জামালপুর প্রতিনিধি:
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার মূলবাড়ী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া সংগ্রামী নারী সাদিয়া হক দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে নিজেকে একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ত্যাগ, সাহসিকতা ও আপোষহীন অবস্থানের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
১৯৯১ সালে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী খুরশীদ জাহান হকের হাত ধরে তাঁর রাজনীতিতে পথচলা শুরু হয়। এরপর থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর আন্দোলন, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন সাদিয়া হক। দুই শিশু সন্তানকে ঘরে রেখে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ঘটনাগুলো তাঁকে সহকর্মীদের কাছে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। দলের দুঃসময়ে সামনের সারিতে অবস্থান নেওয়ায় সে সময়কার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন।
২০১১ সালে হরতাল কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় গুলশান এলাকা থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানের সঙ্গে গ্রেফতার হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাভোগ করেন তিনি। এছাড়া ২০১৩ সালের ২৯ মে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির দিন নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয় থেকে আটক করে মতিঝিল থানায় নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, আটক অবস্থায় তাঁকে মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং ন্যূনতম মানবিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়।
২০১৫ সালেও হরতাল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই দফা গুলশান থানায় আটক রাখা হয় তাঁকে। সহকর্মীদের দাবি, ওই সময় তাঁকে দীর্ঘ সময় খাবার না দিয়ে রাখা এবং মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, বিভিন্ন সময় আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁর ওপর ধারাবাহিক মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবরের সমাবেশকে কেন্দ্র করে গুলশান-বনানী থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় একমাত্র নারী আসামি হিসেবে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে বোমাবাজি ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দলীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তিনি গুলশান থানা মহিলা দলের সাবেক আহ্বায়ক, ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সাবেক এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক, ১৯৯৪ সালের ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং জামালপুর জেলা কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়া শেরপুর জেলা মহিলা দল গঠনের দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে তিনি নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। সংগঠনটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান।
সরিষাবাড়ী উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম তালুকদার বলেন, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকার প্রায় সব কর্মসূচিতেই আমরা সাদিয়া হককে সামনের সারিতে দেখেছি। দুঃসময়ে তিনি কখনো পিছিয়ে যাননি।
গুলশান থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও মহানগর উত্তর বিএনপির বর্তমান কমিটির সদস্য আব্দুল আলীম নকি বলেন, সাদিয়া হক একজন ত্যাগী ও নির্যাতিত নেত্রী। দলের কঠিন সময়ে তিনি রাজপথ ছাড়েননি। বারবার গ্রেফতার ও মানসিক নির্যাতনের মুখেও সংগঠনের পাশে থেকেছেন।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগের মূল্যায়ন হিসেবে তাঁকে সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি করা হলে তা যথার্থ সিদ্ধান্ত হবে।
রাজনৈতিক সহকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিনের মাঠ পর্যায়ের সক্রিয়তা, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অনড় অবস্থান সাদিয়া হককে একজন দৃঢ়চেতা নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁদের ভাষ্য, তাঁর রাজনৈতিক পথচলা ত্যাগ, সাহস ও আদর্শিক অবস্থানের এক ধারাবাহিক ইতিহাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।