জবি: নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে প্রায় ২২ শতাংশ সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) দুই বিভাগের শিক্ষকদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি। টেকসই কৃষির লক্ষ্যে রিমোট সেন্সিংভিত্তিক নির্ভুল নাইট্রোজেন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ‘N-FertiSmart’ উদ্ভাবন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের যৌথ গবেষক দল।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি ডিভিশন) সহযোগিতায় পরিচালিত প্রকল্পটির প্রোটোটাইপ ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এ উপস্থাপন করা হয়েছে। মেলায় ‘N-FertiSmart: Remote Sensing Based Precision Nitrogen Management for Sustainable Agriculture in Bangladesh’ শিরোনামে ২৬ থেকে ৩৪ নম্বর স্টলে প্রযুক্তিটি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন জবি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ড. মো. আতাউল গনি ও অধ্যাপক ড. এ এম এম গোলাম আদম এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। গবেষণা কার্যক্রমে আরও যুক্ত রয়েছেন দুই বিভাগের তরুণ গবেষক বিপ্লব বিশ্বাস ও মো. নাজিম শরিফ।
গবেষকদের তৈরি ‘N-FertiSmart’ প্রযুক্তি কৃষিজমির কোন অংশে কতটুকু নাইট্রোজেনের প্রয়োজন রয়েছে, তা শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগে সহায়তা করবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে পুরো জমিতে একই মাত্রায় সার প্রয়োগ করা হলেও এই প্রযুক্তিতে রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যমে জমির বিভিন্ন অংশের অবস্থা বিশ্লেষণ করে স্থানভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব হবে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মাটি, পানি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সার অপচয়ের কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবেশদূষণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ঝুঁকিও তৈরি হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জমির নাইট্রোজেনের ঘাটতি শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগের লক্ষ্যেই প্রযুক্তিটি তৈরি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জবি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এম এম গোলাম আদম বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। ফসলে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের প্রায় ৬০ শতাংশই অপচয় হয়, যা গাছের কোনো কাজে না এসে উল্টো পানির সঙ্গে মিশে পরিবেশ, মাটি ও গাছের শিকড়ের ক্ষতি করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতি বছর এলাকাভিত্তিক সারের সঠিক চাহিদা নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, বিদ্যমান সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে অন্তত ২২ শতাংশ সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব। এতে সারের অপচয় ও কৃষকের খরচ কমার পাশাপাশি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থা গড়ে উঠবে।’
প্রকল্পের ওয়ার্কফ্লো অনুযায়ী, রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যমে কৃষিজমির বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে NDVI, B11 ও LULC-এর মতো র্যাস্টার ডেটা প্রি-প্রসেসিং, অ্যালাইনমেন্ট ও পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। পরে PDR হিসাবের মাধ্যমে জমির নাইট্রোজেনের প্রয়োজনীয়তা ও ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা হয়।
গবেষণায় ব্যবহৃত Fertilizer Recommendation Guide 2024 অনুযায়ী, হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৭৪ কেজি নাইট্রোজেন সার প্রয়োগের সুপারিশ রয়েছে। তবে ‘N-FertiSmart’ প্রযুক্তির মাধ্যমে জমির প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে এই পরিমাণ সর্বোচ্চ প্রায় ১৩৫ দশমিক ৯০ কেজিতে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষকদের দাবি, এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে প্রচলিত সুপারিশের তুলনায় হেক্টরপ্রতি গড়ে প্রায় ২২ শতাংশ নাইট্রোজেন সার কম ব্যবহার করা সম্ভব। এতে কৃষকের সার বাবদ ব্যয় কমার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং অতিরিক্ত সার ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর সৃষ্ট চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অধ্যাপক ড. এ এম এম গোলাম আদম বলেন, কৃষকরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করায় তাদের বাড়তি খরচ হচ্ছে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন পরিবেশে গিয়ে পানির জীববৈচিত্র্য ও জলজ প্রাণীরও ক্ষতি করতে পারে। স্যাটেলাইটভিত্তিক পদ্ধতিতে ডিনাইট্রিফিকেশন রেট পরিমাপ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে গড়ে প্রায় ২২ শতাংশ নাইট্রোজেন সার কমানো সম্ভব বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রচলিত সার সুপারিশ নির্দিষ্ট সময় পরপর হালনাগাদ করা হলেও স্যাটেলাইটভিত্তিক পদ্ধতিতে প্রতিবছর মাটির অবস্থা ও ডিনাইট্রিফিকেশন রেট অনুযায়ী সারের পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে। ফলে কৃষকরা অতিরিক্ত সার প্রয়োগ এড়াতে পারবেন এবং দেশের চলমান সার সংকট কমাতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্পের কম্পিউটার সায়েন্স ও প্রযুক্তিগত অংশের সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য ও ডেটা বিশ্লেষণকে কাজে লাগিয়ে কৃষিজমির অবস্থাভেদে নাইট্রোজেনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা সম্ভব। এর ফলে একই পরিমাণ সার সব জমিতে প্রয়োগের পরিবর্তে জমির প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এতে একদিকে কৃষকের খরচ কমবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত সার ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়, সেটিও কমানো সম্ভব হবে। আমরা এই গবেষণার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় থেকেও অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। উদ্ভাবনটি বর্তমানে নভোথিয়েটারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার’-এ অংশগ্রহণ করেছে।’