নোয়াখালী প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় তিনটি বিদেশি পিস্তল, গুলি, ম্যাগাজিন এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন একটি রয়্যাল এনফিল্ড মোটরসাইকেলসহ গ্রেপ্তার আবদুর রহমান রাহিমের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
গতকাল (৯ জুন) সন্ধ্যায় সে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও বেগমগঞ্জ ৩ আসনের বিগত নির্বাচনের সংসদ সদস্য প্রার্থী বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে তার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর কিছু সময় পরই নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য স্ত্রী শামীমা বরকত লাকী এবং বেগমগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামাক্ষ্যা চন্দ্র দাসের সঙ্গেও রাহিমের ছবি প্রকাশ্যে আসে।
সরেজমিনে বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বসন্তবাগ ভূঁইয়া বাড়ি এলাকায় গিয়ে জানা যায়, আবদুর রহমান রাহিম ওমান প্রবাসী জসিম উদ্দিনের ছেলে। জসিম উদ্দিনের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে রাহিম সবার বড়।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছাত্রজীবনে রাহিম ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের একাধিক নেতাকর্মী জানান, ২০২৪ সালে সে ছাত্রশিবিরের কর্মী ও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। তবে ২০২৫ সালে প্রেমঘটিত একটি কারণে তাকে ছাত্রশিবির থেকে বহিষ্কার করা হয়। সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সে জামায়াতকে সমর্থন করতো বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবী করেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাহিম তার মামা ও বেগমগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিবুল হাসান সম্রাটের সঙ্গে চলাফেরা শুরু করে। রাহিম মূলত সম্রাটের হয়ে এলাকায় অস্ত্র, ইয়াবা ও মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতো। বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা সরবরাহের কাজে রাহিমকে সহযোগিতা করতো তার মামাতো ভাই ও গোপালপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রিফাত।
পুলিশ জানায়, নিয়মিত চেকপোস্ট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে একটি মোটরসাইকেল তল্লাশি করার সময় রাহিমের কোমরে থাকা তিনটি বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে জব্দ করা হয় রেজিস্ট্রেশনবিহীন রয়্যাল এনফিল্ড মোটরসাইকেল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাক্তি জানান, মোটরসাইকেলটির প্রকৃত মালিক ছাত্রদল নেতা রাকিবুল হাসান সম্রাট। মোটরসাইকেলের পেছনে বসে সম্রাট নিজেই এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বেগমগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিবুল হাসান সম্রাট বলেন, “আবদুর রহমান রাহিম আমাদের পাশের এলাকার ছেলে, তাকে আমি চিনি। সে আগে ছাত্রলীগ এবং পরে জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিল। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র বা মোটরসাইকেল—কোনোটিই আমার নয়। এর সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই।”
এদিকে, অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়া আবদুর রহমান রাহিম স্থানীয় জামায়াতের কর্মী দাবি করে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামাক্ষ্যা চন্দ্র দাস।
অন্যদিকে, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, “পুলিশের হাতে অস্ত্রসহ আটক ব্যক্তির সঙ্গে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাচনের সময় অনেকেই প্রার্থীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, তাতে তো কেউ দলীয় কর্মী হয়ে যান না। আমি যতটুকু জেনেছি, ভোটের পর থেকে রাহিম স্থানীয় ছাত্রদল কর্মী সম্রাটের সঙ্গে চলাফেরা করতো। আটককৃত মোটরসাইকেলটিও সম্রাটের।”
নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন জানান, মোটরসাইকেল আরোহীর গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় তাকে তল্লাশি করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, আটটি গুলি ও তিনটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে।
বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামসুজ্জামান জানান, বেগমগঞ্জে অবৈধ অস্ত্রধারী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। গ্রেপ্তারকৃত রাহিমকে নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।