
থুলনার পাইকগাছায় গত দুদিনে দুটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট।শুক্রবার দুপুরে উপজেলার হরিঢালী উলুডাঙ্গা রহিমপুর গুচ্ছ গ্রামের শাহীন মোড়লের মেয়ের সাথে একই ইউনিয়নের আ. সবুর গাজীর ছেলে রহিমের (১৮) সাথে বিয়েরআয়োজন করা হয়। কনে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী।
সংবাদ পেয়ে শুক্রবার সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম এর নির্দেশে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)
শাহরিয়ার বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দেন। তবে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে আগেই গোপণে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হয়েছে বলে ছেলের এলাকার মানুষ জানায়। এর আগে বুধবার রাড়ুলি গ্রামের লুৎফর গোলদারের ৮ম শ্রেণীর পড়ুয়া মেয়ের বিবাহের আয়োজন হয় লস্কর গ্রামের নান্টু গাজীর ছেলে নঈম গাজীর সাথে। সংবাদ পেয়ে নবাগত ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মমতাজ বেগম বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দেন। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ‘বিবাহের ঘোষণাপত্র’ তৈরি করে দিচ্ছেন একশ্রেণির অসাধু আইনজীবী। সেই ঘোষণাপত্রকে ঢাল বানিয়ে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে। উপজেলায় গত ২মাস আগে এমন ৯টি বাল্যবিবাহের তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব ঘটনায় অভিভাবকদের জরিমানা করেছে প্রশাসন। দুই আইনজীবীকে আসামি করে মামলাও হয়েছে পাইকগাছা থানায়। স্থানীয় কাজিরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছেলেমেয়েদের এভাবে ‘বিয়ে’ দিচ্ছেন অভিভাবকেরা। উপজেলা কাজি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল কাদির বলেন, নিকাহ রেজিস্ট্রাররা কোনো বিয়ে নিবন্ধন করার সময় ছেলেমেয়ের জন্মনিবন্ধন, স্কুল বা কলেজের সনদসহ বিভিন্ন কিছু যাচাই করেন। এ কারণে যদি কারও বয়স কম থাকে, তখন ওই বিয়ে নিবন্ধন করাতে
অস্বীকার করেন তাঁরা। তখন ওই পক্ষ চলে যায় আইনজীবীর কাছে। ভুয়া জন্মনিবন্ধন নিয়ে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ‘বিবাহের ঘোষণাপত্র’ নামের একটি লিখিত নথি তৈরি করেন তাঁরা। এটিকেই অনেকে বিয়ে বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত উপজেলায় ৯টি বাল্যবিবাহের ঘটনায় জরিমানা করেছে প্রশাসন। সব কটি ঘটনার ক্ষেত্রেই নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে কথিত বিয়ের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা সদ্য বদলীকৃত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, করোনা ও স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় অভিভাবকেরা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। আর বিয়ে দিতে তাঁরা নানাভাবে জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন। এ কারণে বাল্যবিবাহ বন্ধ হচ্ছে না।
পাইকগাছা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আবদুস সাত্তার বলেন, যাঁরা এমন অবৈধ কাজ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কথিত বিয়ের এমন ঘটনায় আইনজীবীদের বিরুদ্ধে গত ১৪ আগস্ট পাইকগাছা থানায় মামলা করেছেন এক মা। তাঁর অভিযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রতিবন্ধী মেয়েকে অপহরণের পর কৌশল করে ‘বিয়ে’ দেওয়া হয়েছে। মামলায় দুই আইনজীবীকে আসামি করেন তিনি। ওই ঘটনার পর সতর্কতা হিসেবে আইনজীবী, পুলিশসহ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছে উপজেলা প্রশাসন।
৫ আগস্ট উপজেলার ভিলেজ পাইকগাছা গ্রামের এক কিশোরীর সঙ্গে গোপালপুর গ্রামের এক তরুণের বিয়ের আয়োজন করছিলেন অভিভাবকেরা। জন্মসনদ অনুযায়ী, মেয়েটির বয়স মাত্র ১২ বছর ৮ মাস, আর তরুণের বয়স ১৯ বছর। ১ আগস্ট নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ১০০ টাকার একটি স্ট্যাম্পে ‘বিবাহের ঘোষণাপত্র’ দেওয়া হয়। সেখানে তরুণের বয়স ২২ ও মেয়েটির বয়স ১৯ বছর দেখানো হয়। ওই স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করেন পাইকগাছা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের আইনজীবী রেহানা পারভীন। ঘোষণাপত্রে লেখা ছিল, ‘আমরা দেশের আইন মোতাবেক সাবালক ও সাবালিকা হইতেছি। দীর্ঘদিন যাবৎ আমরা একে অপরকে চিনি ও জানি। অতঃপর আমাদের উভয় পরিবারের অভিভাবকবৃন্দের সম্মতিক্রমে আমরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
ওই ‘বিয়ে’র ব্যাপারে আইনজীবী রেহানা পারভীন বলেন, ‘স্ট্যাম্পে লেখার সময় দুই পক্ষের অভিভাবকেরাই উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বর-কনের জন্মসনদ দিয়েছিলেন, সেই অনুযায়ী লেখা হয়। পরে জেনেছি, ওই জন্মসনদ ভুয়া। ব্যাপারটি নিয়ে আমি খুব বিব্রত।
পাইকগাছায় কোথাও বাল্যবিবাহের কথা শুনলে তা যাচাই করার জন্য সেখানে পাঠানো হয় উপজেলা আনসার ও ভিডিপি প্রশিক্ষক মো. আলতাফ হোসেনকে। তিনি বলেন, যত বাল্যবিবাহের ঘটনা দেখা গেছে, অধিকাংশই নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে অ্যাফিডেভিট করে নেওয়া। কাগজপত্র যাচাই–বাছাই করে ও খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মেয়ে বা ছেলের বয়স বেশ কম। গত ৩০জুলাই উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের তোকিয়া গ্রামে এমনই একটি বিয়ের আয়োজন হচ্ছিল।
খুলনা জজকোর্টের আইনজীবী কিউ এস আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত ‘বিবাহের ঘোষণাপত্রে’ ছেলের বয়স লেখা ছিল ২৫ ও মেয়ের ১৮ বছর ৬ মাস। উপজেলা আনসার ও ভিডিপি প্রশিক্ষক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, জন্মনিবন্ধন যাচাই করে দেখা যায়, মেয়েটির বয়স মাত্র ১০ বছর ৬ মাস। আর ছেলের বয়স ৩৪ বছর। আইনজীবী কিউ এস আসাদুজ্জামান বলেন, অনেক সময় ছেলে-মেয়েদের বয়স যাচাই করা হয়, অনেক সময় হয় না। দুই পক্ষ থেকে যে বয়স বলা হয়, সেটিই লেখা হয়। তাঁরা শুধু আইনজীবী হিসেবে লেখার কাজটি করেন। যাঁরা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ওই কাজ করছেন, সেসব আইনজীবীকে আইনের আওতায় আনা দরকার বলে মনে করেন পাইকগাছায় পূর্ববর্তী ইউএনও এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী। তিনি বলেন, এই কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকতে পাইকগাছা আইনজীবী সমিতিকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তবে শুক্রবার প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাল্যবিয়ে ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার হক বলেন, ইউএনও স্যার নির্দশনায় বিয়েটা বন্ধ করে দিয়েছি। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও আনসার সদস্য পাঠিয়ে আগে বাল্য বিবাহ বিষয় নিশ্চিত হয়েছি। বয়স ১৮বছর পূর্ণ না হলে বিয়ে দিবে না এ মর্মে মেয়ের বাবা বন্ড দিয়েছে। ছেলের পূর্ণ ঠিকানা নিয়েছি, এর পরও আইন অমান্য করলে ব্যবস্থা নিবো।