অর্থ সংকটে ইউনিসেফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রাথমিক স্তরের শ্রেণিকক্ষ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এর জেরে চাকরি হারানো স্বেচ্ছাশিক্ষকদের সহিংস বিক্ষোভ, হুমকি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
তিনি বৃহস্পতিবার ঢাকার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
কক্সবাজারে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য শিক্ষা এতদিন ছিল সবচেয়ে বড় ভরসা। কিন্তু তহবিল অর্ধেকের বেশি কমে যাওয়ায় এ বছরই ইউনিসেফকে কিন্ডারগার্টেন ও প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুল বন্ধ করতে হয়।
ফ্লাওয়ার্স বলেন, “আমার জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু সত্য হলো—এই স্কুলগুলো চালিয়ে নেওয়ার মতো অর্থ আমাদের হাতে ছিল না।”
ইউনিসেফ বর্তমানে ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা করছে, যেখানে প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার শিশু পড়াশোনা করছে। তবে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১,১৭৯ জন স্বেচ্ছাশিক্ষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এদের মধ্যে ৬০ শতাংশ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন, ২৫ শতাংশ যোগ দিয়েছেন ইউনিসেফের স্কিলফো কর্মসূচিতে (দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ), আর বাকি ১৫ শতাংশ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
চাকরিচ্যুত কিছু শিক্ষক সহিংস আচরণ করেছেন। ফ্লাওয়ার্স জানান, এর মধ্যে মানবিক সহায়তা কর্মীদের হুমকি, স্থানীয় এনজিও কর্মকর্তাদের আটকে রাখা, জানালা ভাঙচুর, এমনকি মারধরের ঘটনাও রয়েছে।
এক ঘটনায় এক কর্মীকে চেয়ার দিয়ে আঘাত করার পর হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। অন্যত্র শ্রেণিকক্ষ তালাবদ্ধ করা, সহকর্মীদের জোরপূর্বক বের করে দেওয়া, এবং ভুয়া অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে।
একটি হুমকির বার্তায় লেখা ছিল—“টেকনাফের রাস্তায় রক্ত ঝরবে।”
১৮ আগস্ট চাকরিচ্যুত শিক্ষকরা কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের কোর্ট বাজার এলাকায় ১০ ঘণ্টা অবরোধ দেন, ফলে ক্যাম্প থেকে জেলা শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দুই দিন পর, ২০ আগস্ট, পুলিশ ২৮ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে, যদিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছেড়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশি এনজিও কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, কিন্তু ভয়ে অনেকে থানায় অভিযোগও করতে পারছেন না বলে জানান ফ্লাওয়ার্স। এ কারণে ইউনিসেফ সরকারের কাছে aid worker দের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছে।
এই সহিংসতা আসলে রোহিঙ্গা সঙ্কটের তহবিল ভাঙনের প্রতিফলন। কেবল শিক্ষা খাতে ইউনিসেফের বাজেট অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। শুধু শিক্ষক ভাতা চালাতেই বছরে কমপক্ষে ১৫ মিলিয়ন ডলার দরকার। এর বাইরে খাদ্য, জ্বালানি কাঠ, সাবান, স্বাস্থ্যসেবা, পয়োনিষ্কাশন—সব কিছুতেই সংকট বাড়ছে। আগে প্রতিটি পরিবার মাসে চারটি সাবান পেত, এখন তা কমে একটিতে নেমেছে।
ফ্লাওয়ার্স বলেন, সীমিত সম্পদ দিয়ে তারা মাধ্যমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, কারণ কিশোর-কিশোরীদের জন্য এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকলে শিশুবিবাহ, যৌন শোষণ ও অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
“প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধ করা কষ্টকর, কিন্তু বড় শিশুদের আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করাটাই এখন জরুরি,” তিনি বলেন।
যেসব স্বেচ্ছাশিক্ষক বেকার হয়েছেন, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কেউ স্কিলফো প্রোগ্রামে যোগ দিয়েছেন, কেউ প্রশিক্ষণ নিয়ে সার্টিফাইড শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে অর্থ সংকট কাটতে না পারলে এসব কর্মসূচির ভবিষ্যতও অনিশ্চিত।
সহিংসতার কারণে মানবিক সহায়তা কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
ফ্লাওয়ার্স জোর দিয়ে বলেন, “এটা শিশুদের জন্য জীবনরক্ষাকারী কাজ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এখনই এগিয়ে না আসে, তবে আমরা শিশু টিকে থাকার ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে পড়ব।