সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২১ অপরাহ্ন

ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করতে পারে যুদ্ধের সমাপ্তি

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৬ সময় দেখুন
ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করতে পারে যুদ্ধের সমাপ্তি


ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের ছয় মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এখনো ঘুরেফিরে একটি প্রশ্নই ইরানের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে আর তা হল- ‘যুদ্ধ নাকি সমঝোতা’। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধটি ছিল ইরানের ওপর একটি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। যার ফলাফল কোন পক্ষ বেশি শক্তিশালী তার উপর নির্ভর করবে না – বরং কোন পক্ষ টিকে থাকবে তার উপর নির্ভর করবে। অন্যদিকে, একটি অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী শিবির এমন আলোচনায় ইরানের অর্জনকে সুসংহত করার একটি সুযোগ দেখছে, যে আলোচনায় খুব কমই অগ্রগতি হয়েছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, ছয় মাস যুদ্ধের পর এই অচলাবস্থা ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে তীব্রভাবে বিভক্ত করে ফেলেছে। আর এর চূড়ান্ত মধ্যস্থতাকারী, সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আত্মগোপন করে আছেন। চলমান যুদ্ধ অবসানের পথ নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে গভীর মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে বাস্তববাদী ও কূটনীতিপন্থি একটি গোষ্ঠী দ্রুত সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে কট্টরপন্থিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির বিরোধিতা করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কৌশলকে সমর্থন করছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠা

তেহরানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিবিদরা প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, এই যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হয়েছে।

তবুও, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিজয় কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে একটি গভীর আদর্শগত বিভেদ রয়ে গেছে।

যারা সমঝোতার পক্ষে তারা প্রকাশ্যে সতর্ক করেছেন, শক্তিশালী অবস্থান থেকে সংঘাত নিরসনের সুযোগ কমে আসছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ৪৭ বছরের সংঘাতের অবসান ঘটানোই দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনের এবং বিশ্বব্যাপী বিচ্ছিন্নতা ভেঙে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে নিশ্চিত উপায়।

পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘যুদ্ধের অবসান কোনো এক সময় ঘটাতেই হবে। আজই এর অবসান ঘটানো ভালো হবে, যখন আমরা শক্তি ও মর্যাদার অবস্থানে আছি এবং পুরো বিশ্ব আমাদের বিজয়কে স্বীকার করে নিচ্ছে।’

অন্যদিকে রয়েছেন কট্টরপন্থী রক্ষণশীলরা। তাদের মতাদর্শ ওয়াশিংটনের প্রতি অবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তারা মনে করে আমেরিকা ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন, এবং এখন ট্রাম্পের যুদ্ধের মাধ্যমে তারা তাদের মধ্যপন্থী বিরোধীদের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করেছেন।

প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেই-এর স্মরণে শোকাহতরা সমবেত হন। গেটি ইমেজেস।

তারা ক্ষমতাসীন কর্মকর্তাদের ‘পশ্চিমা-মনোভাবাপন্ন’ এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে অতিরঞ্জিত করে একটি চুক্তির পক্ষে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টার জন্যও অভিযুক্ত করেন।

লন্ডনের চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল সিএনএন-কে বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অত্যন্ত অবিশ্বস্ত পক্ষ হিসেবে দেখে। কারণ খোদ ট্রাম্পের হাতেই তারা এতবার প্রতারিত হয়েছেন যে তারা মনে করে এবারও ঠিক তাই ঘটবে।’

একইসঙ্গে, তারা পেজেশকিয়ানকে একজন দুর্বল রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ তার পূর্বসূরি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর তিনি দৈবক্রমে ক্ষমতায় এসেছেন। আর জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ট্রাম্পের পাশে তার সই তাকে আরও একঘরে করে দিয়েছে।

কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-মানান রাইসি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে, আমরা কি সত্যিই একটি অচলাবস্থায় আছি, নাকি আপনারা শুধু একটি অচলাবস্থার চিত্র তুলে ধরছেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘এর সবকিছুর জন্য যুদ্ধকে দায়ী করা হয়েছে, অথচ এর সবকিছুর সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই।’

কট্টরপন্থীরা কী চায়?

কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতীতের ব্যর্থ চুক্তিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে, যার মধ্যে রয়েছে ওবামা প্রশাসনের সাথে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত একটি পারমাণবিক চুক্তি, যা ট্রাম্প পরে বাতিল করে দেন। তারা আলোচনার মাঝেই দুইবার যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ওপর আক্রমণের ঘটনাও উল্লেখ করে।

একজন কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির পক্ষে যারা কথা বলছেন, তাদের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিরুদ্ধে অবস্থানকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

গত ২৭ আগস্ট সংসদে কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা কামরান গাজানফারি বলেন,‘তারা একটি চুক্তি এবং একটি অপমানজনক শান্তি মেনে নেওয়ার জন্য জনমতকে প্রস্তুত করতে চায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অথচ শত্রু বারবার দেখিয়েছে যে, আমরা তাকে যতই ছাড় দিই না কেন, তার সামনে যতই পিছু হটি না কেন, সে কখনোই সন্তুষ্ট হবে না। আমাদের কাছ থেকে অন্যান্য জিনিস তারা দাবি করতে থাকবে, এবং আমাদের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া সে কিছুতেই সন্তুষ্ট হবে না।’

তেহরানের আজাদি স্কয়ারে একটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার পাশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবিযুক্ত ব্যানার। ছবি: রয়টার্স।

তবে এই বিভাজনের মধ্যে মোজতবা খামেনি নীরব থেকেছেন। মনে হচ্ছে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, একজন অবিশ্বস্ত ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় কোনো পক্ষ বেছে নেওয়া তার পদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তবে চাপের মুখে গত ২৮ আগস্ট তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এমনটা করলে ইরানের শত্রুরা উৎসাহিত হতে পারে এবং মিত্ররা মনোবল হারিয়ে ফেলতে পারে।

ইরানের এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনের পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল অবস্থানও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে তিনি ইরানকে নিয়ে আলোচনার কথা বলছেন, অন্যদিকে সামরিক চাপ ও কঠোর হুমকি অব্যাহত রেখেছেন।

তাই ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনার পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বও যুদ্ধ কখন এবং কীভাবে শেষ হবে, তার অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে।





Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর