খুলনা প্রতিনিধিঃ
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে বেত দিয়ে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে সহকারী প্রধান শিক্ষক মোঃ শফিকুল ইসলাম মহসীনের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় মাত্র দুই মিনিট দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে ওই ছাত্রীকে বেত দিয়ে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ। এরপর অসুস্থ হয়ে শ্রেণিকক্ষেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। পরে তাকে দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীর মা ফরিদা পারভীন দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে নেমেছে উপজেলা প্রশাসন। ইউএনও জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতাও পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম মাসুমা (১৫)। সে সেনহাটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবারের ভাষ্য, কয়েকদিন ধরে সে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিল। অভিযোগপত্রে ফরিদা পারভীন উল্লেখ করেন, ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ২ মিনিটে তাঁর মেয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। ক্লাসে যেতে প্রায় দুই মিনিট দেরি হওয়ায় ক্লাস শিক্ষক মোঃ জসীম তাকে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে না দিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম মহসীনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে বলেন।
অসুস্থ শরীর নিয়ে মাসুমা তখন চারতলা ভবন থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। সেখানে শফিকুল ইসলামের কাছে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়ে শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার অনুমতি চায়। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে আবার শ্রেণিকক্ষের সামনে যেতে বলা হয়। এরপর চারতলায় ফিরে শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়ালে হাতে বেত নিয়ে সেখানে যান শফিকুল ইসলাম মহসীন।
অভিযোগ, তিনি মাসুমাকে হাত পাততে বলেন। মাসুমা হাত বাড়ালে তার হাতে বেত দিয়ে সজোরে দুই বাড়ি দেওয়া হয়। এরপর সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে সহপাঠীরা তাকে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে একপর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। বিদ্যালয় থেকে খবর পেয়ে ছুটে যান মাসুমার মা। পরে তাকে দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শুধু এবারের ঘটনা নয়, প্রায় দুই মাস আগেও একই শিক্ষক তাঁর মেয়েকে মারধর করে অজ্ঞান করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন মা ফরিদা পারভীন।
তিনি বলেন, দুই মাস আগেও আমার মেয়েকে এই শিক্ষক মোঃ শফিকুল ইসলাম মহসিন মারধর করে অজ্ঞান করে দিয়েছিলেন। তখনও আমরা কষ্ট পেয়েছি, বিষয়টি মেনে নিয়েছি। কিন্তু আজ আবারও একইভাবে আমার মেয়ের ওপর হাত তুলেছেন তিনি। শুধু দুই মিনিট দেরির অপরাধে একজন অসুস্থ মেয়েকে বেত দিয়ে পেটাতে হবে? একজন শিক্ষকের হাতে কি এভাবেই নিরাপদ থাকবে আমাদের সন্তান?
ফরিদা পারভীন আরও বলেন, বেতের আঘাতের পর আমার মেয়ে শ্রেণিকক্ষেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে আমরা ছুটে গিয়ে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। একজন মা হিসেবে এই দৃশ্য আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। আমি চাই, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এই শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এমন শাস্তি চাই, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষক আর কোনো শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলার সাহস না পান। তিনি যেন আর সেনহাটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের দায়িত্বে না থাকেন।
ভুক্তভোগীর পিতা মাকসুদ মোড়ল বলেন, শিক্ষক শফিকুল ইসলাম মহসিন সবসময় টাকার জোরে ক্ষমতা দেখান। আমার মেয়েকে কেন এভাবে মারলেন? বেত দিয়ে আঘাত নিষিদ্ধ থাকার পরও কীভাবে তিনি বেত ব্যবহার করেন? আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই। মহসীনকে বরখাস্ত করা হোক। তা না হলে এই স্কুলে দিন দিন শিক্ষার্থী কমবে। এমন একজন শিক্ষকের কাছে আমি কীভাবে আমার মেয়েকে স্কুলে পাঠাব?
ঘটনার বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ মোঃ ফরহাদ হোসেন বলেন, ঘটনার সময় তিনি ক্লাসে ছিলেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছেন।
তিনি বলেন, ঘটনার সময় আমি ক্লাসে ছিলাম। যতটুকু জেনেছি এবং সিসিটিভিতে দেখেছি, শিক্ষার্থীকে প্রতীকী শাস্তি হিসেবে দুইটি বেতের বাড়ি দেওয়া হয়েছে। ওই মেয়েটার কিছুদিন আগে অপারেশন হয়েছে বলে শুনেছি। সে কারণে হয়তো এমন হয়েছে। পরে একটি ক্লাস পড়ার পর সে অজ্ঞান হয়েছে।
অর্থাৎ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী শিক্ষার্থীকে বেত দিয়ে আঘাত করার ঘটনাটি পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে ওই আঘাতের পর শিক্ষার্থী কেন অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হলো, তার চিকিৎসাগত কারণ কী তা চিকিৎসা নথি ও তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম মহসীনের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও তুলেছে স্থানীয়রা। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক শেখ মোঃ ফরহাদ হোসেন বলেন, আমি শুনেছি তাঁর ছেলের একটি ব্যবসা আছে। মহসীন আমাকে জানিয়েছেন, ওই ব্যবসার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ বিষয়ে এর বেশি আমি কিছু জানি না। সরকারি চাকরির পাশাপাশি নিজে ব্যবসা পরিচালনা করা চাকরিবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন দাস গুপ্ত বলেন, সহকারী প্রধান শিক্ষক মোঃ শফিকুল ইসলাম মহসীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমরা পেয়েছি এবং প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতাও পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন শিক্ষক কোনোভাবেই শিক্ষার্থীর প্রতি শারীরিক নির্যাতনকে শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন না।
তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পাশাপাশি শফিকুল ইসলাম মহসীনের ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা হবে। তদন্তে চাকরিবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সহকারী প্রধান শিক্ষক মোঃ শফিকুল ইসলাম মহসীনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমবার কলটি সংযোগ হলেও পরবর্তীতে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এখন তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিসিটিভি ফুটেজ, শিক্ষার্থীর চিকিৎসার নথি, প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বক্তব্য এবং আগের মারধরের অভিযোগের সত্যতা যাচাই। একজন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়ার নামে বেত ব্যবহার করা, এরপর তার অসুস্থ হয়ে পড়া ও অজ্ঞান হওয়ার ঘটনায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষকদের জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।