শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৪ অপরাহ্ন

৫৫৬ তম নানক জয়ন্তী চট্টগ্রাম ও ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব ‘গুর পরব’

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৫১ সময় দেখুন
৫৫৬ তম নানক জয়ন্তী চট্টগ্রাম ও ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত  শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব ‘গুর পরব’

রাজিব শর্মা
শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক দেবের ৫৫৬তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় শিখ সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ‘গুর পরব’ সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়েছে।
শনিবার সারাদিন চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকায় অবস্থিত শিখ টেম্পল ‘স্টেট গুরুদুয়ারায়’ দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে শুক্রবার সারাদিনব্যাপী প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান পালিত হয় রাজধানীর গুরু নানক শাহী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। দুই শহরের গুরুদুয়ারায় দুইদিনব্যাপী ‘অখণ্ড পাঠ’, ‘কীর্তন’, ‘লঙ্গর খানা’ ও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে বসবাসরত শিখ ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি ভারতের পাঞ্জাব থেকে আগত পুণ্যার্থীরাও অংশ নেন এবং বিশেষ প্রার্থনা করেন।
গুরুদুয়ারা নানকশাহী ম্যানেজমেন্ট কমিটির আয়োজনে ঢাকার প্রথম পর্বের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা। বিশেষ অতিথি ছিলেন অ্যাজেপ সিং বোপারা ও হরভজন সিং সেন্দু। এছাড়া দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠানে ভারতের পাঞ্জাব থেকে পুণ্যার্থী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জসোভন্ত সিং, মনোজিৎ সিং সাওলা ভোম্বা ওয়াত্তো, সুখদেব সিংসহ শতাধিক অনুসারী। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ঢাকা গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যরাও।
গুরুদুয়ারা ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা বলেন, “বাংলাদেশে শিখ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা কম হলেও প্রতি বছর উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশবিদেশের ভক্তদের ভিড় হয়। গুরু নানকের বাণী-বিশেষত ‘এক ওঙ্কার’ বা এক ঈশ্বরের ধারণা-সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা দেয়। আমরা এই উৎসবের মাধ্যমে সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিই।”
পাঞ্জাব থেকে আগত পুণ্যার্থী রনজিত সিং বলেন, “বাংলাদেশে গুরুদুয়ারায় আসা আমার বহুদিনের ইচ্ছে ছিল। এবার প্রথমবার এসে খুব ভালো লাগছে। গুরুজি আমার সেই ইচ্ছে পূরণ করেছেন।”
পুণ্যার্থী মনোজিৎ সিং বলেন, “গুরুদুয়ারা আমাদের জন্য অন্যতম পবিত্র স্থান। পৃথিবীর যে প্রান্তেই গুরু নানকের স্মৃতি থাকে, আমরা চেষ্টা করি অন্তত একবার সেখানে যেতে। প্রতিবছরই আমরা বাংলাদেশে আসি। এবারও এসেছি। প্রশাসনিকভাবে আমরা যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি।”
ঢাকার গুরুদুয়ারা ম্যানেজিং কমিটির নির্বাহী সদস্য শুভাশিষ দাস বলেন, “বাংলাদেশে শিখ সম্প্রদায় ছোট হলেও আমরা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশের জনগণ সবসময় আমাদের পাশে থাকে—যা গুরু নানকের সহমর্মিতার বার্তাকে আরও শক্তিশালী করে।”
বাংলাদেশ শিখ ম্যানেজিং কমিটির সদস্য শ্যাম দাস বলেন, “বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। শিখ সম্প্রদায়ের এই উৎসব আমাদের বহুত্ববাদের চর্চাকে সামনে আনে। আমরা প্রতি বছর গুর পরব উপলক্ষে অখণ্ড পাঠ, নগর কীর্তন ও লঙ্গর খানা আয়োজন করি। স্থানীয় মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ—সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নেন। এটি আমাদের সৌহার্দ্যের দৃষ্টান্ত।”
চট্টগ্রাম গুরুদুয়ারা স্টেট টেম্পলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য গুরুপ্রীত কৌর বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবছরও যথাযথ নিয়মে গুর পরব পালন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা সহযোগিতা করেছেন। কোনো অনিয়ম বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সকল ধর্মের মানুষ আমাদের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। আমরা অসাম্প্রদায়িকতার মধ্য দিয়ে গুরু নানকের বাণী প্রচার করতে চাই।”
চট্টগ্রাম গুরুদুয়ারার প্রধান গ্রন্থি (ধর্মীয় প্রধান) সিং বীর সিং বলেন, “গুরু নানক ছিলেন মানবতার আলোকবর্তিকা। তিনি শিখিয়েছেন – মানুষের প্রথম পরিচয় মানবতা, পরে ধর্ম। অসমতা, বর্ণবৈষম্য, প্রতিহিংসা ও সহিংসতা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা তিনি দিয়েছেন। আজকের পৃথিবীতে এই বাণী আরও প্রয়োজনীয়।”
চট্টগ্রাম গুরুদুয়ারা দেশের অন্যতম প্রাচীন শিখ উপাসনালয়। এখানে নিয়মিত প্রার্থনা, কীর্তন ও ধর্মীয় আলোচনা আয়োজন করা হয়। গুর পরব, বৈশাখীসহ শিখ ধর্মের প্রধান উৎসবে বিদেশি ভক্তদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত গুরুদুয়ারা নানকশাহী বাংলাদেশে শিখ ধর্মের সবচেয়ে পরিচিত উপাসনালয়। শিখ ধর্মাবলম্বীদের মতে, গুরু নানক দেব তাঁর প্রথম ‘উদাসি’ ভ্রমণের সময় এ স্থানের কাছাকাছি অবস্থান করেছিলেন—এ ঐতিহ্যের ভিত্তিতেই এর নামকরণ হয় ‘নানকশাহী’। ১৯৪৭ সালের পর ভারতীয় ও পাঞ্জাবি সম্প্রদায়ের সহায়তায় গুরুদুয়ারাটি সংস্কার করা হয়। বর্তমানে এখানে নিয়মিত কীর্তন, অখণ্ড পাঠ ও লঙ্গরের আয়োজন হয়।
অনুষ্ঠান শেষে বিকেল পর্যন্ত দুই শহরের গুরুদুয়ারাগুলোতে কীর্তন ও লঙ্গর চলতে থাকে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় শান্তি প্রার্থনা ও বিশেষ আরদাস। দিনভর ভক্তদের অংশগ্রহণে উৎসব প্রাঙ্গণ ছিল শান্তি, ভক্তি ও সম্প্রীতির আবহে পরিপূর্ণ।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর