আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গত ১০ বছর ধরে দেদারসে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে চীন। তবে গত বছর ইউরোপে চীনা বিনিয়োগের স্রোত উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। মূলত করোনাভাইরাস মহামারি ও রাজনৈতিক সংকটই ইউরোপে চীনা বিনিয়োগ হ্রাসের মূল কারণ।
ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭টি দেশ ও যুক্তরাজ্যে গত বছর চীনের মোট বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৭৮০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে এর আগের বছর বা ২০১৯ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪১০ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে ইউরোপে চীনের বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। মার্কিন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান রোডিয়াম গ্রুপ ও জার্মান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক মের্কাটর ইনস্টিটিউটের এক যৌথ সমীক্ষার প্রতিবেদন এসব তথ্য দাবি করা হয়েছে। সাউথ চায়না মোর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন।
অর্গেনাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) এক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০০৫ সালের পর বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাসের এই হার সর্বনিম্ন। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে চীনের বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ার তথ্যটি অস্বাভাবিক নয়।
তবে বিনিয়োগ সংক্রান্ত এ তথ্যটির তাৎপর্য হলো অন্য জায়গায়। মহামারি শুরুর পর বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, অর্থনৈতিক মন্দার সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনের বিনিয়োগকারীরা ইউরোপে সম্পদ কিনে রাখতে পারেন বা বিনিয়োগ বাড়িয়ে সম্পদ কুক্ষিগত করতে পারেন। তবে সর্বশেষ এ সমীক্ষায় পাওয়া তথ্য ওই আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করেছে। উল্লেখ্য যে, ২০২০ সালে চীনের মোট বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এ সময় চীন বিদেশে মাত্র ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ইউরোপে চীনা বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ার জন্য মহামারির পাশাপাশি আরও কিছু কারণকে দায়ী করা হয়েছে এ সমীক্ষার প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, কোভিড-১৯ দ্বারা সৃষ্ট অনিশ্চয়তা ছাড়াও এই পতনের একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের বাইরে বিনিয়োগে খোদ বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত, ইউরোপে চীনা বিনিয়োগে তদারকি বৃদ্ধি ও চীনের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির অবনতি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মহামারির আগেই ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ইইউ বহির্ভূত বিনিয়োগের উপর নজরদারী বাড়ানোর প্রক্রিয়া চালু হয়। এর অংশ হিসেবে ইইউ’র ১৪টি সদস্য দেশ গত বছর তাদের বৈদেশিক বিনিয়োগ পদ্ধতির আধুনিকায়ন করে। কিছু ইউরোপীয় দেশ কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আটকে দেয়।
ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে ইউরোপে চীনা বিনিয়োগ গ্রহণকারী শীর্ষ দেশ জার্মানি। দেশটি ইউরোপে মোট চীনা বিনিয়োগের ৩০ শতাংশই গ্রহণ করেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পোল্যান্ড। দেশটি গত বছর ৮১৫ মিলিয়ন ডলার চীনা বিনিয়োগের গন্তব্য ছিল। তবে গত বছর চীনের বিনিয়োগ সবচেয়ে হ্রাস পেয়েছে যুক্তরাজ্যে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেদেশে চীনা বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে ৭৭ শতাংশ। তার পরেও দেশটি ইউরোপে চীনা বিনিয়োগ গ্রহণকারী হিসেবে তৃতীয় স্থান ধরে রেখেছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারি কেটে গেলেও ইউরোপে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে না, বরং আরও কমতে পারে। কারণ ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে এ বছর থেকে চীনের সম্পর্ক নতুন ধারায় মোড় নিয়েছে। চীন ও ইইউ এর মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কে ক্রমে তিক্ততা বাড়ছে। সম্প্রতি চীনের সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট (সিএআই) চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পার্লামেন্ট। ওই চুক্তিটি গত বছরের ডিসেম্বরে ইইউ পার্লামেন্ট প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছিল। এছাড়া এ বছর চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুতে চারটি চীনা কোম্পানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইইউ। এর বাইরে দক্ষিণ চীন সাগর ও দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের তৎপরতায়ও ইইউর সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে বেইজিংয়ের।
আরও পড়ুন
সারাবাংলা/আইই