগ্য বড় সাহেবজাদা মাওলানা মুফতী নুরুচ্ছালাম (রহ.) পীর হিসেবে দরবারের দায়িত্ব পালন করেন| পরবর্তীতে তাঁর ছোট সাহেবজাদা মাওলানা ছেরাজুল ইসলাম (রহ.) এই রূহানী দায়িত্ব গ্রহণ করে দরবারের খেদমতে নিজেকে নিবেদিত করেন| আর বর্তমানে, এই পবিত্র সিলসিলার নূর বহন করছেন তাঁর সুযোগ্য নাতি, শাহ& সুফী মাওলানা মুফতী আবদুল হক সিরাজী (মা.জি.আ), যিনি পীর হিসেবে দরবারের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে চলেছেন—যেন পূর্বসূরিদের নূরানী স্রোত আজও অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত রয়েছে|
হেদায়াতের পথে এক দরবেশের নিরন্তর সফর :
তিনি ছিলেন এক অন্তরজাগানিয়া দরবেশ, হেদায়াতের নূর বুকে ধারণ করে যিনি তরিকতের দাওয়াত পৌঁছে দিতে নিরন্তর সফরে মগ্ন থাকতেন| সে যুগের রাস্তাঘাট আজকের মতো সুগম ও সুবিন্যস্ত ছিল না; পথ ছিল দুর্গম, যাত্রা ছিল কষ্টসাধ্য| তবুও তাঁর রূহানী জজবা কখনো স্তিমিত হয়নি—কখনো নদীপথে তরী ভাসিয়ে, কখনো ধূলিধূসর পথে পায়ে হেঁটে, আবার কখনো সীমিত বাহনে ভর করে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের দোরগোড়ায়| বিশেষত চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও ফেনী অঞ্চলে তিনি হেদায়াতি ও তরিকতের খেদমতে অধিকতর সময় অতিবাহিত করেন| তাঁর কণ্ঠে ছিল হকের ডাক, বয়ানে ছিল অন্তর বিদীর্ণ করা প্রভাব, আর উপস্থিতিতে ছিল এক অপার্থিব নূরানী আকর্ষণ—যা মানুষের অন্তরকে গাফেলত থেকে জাগিয়ে তুলে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনত| এই সফরগুলো কেবল স্থানান্তরের বাহ্যিক যাত্রা ছিল না; বরং ছিল এক গভীর রূহানী মিশন—মানুষের অন্তরে ঈমানের প্রদীপ প্রজ্বলিত করা, তওবার দরজা উন্মুক্ত করা এবং তরিকতের স্নিগ্ধ ছায়ায় তাদের আশ্রয় দেওয়া| তাঁর প্রতিটি পদচিহ্ন যেন নীরবে সাক্ষ্য দেয়—একজন সত্যিকারের আল্লাহওয়ালার জীবন কখনো স্থির নয়; বরং তা সর্বদা নূরের দাওয়াতে গতিময়, মানবতার কল্যাণে নিবেদিত|
মক্কা-মদিনার নূরে স্নাত এক আরিফের জীবন:
তিনি ছিলেন এক সৌভাগ্যবান রূহানী মুসাফির—আল্লাহর প্রেমে উদ্বেলিত হৃদয় নিয়ে যিনি বারবার ধন্য হয়েছেন হারামাইন শরীফাইনের পবিত্র দরবারে হাজির হওয়ার তাওফিকে| মক্কাতুল মোকাররমা ও মদিনাতুল মুনাওয়ারা-এর নূরানী প্রান্তরে তিনি এক-দু’বার নয়, বরং এগারোবার হজ্জব্রত পালন করার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন| প্রতিটি হজ্জ ছিল তাঁর জন্য কেবল একটি ফরজ ইবাদত পালনের পর্ব নয়; বরং ছিল আত্মার পরিশুদ্ধি, অন্তরের তাজকিয়া এবং রূহের এক গভীর মেরাজ| কাবার ছায়াতলে অশ্রুসিক্ত দোয়া, রওজা মুবারকের সামনে দরূদে ভেজা মুহূর্ত—এসবই তাঁর জীবনে এনে দিত এক অনির্বচনীয় নূরানী প্রশান্তি, যা ফিরে এসে তিনি মানুষের অন্তরে ছড়িয়ে দিতেন হেদায়াতের আলো হয়ে| এই পুনঃপুন পবিত্র সফর যেন প্রমাণ করে—তিনি শুধু একজন সফরকারী ছিলেন না; বরং ছিলেন এক আরিফ, যার হৃদয় সর্বদা আকৃষ্ট থাকত বাইতুল্লাহ ও রওজায়ে রাসূলের নূরানী টানে|
লিখিত গ্রন্থাবলি:
তিনি শুধু রূহানী ময়দানের একজন সাধকই ছিলেন না; বরং কলমের জিহাদেও ছিলেন সমানভাবে প্রখর—যেখানে তাঁর চিন্তা, গবেষণা ও দীনের প্রতি গভীর দরদ এক অনন্য নূরানী ছাপ রেখে গেছে| বাংলায় জুমার খুতবা প্রদান করা যাবে না—এই গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা নিয়ে তিনি একটি প্রামাণ্য উর্দু গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম “ইশায়াতুল ফাতাওয়া আল হানাফিয়্যা ফী কারাহাতিল খুতবাহ বিগাইরিল আরাবিয়্যা”| এই গ্রন্থটি কেবল একটি সাধারণ রচনা নয়; বরং তৎকালীন ইলমি অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক মূল্যবান দালিলিক কাজ| এতে দারুল উলূম দেওবন্দ-এর প্রসিদ্ধ উলামায়ে কেরাম, ফুরফুরা শরীফ-এর মুজাদ্দিদে জামান (রহ.)-সহ উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমগণ ¯^াক্ষর প্রদান করেন—যা গ্রন্থটির গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্বকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে| এছাড়াও তিনি সম্পাদনা করেন এক মূল্যবান রূহানী গ্রন্থ— “তুহফাতুস সুফিয়া ফী মিলাদে খায়রুল বারীয়া”; যেখানে মিলাদ ও কিয়ামের ˆবধতা, আকীদাগত বিশুদ্ধতা এবং আমলগত সূক্ষ্ম দিকসমূহ এমনভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে, যেন কিতাবের প্রতিটি পৃষ্ঠা নূরের রেখায় দীপ্ত হয়ে ওঠে| এ কিতাব কেবল একটি ইলমি সম্পাদনার ফল নয়; বরং এটি ছিল সুন্নিয়ত ও আহলে সুন্নাতের সুমহান ঐতিহ্য সংরক্ষণে তাঁর হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক খালিস খেদমত| কিন্তু এখানেই ফুটে ওঠে তাঁর দরবেশি সত্তার এক অপূর্ব দিক—ইখলাসের এমন এক নিভৃত জ্যোতি, যা নিজের নামের প্রকাশে নয়, বরং আমলের কবুলিয়াতে পরিপূর্ণতা খোঁজে| তিনি এ গ্রন্থে নিজের নাম লিপিবদ্ধ না করে তা অর্পণ করেন তাঁর বড় সাহেবজাদা মুফতী নুরুচ্ছালাম (রহ.)-এর নামে| যেন এ এক নীরব শিক্ষা—ইলমের আসল সৌন্দর্য খ্যাতিতে নয়, বরং নিঃ¯^ার্থ দানে; আর নূরের প্রকৃত ধারক সে-ই, যে নিজের সত্তাকে গোপন রেখে অন্যের মাঝে আলো ছড়িয়ে দেয়| এই ঘটনাই প্রমাণ করে—তিনি কেবল কিতাবের আলেম ছিলেন না; বরং ছিলেন ইখলাসের দরবেশ, যাঁর প্রতিটি কাজেই লুকিয়ে ছিল লিল্লাহিয়্যাতের গভীর রহস্য এবং রূহানিয়াতের নির্মল আভা| তাঁর এই গ্রন্থসমূহ প্রমাণ করে—তিনি যেমন ছিলেন তরিকতের ময়দানে একজন আরিফ, তেমনি ইলমের অঙ্গনেও ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র; যার কলম থেকে ঝরে পড়ত হক ও হিদায়াতের দীপ্তিময় আলো|
পাণ্ডিত্য ও বিশ্বজনীন ¯^ীকৃতি: এক যুগের ইলমি ঐকমত্যের দীপ্ত দলিল
ইসলামি জ্ঞানচর্চার সুবিশাল ইতিহাসে এমন কিছু গ্রন্থ রয়েছে, যেগুলো কেবল একজন মনীষীর চিন্তার ফল নয়; বরং তা হয়ে ওঠে একটি যুগের সম্মিলিত চেতনা, গবেষণা ও ইলমি পরিপক্বতার প্রতিচ্ছবি| সেই অনন্য কিতাবসমূহের সারিতে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছে মুফতীয়ে আজম, হযরত শাহ& সুফি মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.)-এর অমর রচনা— “ইশাআতুল ফাতাওয়া”| এই কিতাব কেবল ফিকহি মাসআলা বা ফাতওয়ার সংকলন নয়; বরং এটি এক সুদীর্ঘ মুজাহাদা, গবেষণা ও ইলমি মুরাকাবার ফসল—যেখানে প্রতিফলিত হয়েছে উপমহাদেশের সমকালীন আলেম সমাজের সম্মিলিত চিন্তা ও প্রজ্ঞার নূরানী প্রতিধ্বনি| এ গ্রন্থের অন্যতম ˆবশিষ্ট্য হলো—উপমহাদেশের প্রখ্যাত পীর-মাশায়েখ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকিহগণের ¯^াক্ষর ও অভিমতের সংযোজন| মোট ৮২ জন খ্যাতিমান আলেম তাঁদের ইলমি সাক্ষ্য ও সমর্থন প্রদান করেছেন, যা এ কিতাবকে দিয়েছে এক অনন্য মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা| তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকি আল-ফুরফুরাভী, মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, মাওলানা আজিজুর রহমান দেওবন্দী, মাওলানা আব্দুল বাতেন জৈনপুরী, আল্লামা শিব্বির আহমদ ওসমানী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী, হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মুফতি কেফায়েতুল্লাহ দেহলভী, মাওলানা হাবীবুল মুরছালিন, মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক (ঢাকা), মাওলানা তৈয়্যব (দেওবন্দ), মাওলানা নজির আহমদ (কলকাতা আলিয়া), মাওলানা সাঈদ আহমদ (মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর), আল্লামা ইয়াহইয়া (কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা), মাওলানা ইসমাঈল (কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা), মাওলানা রিয়াজ উদ্দীন (দারুল উলুম দেওবন্দ) এবং মুফতি মুহাম্মদ শফি (মুফতীয়ে পাকিস্তান)—প্রমুখ| দেওবন্দ, সাহারানপুর, দিল্লি, কলকাতা, ˆজনপুর, ঢাকা, নোয়াখালী, ফেনীসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন ইলমি কেন্দ্রের বরেণ্য উলামায়ে কেরাম এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করে তাদের সমর্থন প্রদান করেছেন| ফলে এটি কোনো একক মতের প্রতিফলন নয়; বরং দীর্ঘ ইলমি যাচাই-বাছাই, পরস্পর পরামর্শ ও চিন্তার সমš^য়ে গড়ে ওঠা এক সুদৃঢ় সিদ্ধান্তসমষ্টি| এই ¯^াক্ষরসমূহ নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এগুলো প্রতিফলিত করে সংশ্লিষ্ট আলেমদের আন্তরিক আস্থা, ইলমি সন্তুষ্টি ও গ্রহণযোগ্যতার সীলমোহর| ফলে “ইশাআতুল ফাতাওয়া” একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, যা সমকালীন ইসলামি জ্ঞানচর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অধিকার করে আছে| বিশেষভাবে লক্ষণীয়—বিভিন্ন মাযহাবি ধারা, চিন্তাপদ্ধতি ও ইলমি প্রবণতার আলেমদের অংশগ্রহণ এই কিতাবকে দিয়েছে এক অনন্য ভারসাম্য ও বিশ্বজনীনতা| এর ফলে এটি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর এক ইলমি ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে| সারকথা, মুফতীয়ে আজম (রহ.)-এর এই অমর কীর্তি কেবল একটি কিতাব নয়; বরং এটি এক যুগের আলেম সমাজের সম্মিলিত ঐকমত্য—এক ধরনের ইজমা‘-সদৃশ ইলমি ঐক্যের উজ্জ্বল দলিল, যা আজও নূরের মত পথ প্রদর্শন করে চলেছে|
মকবুলিয়াতের দলিল:
একদা অনাবৃষ্টির কঠিন দুর্যোগে জমিন হয়ে উঠেছিল বিবর্ণ, ফসল শুকিয়ে গিয়েছিল, আর জনজীবন ছিল ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত| আকাশ যেন তার রহমতের দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছিল, মানুষের অন্তরে নেমে এসেছিল দুশ্চিন্তার ঘন অন্ধকার| এমন এক ক্রান্তিকালে, আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশায় হাজী জব্বার বাড়ির পূর্ব পার্শ্ববর্তী খোলা প্রান্তরে আয়োজন করা হয় সালাতুল ইস্তিসকার—এক নিবেদনময় ইবাদত, যেখানে বান্দা তার রবের দরবারে অশ্রুসিক্ত প্রার্থনায় অবনত হয়| তিনি যখন মুনাজাতে মগ্ন—হৃদয়ভরা আরজিতে, বিনয়ের গভীরতায় আল্লাহর দরবারে হাত উঠালেন, তখনই ঘটল এক অপার্থিব দৃশ্য| তাঁর দোয়ার আবেগময় মুহূর্তেই আসমানের বুক চিরে নেমে এলো রহমতের বৃষ্টি| শুকনো মাটিতে প্রাণের সঞ্চার হলো, মানুষের অন্তরে ফিরে এলো প্রশান্তির স্নিগ্ধতা| এই ঘটনা কেবল একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তন ছিল না; বরং ছিল তাঁর মকবুলিয়াতের এক উজ্জ্বল নিদর্শন—একজন আল্লাহওয়ালার দোয়া কিভাবে আরশে কবুলিয়াত পায়, তার এক জীবন্ত প্রমাণ| তাঁর সেই মুনাজাত যেন আজও বাতাসে ভাসে—রহমতের আশ্বাস হয়ে, বিশ্বাসের দীপশিখা হয়ে|
ইলমি শ্রেষ্ঠত্বের দলিল:
কিতাবি জ্ঞান—হে আলেম ও মুরীদগণ—সর্বাধিক আলোয় দীপ্ত হয় তখন, যখন তা হৃদয় ও নূরের মিলনে সমৃদ্ধ হয়| এই উচ্চতার এক অনন্য দিক হল মুনাজির বা তর্কবিদ্যায় পারদর্শীতা| এটি কেবল জ্ঞানের গভীরতার প্রতীক নয়; বরং এটি প্রকাশ করে উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, যুক্তি-বিশ্লেষণের সূক্ষ্মতা এবং তর্কশাস্ত্রে নিখুঁত দক্ষতা| হযরতুল্লামা শাহ&& সুফি আব্দুল গণি (রহ.) বহুবার বিভিন্ন মুনাজের মঞ্চে অংশগ্রহণ করেছিলেন| ফিকহী এখতেলাফী মাসআলা, আক্বিদাগত শুদ্ধতা—যে কোনো বিতর্কের ক্ষেত্রেই তিনি আলো জ্বালাতেন, যেন রূহানী নূর দিয়ে অন্ধকার ঘেরা হৃদয় আলোকিত হয়| এক জনশ্রুতি বলেছে, একবার মিলাদ কিয়ামে দাড়াঁনোর বিষয়ে অনুষ্ঠিত মুনাজেরায় তিনি দেরী করে উপস্থিত হন| দেরী হওয়া, জনসাধারণের চোখে শুধুই সময়ের হিসাব—কিন্তু তার দর্শনশাস্ত্রের গভীরতা সেখানে প্রকাশিত হয়| প্রবেশের মুহূর্তেই সকল ওলামা ও জনসাধারণ দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়| তখন তিনি একটি রূহানী যুক্তি তীর ছুঁড়ে দেন— “যদি আমার সম্মানে দাঁড়াতে পারো, নবীজির শানে মিলাদ কিয়ামের সময় নবীজির সম্মানে দাঁড়ালে কত সুন্দর ও আরামদায়ক হবে|” এই একটিমাত্র বাক্যই সকলের অন্তরে নূর ছড়িয়ে দেয়| সবাই ¯^তঃস্ফূর্তভাবে মিলাদে দাঁড়ানোর জন্য সম্মতি জ্ঞাপন করে| তাঁর উপস্থিতি কেবল বিতর্কের মঞ্চ নয়, এটি রূহানী আলোর মঞ্চ, যেখানে জ্ঞান ও নূর মিলিত হয়ে হৃদয়গুলোকে আলোকিত করে| হযরতুল্লামার প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি যুক্তি, প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি—সবই নূরানী দিক নির্দেশনা, যা মুরীদ ও ভক্তদের আত্মাকে উজ্জীবিত করে এবং ইলমের মহত্ত্ব ও রূহানী সৌন্দর্য প্রকাশ করে|
ইন্তিকাল:
শাহ&& সুফি আব্দুল গণি (রহ.) ১৯৭৬ সালের ২৭ জুলাই, রোজ মঙ্গলবার, ১১২ তম বসর জীবনের পর ইন্তিকাল বরণ করেন| তাঁর ইন্তিকাল ছিল এক রূহানী নিঃশ্বাস, যা আল্লাহর রহমতের নূরে ভরে ওঠা ছাদের মতো| অসংখ্য মুরীদ ও দরবেশের উপস্থিতিতে তাঁর বড় ছাহেবজাদা, মাওলানা মুফতী নূরুচ্ছালাম (রহ.) জানাযার ইমামতি করেন| জনশ্রুতি আছে, সেই দিন বাতাসের একটি নরম আওয়াজে মানুষ শুনেছিল, “সুফিয়ার হুজুর ইন্তিকাল করলেন|” যেন আকাশের কণ্ঠও দুনিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে প্রার্থনা করছিল| ফুরফুরা সিলসিলার খলিফাদের মাজার খোলা আকাশের নিচে, ছাদবিহীন এবং উঁচু গ¤^ুজহীন| এখানকার রহমতের বৃষ্টি সরাসরি মাজারে পতিত হয়, যেন ¯^র্গের নূর পাপলেপ্ত হৃদয়ে প্রবেশ করছে| এই অলৌকিক দৃশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর পীরভাই, ছারছিনার পীর সাহেব মাওলানা নেছার উদ্দীন (রহ.), ফেনীর মাওলানা ছদরুদ্দীন আহমদ শহীদ (রহ.), আখাউড়ার অধ্যাপক মাওলানা আবদুল খালেক এম. এ ছতুরভী (রহ.), সোনাকান্দার মাওলানা হাফেজ আবদুর রহমান হানাফী এবং ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখের সাক্ষ্য থেকে| তাঁর ইন্তিকাল শুধু দেহের পরিশ্রান্তি নয়; এটি ছিল আল্লাহর নূরে আত্মার মুক্তি, এক রূহানী যাত্রা, যা আজও মুরীদ ও ভক্তদের হৃদয়ে আলো জ্বালায়|
সমাপনী কথা: কিতাব থেকে নূরে—এক জীবনের শিক্ষা
হযরত শাহ& সুফি মাওলানা আব্দুল গণি (রহ.)-এর জীবন আমাদের সামনে এক গভীর সত্য উন্মোচন করে—ইলম কেবল অক্ষরের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা হৃদয়ের নূরে জীবন্ত হয়ে ওঠে| কিতাবের ধূলিকণা থেকে শুরু হওয়া যে সফর, তা যখন ইখলাস, মুজাহাদা ও মুহাব্বতের সিঁড়ি বেয়ে অগ্রসর হয়, তখনই তা পৌঁছে যায় আরশের নূরের সান্নিধ্যে| তিনি শিখিয়ে গেছেন— শুধু জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়; বরং সেই জ্ঞানকে আমলে রূপান্তরিত করা, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীব (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করাই প্রকৃত কামিয়াবি| তাঁর জীবন আমাদের আহ্বান জানায়— দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ ত্যাগ করে, ইলমের পথে ˆধর্যধারণ করে, মুরশিদের সোহবতে থেকে, নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে আমরা যেন নিজেদের অন্তরকে নূরের উপযোগী করে তুলি| তিনি প্রমাণ করে গেছেন—একজন সত্যিকারের আলেম সেই ব্যক্তি, যার জ্ঞান মানুষকে আলোকিত করে, যার আমল মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, আর যার সোহবত মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে| আজও তাঁর জীবন এক জীবন্ত দাওয়াত— কিতাবের অক্ষর থেকে নূরের জগতে প্রবেশের দাওয়াত, বাহ্যিক জ্ঞান থেকে অন্তরের মারেফতের পথে যাত্রার দাওয়াত| আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর মতো ইখলাস, ইলম, আমল ও রূহানিয়াতের পথে চলার তাওফিক দান করুন—আমীন|

তথ্যসূত্র:
ইলমের খেদমতে নিবেদিত এক মননশীল কলমযোদ্ধা, সুফিয়া ইসলামিক রিসার্চ একাডেমীর পরিচালক, প্রাজ্ঞ লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক—সাইফুল হক সিরাজী|

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
Ads by coinserom