প্রারম্ভিক কথা:
বাঙালি মুসলিম রেনেসাঁ এবং সুফি ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বের সন্ধান মেলে, যাঁদের জীবন লৌকিক ও অলৌকিকতার এক বিস্ময়কর সংশ্লেষণ| হজরত শাহ সুফি ছদরুদ্দিন আহমেদ শহীদ (রহ.) তেমনি এক অনন্য নাম| ১৯-২০ শতকের ক্রান্তিলগ্নে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনযন্ত্রের একজন উচ্চপদস্থ ‘পুলিশ অফিসার’ হওয়া সত্ত্বেও ˆবষয়িক আধিপত্য ত্যাগ করে তাঁর ‘ফানা ফিল্লাহ’র পথে ধাবিত হওয়া কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক উত্তরণ নয়, বরং এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় গবেষণার বিষয়| উচ্চতর ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও তাঁর আপসহীন শরিয়তপন্থী অবস্থান এবং সমকালীন রাজনৈতিক ও সংস্কারবাদী আন্দোলনে তাঁর সুদূরপ্রসারী ভূমিকা সমসাময়িক সুফি ধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল| বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে তাঁর ˆশশব, প্রশাসনিক জীবনের বিবর্তন, আধ্যাত্মিক রূপান্তর এবং ¯^দেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাঁর তাত্ত্বিক লড়াইকে একটি গবেষণাধর্মী ও মরমী দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে|
অদৃশ্য সুতোর টানে: একজন দারোগা সাহেবের গল্প:
জগতে কিছু রহস্য আছে যা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, আবার যুক্তি দিয়েও খণ্ডানো যায় না| মানুষ হিসেবে আমরা বড় অদ্ভুত; আমরা মনে করি ইউনিফর্ম পরা একজন পুলিশ অফিসার মানেই রুক্ষ মেজাজ আর আইনের কচকচানি| কিন্তু সেই উর্দি পরা মানুষটির ভেতরেও যে তরিকতের এক বিশাল সমুদ্র থাকতে পারে, শাহ& সুফি ছদরুদ্দীন আহমেদ শহীদ (রহ.)-এর জীবনপাঠ না করলে তা বিশ্বাস করা কঠিন|
বাঙালী সুফি ঐতিহ্যের এই অনন্য মানুষটিকে ইতিহাসের পাতায় খুব গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখার অন্তত চারটি কারণ আছে| সেই কারণগুলো শুনলে মনে হয়, নিয়তি খুব নিপুণ হাতে তাঁর জীবনের চিত্রনাট্য লিখেছে|
প্রথমত, তিনি ছিলেন ইংরেজি শিক্ষিত একজন পদস্থ পুলিশ অফিসার (ওসি)| ভাবা যায়? একদিকে ব্রিটিশ আমলের ইংরেজি শিক্ষার দাপট, অন্যদিকে পুলিশের ক্ষমতা—এই দুইয়ের ঘেরাটোপে থেকেও তিনি ছিলেন আগাগোড়া একজন কঠোর শরিয়তপন্থী মানুষ| আইনের পোশাক পরে তিনি কেবল চোর-ডাকাতই ধরেননি, বরং তরিকতের খলিফা হিসেবে মানুষের ভেতরের অন্ধকারও পরিষ্কার করেছেন| দুনিয়াবি ক্ষমতা আর আধ্যাত্মিক বিনয়—এই দুই বিপরীত মেরুর এমন মিলন সচরাচর দেখা যায় না|
দ্বিতীয়ত, তাঁর এই আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস ছিল ফুরফুরা শরীফ| তিনি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সুফি মুজাদ্দিদে জামান মাওলানা আবু বকর ফুরফুরাভী (রহ.)-এর খলিফা| এক প্রবল প্রতাপশালী পীর সাহেবের কাছ থেকে পাওয়া সেই রূহানি আলো তিনি তাঁর সারা গায়ে মেখে নিয়েছিলেন|
তৃতীয় কারণটি অনেকটা জাদুর মতো| আধ্যাত্মিক জগতে একজনের প্রদীপে অন্যজনের আলো জ্বলে| ছদরুদ্দীন আহমেদ সাহেবের প্রভাবেই বিশ্ববরেণ্য প্রফেসর মাওলানা আব্দুল খালেক ছতুরভী (রহ.) সুফি তরিকায় দীক্ষিত হন এবং খেলাফত লাভ করেন| আর এই সিলসিলার মায়াবী ছায়াতলেই আমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদের মতো মানুষ ইসলামের আদর্শে নিজেকে সঁপে দেন| ভাবলে অবাক লাগে, একজন পুলিশ অফিসারের রূহানি প্রভাব কীভাবে একজন কালজয়ী কবির কলমকে বদলে দিয়েছিল!
চতুর্থ এবং শেষ কারণটি হলো তাঁর হিজরত| ইসলাম ও মুসলমানদের ¯^ার্থে তিনি নিজের মায়া কাটিয়ে যশোর থেকে ফেনীতে হিজরত করেছিলেন| মানুষ তো সাধারণত ¯^ার্থের টানে এক শহর থেকে অন্য শহরে যায়, কিন্তু তিনি গিয়েছিলেন তাঁর বিশ্বাসের টানে| আজ তিনি ফেনীর মাটিতেই নিভৃতে শায়িত আছেন|
সুফিরা যেমন বলতেন, ‘‘মহাপুরুষদের চেনা সহজ কাজ নয়|’’ শাহ& সুফি ছদরুদ্দীন আহমেদ শহীদ (রহ.) তেমনই এক মহাপুরুষ, যিনি উর্দির আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলেন এক বিশাল পীর-সত্তা| তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, পথ যেটাই হোক না কেন, গন্তব্য যদি স্রষ্টা হন—তবে সব পথই এক বিন্দুতে মিলে যায়|
পোশাকের আড়ালে নূর: এক অলৌকিক রূপান্তরের গল্প:
১৮৬৪ সাল| মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার গঙ্গারামপুর গ্রাম| এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্ম নিলেন এক শিশু—নাম ছদরুদ্দিন| রূপকথার গল্পের মতোই তাঁর চারপাশ ছিল আভিজাত্যে ঘেরা| বাবা মুহাম্মদ মিনহাজ উদ্দীন (রহ.) ছিলেন ব্রিটিশ আমলের প্রতাপশালী ‘ভূমি সেটেলমেন্ট অফিসার’| কিন্তু সেই আভিজাত্যের জৌলুসে সদরুদ্দীনের মন মজল না| ছোটবেলা থেকেই তাঁর ভেতরে ছিল এক আশ্চর্য নীরবতা, যাকে আমরা বলি ‘যুহদ’ বা সংসারবিরাগ|
ক্ষমতার দাপট ও নিয়তির খেলা:
মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি পুলিশ বিভাগে যোগ দিলেন| তেইশ বছর পূর্ণ হতে না হতেই হয়ে গেলেন অফিসার ইনচার্জ (ওসি)| ব্রিটিশ আমলের একজন ওসি মানে অগাধ ক্ষমতা, যার এক ইশারায় বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়| কিন্তু নিয়তি হয়তো পর্দার আড়ালে বসে হাসছিল| কারণ, সূরা কাসাসের সেই অমোঘ সত্য—‘‘আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকেই হেদায়েত দিতে পারবেন না, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকেই হেদায়েত দেন|’’
ছদরুদ্দিন সাহেবের হেদায়েত কোনো রাজকীয় দরবারে লেখা ছিল না, তা লেখা ছিল এক অদ্ভুত বিনয়ের ভেতর|
একটি কাপড় এবং আকাশ থেকে নামা নূর:
চাকরিরত অবস্থায় একদিন তিনি এক আল্লাহর ওলীর সংস্পর্শে এলেন| ক্ষমতার দম্ভ একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি সেই দরবেশের ময়লা কাপড় ধৌত করে দিলেন| ঠিক সেই রাত থেকেই তাঁর অন্তর্জগত ওলটপালট হয়ে গেল| এক রাতে ¯^প্নে দেখলেন—আকাশ থেকে এক টুকরো নূরানী কাপড় নেমে এসে তাঁর মুখে লাগল, আর সাথে সাথে তাঁর পুরো শরীর এক অপার্থিব বাতেনী ইলমে ভরে উঠল|
লজিক দিয়ে এই ¯^প্নের ব্যাখ্যা হয়তো পাওয়া যাবে না, কিন্তু সুফির সেই রহস্যময় জগতের জানলা দিয়ে তাকালে এর উত্তর মেলে| একেই বলে ‘আকর্ষণে মওলা’|
উর্দির মায়া ত্যাগ ও ফুরফুরার সেই
আধ্যাত্মিক সুতো:
পরদিন সকালে সেই প্রতাপশালী ওসি সাহেব আর রইলেন না| পুলিশের ঝকঝকে উর্দি আর ক্ষমতার গদি তুচ্ছ হয়ে গেল সেই নূরানী কাপড়ের কাছে| তিনি পদত্যাগ করলেন| উচ্চপদস্থ অফিসার থেকে এক লহমায় হয়ে গেলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র| জ্ঞানের গভীরতায় শিক্ষকদেরও অবাক করে দিলেন তিনি|
শিক্ষকদের পরামর্শে তিনি পা বাড়ালেন ফুরফুরা শরীফের দিকে| মুজাদ্দিদে জামান হযরত মাওলানা শাহ& সুফি আবু বকর সিদ্দিক (রহ.)-এর হাতে হাত রেখে শুরু হলো এক কঠিন আধ্যাত্মিক যুদ্ধ| দীর্ঘ কঠোর সাধনার পর তিনি যখন ফিরে এলেন, তখন তাঁর কাঁধে চার তরিকার খেলাফতের দায়িত্ব|
সুফিরা যেমন বলতেন, ‘‘সব মানুষই তো মানুষ, কিন্তু মহাপুরুষরা হলেন অন্য গ্রহের অতিথি|’’ ছদরুদ্দিন (রহ.) ছিলেন সেই বিরল অতিথিদের একজন, যিনি ক্ষমতার সিংহাসন ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন হৃদয়ের রাজত্ব|
রূহের সওদাগর: এক আপসহীন ওলীর বিদায়-
জগতে কিছু মানুষ জন্মায় স্রোতের বিপরীতে হাঁটার জন্য| আমরা যখন চারপাশের ভিড়ে মিশে গিয়ে আপস করতে শিখি, তখন কেউ কেউ বর্ম পরে দাঁড়ান সত্যের পাহাড় হয়ে| শাহ সুফি ছদরুদ্দিন (রহ.) ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির একজন| তাঁর জীবনের ক্যানভাসটা এতই বিশাল যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বারুদ আর আধ্যাত্মিকতার নূর সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে|
রেঙ্গুনের স্মৃতি ও অমোঘ আদেশ:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা তখন বাজছে| তিনি তখন মিয়ানমারের রেঙ্গুনে, মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিচ্ছেন স্রষ্টার ডাক| কিন্তু নিয়তি তাঁকে সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে দিল না| একদিন সরাসরি এল ‘গায়েবি আদেশ’—রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তাঁকে ফিরতে হবে প্রিয় ¯^দেশে| তিনি ফিরলেন, কিন্তু তাঁর ফেরার পথটা পুষ্পশয্যা ছিল না|
আপসহীন তেজ ও ফতোয়ার তলোয়ার:
তৎকালীন সময়ে ‘বন্দে মাতারাম’ স্লোগান নিয়ে যখন মাতামাতি, তখন এই পুলিশ অফিসার থেকে ওলী হওয়া মানুষটি নির্ভয়ে ঘোষণা করলেন—এটি কুফরি| এমনকি যখন ‘রাম ও রহিম আলাদা নয়’ বলে স্রষ্টার একত্ববাদে ধোঁয়াশা ˆতরির চেষ্টা করা হলো, তখনও তাঁর কলম আর জবান আগুনের মতো জ্বলে উঠল| তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, সত্য আর মিথ্যার কোনো আপস হতে পারে না|
সুফিরা যেমন বলতেন, ‘‘সব সত্যই সবার সহ্য হয় না|’’ ছদরুদ্দিন (রহ.) কেবল কথাই বলেননি, তিনি হাতে-কলমে কাজ করেছেন| শিরক আর বিদআতের বিরুদ্ধে তাঁর ‘মোনাজারা’ বা বাহাসগুলো ছিল তলোয়ারের মতো ধারালো| এমনকি মাজারে ˆতরি অনৈসলামিক গ¤^ুজ বা কোব্বা নিজ হাতে ভেঙে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, স্রষ্টার ঘরে মানুষের ˆতরি মায়ার কোনো স্থান নেই|
একটি বোমা এবং জুমাবার রাত:
১৯০৯ থেকে ১৯৪২—এই দীর্ঘ সময়টা তিনি ব্যয় করেছেন আলো ছড়াতে| গ্রাম থেকে গ্রামে মসজিদ, মাদ্রাসা আর মক্তবের এক বিশাল আধ্যাত্মিক জাল বুনেছেন তিনি| তাঁর হাত ধরেই ˆতরি হয়েছে অগাধ গুণী মানুষ, যারা বহন করেছেন তরিকতের মশাল|
কিন্তু ১৯৪৪ সালের সেই অভিশপ্ত দিনটির কথা ভাবুন| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমারু বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত একটি বোমা এসে পড়ল ফেনীর মাটিতে| সেই বোমার আঘাতে আহত হলেন এই মহান ওলী| জীবনের শেষ জুমাবার| রাত তখন আটটা| হয়তো আসমানের ফেরেশতারা সেদিন কাতার দিয়ে দাঁড়িয়েছিল এই মহান আত্মাকে ¯^াগত জানাতে| তিনি ইন্তিকাল করলেন|
অবিবাহিত জীবন ও ফেনীর সেই হিজরত:
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, এই বিশাল কর্মময় জীবনে তিনি ছিলেন এক নিঃসঙ্গ পথিক—একদম অবিবাহিত| তাঁর পুরোটা জীবনই যেন ছিল স্রষ্টার প্রেমে উৎসর্গ করা এক সুদীর্ঘ মোনাজাত| তাঁর অত্যন্ত প্রিয় সাগরেদ মাওলানা হাবিবুল্লাহ (রহ.)-এর ফেনীর বাড়িতেই তিনি হিজরত করেছিলেন এবং সেখানেই আজ তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত|
লজিক হয়তো বলবে, এটি কেবলই একটি মৃত্যু| কিন্তু সুফির সেই আধ্যাত্মিক চোখ দিয়ে তাকালে দেখা যায়, এটি এক প্রিয়জনের সাথে অন্য প্রিয়জনের মিলনের রাত| যশোরে জন্মানো এক নক্ষত্র ফেনীর মাটিতে গিয়ে নিভে গেল, কিন্তু রেখে গেল এমন এক জ্যোতি, যা আজও অগণিত মানুষকে পথ দেখাচ্ছে
আকাশের সাথে মিতালি:
শাহ সুফি সদরুদ্দীন (রহ.)-এর মাজারের সামনে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত হাহাকার মেশানো প্রশান্তি কাজ করে| সেখানে কোনো রূপালি গ¤^ুজ নেই, নেই কোনো দামি পাথরের কারুকাজ| জৌলুসহীন এক সাদাসিধা কবর, যার ওপর সরাসরি আসমান দেখা যায়| যখন বৃষ্টি নামে, সেই বৃষ্টির পানি টপাটপ করে তাঁর কবরের ওপর আছড়ে পড়ে| সেই রহমতের ধারা গড়িয়ে গড়িয়ে মিশে যায় পাশের পুকুর, খাল আর নদীনালার সাথে| প্রকৃতি যেন সরাসরি তাঁর সাথে কথা বলে|
আশ্চর্যজনক এক আধ্যাত্মিক মিল লক্ষ্য করুন—তাঁর সুযোগ্য খলিফা, বিশ্ববরেণ্য শিক্ষাবিদ মাওলানা প্রফেসর আব্দুল খালেক ছতুরভী (রহ.)-এর মাজারটিও ঠিক একই ঘরানার| মসজিদের ভেতরে তাঁর স্থান হলেও, মাজারের ঠিক উপরে কোনো ছাদ নেই| সেখানেও আসমানের রহমত সরাসরি টপটপ করে তাঁর গায়ে পড়ে| পীর এবং মুরিদ—দুইজনই যেন লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে আকাশের সাথে এক গোপন মিতালিতে মত্ত|
লজিক হয়তো এখানে কাজ করবে না| তিনি হয়তো ভাববেন, ‘‘স্থাপত্যের কী এক ভুল!’’ কিন্তু সুফিদের সেই রহস্যময় চোখ দিয়ে তাকালে মনে হবে—যাঁরা সারাজীবন শরিয়ত আর তরিকতের কঠোর সাধনায় নিজেকে পুড়িয়েছেন, কবরে গিয়ে তাঁরা আর কোনো ছাদের নিচে বন্দি থাকতে চাননি| তাঁরা চেয়েছেন স্রষ্টার রহমত যেন কোনো বাধা ছাড়াই সরাসরি তাঁদের ওপর ঝরতে থাকে|
মানুষ মরে গেলে পচে যায়, কিন্তু ওলীরা মরে গিয়েও নদীর মতো বয়ে চলেন| সদরুদ্দীন (রহ.)-এর মাজারের সেই বৃষ্টির পানি যখন খালে-বিলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয় তাঁর আধ্যাত্মিকতা কেবল কবরে সীমাবদ্ধ নয়; তা প্রকৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়ে আমাদের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে|
দুনিয়াতে যাঁরা জৌলুস এড়িয়ে চলেন, খোদার আরশে তাঁদের জন্য জৌলুসের কোনো অভাব হয় না| এই খোলা আকাশই তাঁদের শ্রেষ্ঠ সামিয়ানা|
সমাপনী:
মহাপুরুষরা যখন চলে যান, তখন কি তাঁরা আসলেও চলে যান? সম্ভবত না| তাঁরা থেকে যান জরাজীর্ণ সেই সব মাদ্রাসার বারান্দায়, কোনো নিভৃত পল্লীর মক্তবে কিংবা মায়ার এক অদৃশ্য সুতোর টানে মানুষের হৃদয়ে| শাহ সুফি ছদরুদ্দিন (রহ.) হয়তো আজ ফেনীর মাটির নিচে নিভৃতে শায়িত, কিন্তু তাঁর ফেলে যাওয়া সেই জ্যোতি আজও মশাল হয়ে জ্বলছে| জগত বড়ই বিচিত্র; এখানে কেউ আসে ক্ষমতা নিয়ে রাজত্ব করতে, আর কেউ আসে সেই রাজত্ব তুচ্ছ করে মানুষের রূহকে জাগিয়ে দিতে| তিনি ছিলেন সেই দ্বিতীয় দলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র| রাত গভীর হলে হয়তো সেই ফেনীর আকাশ থেকে আজও ঝরে পড়ে এক টুকরো নূরানী মায়া, যা আমাদের কানে কানে বলে যায়—‘‘গন্তব্য যদি হয় পরম প্রিয় স্রষ্টা, তবে পার্থিব কোনো দাপটই চিরস্থায়ী নয়|’’