বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২২ অপরাহ্ন

২ বছরের রেকর্ড ভেঙে ডেঙ্গুর তাণ্ডব, হাসপাতালগুলোতে বেড সংকট

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৪ সময় দেখুন
২ বছরের রেকর্ড ভেঙে ডেঙ্গুর তাণ্ডব, হাসপাতালগুলোতে বেড সংকট


ঢাকা: ডেঙ্গুর তাণ্ডবে দেশের স্বাস্থ্য খাত এখন চরম বিপর্যস্ত। অতীতের দুই বছরের সব রেকর্ড ভেঙে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, এতে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো। এমনকি ডেঙ্গু রোগীদের বেডের সংকট দেখা দিয়েছে হাসপাতালগুলোতে।

রাজধানীর ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতালসহ অন্যান্য সরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে দেখা যায়, সকাল থেকেই জরুরি বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ সারি। পর্যাপ্ত বেডের সংকুলার না হওয়ায় অনেক সাধারণ রোগীদের হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত বেড না থাকায় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে রোগীদের। আর রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ায় সেবা দিতে গিয়ে চরম চাপে পড়ছেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছরে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের ১৫ দিনেই ১৯ হাজার ৩১৭ জন। আর চলতি বছর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো ১৬৪ জনের মধ্যে ১৫ দিনেই মারা গেছে ৬৭ জন। এ ছাড়া, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১২০০-এর বেশি নতুন আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ঠাঁই নিচ্ছেন। আর ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু গত জুলাই মাস থেকেই উল্লেখযোগ্যভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এমনকি, চলতি সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, যা উদ্বেগ তৈরি করছে সাধারণ মানুষের মাঝে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাওয়া তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৭৫ জন এবং মারা গেছেন ১০৭ জন। ২০২৫ সালের এই সময় পর্যন্ত দেখা যায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৩৮ হাজার ৫২৭ জন এবং মারা গেছেন ১৫৫ জন। আর চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৫৫ হাজার ১৬৩ জন এবং মারা গেছেন ১৬৪ জন, যা গত দুই বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে এবার। এ ছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পুরো পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই ৬ বছরের মধ্যে ২০২৩ সালেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রায় লাখ খানেক হয়েছিল। এর পর দুই বছর গ্যাপ দিয়ে এবার তৃতীয়তম বছরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করেছে।

এদিকে ডেঙ্গুর ভয়াবহতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে ঢাকা বিভাগ এবং খুলনা। তারপর রয়েছে চট্টগ্রাম ও বরিশাল। তবে রাজধানীও রয়েছে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে। তবে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানোর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এখানেই চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রাজধানীর হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগীদের বেডসংকট। ছবি: সারাবাংলা

রাজধানীর হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগীদের বেডসংকট। ছবি: সারাবাংলা

অন্যদিকে, ডেঙ্গুর সাধারণত ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪ এই চার ধরনের সেরোটাইপ রয়েছে। এর মধ্যে ডেন-২ ও ডেন-৩ এই দুই ধরনের সেরোটাইপ সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার পেছনে ভূমিকা পালন করছে। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের সময় ডেন-২ প্রধান ছিল। সেসময় ৬২ শতাংশে ডেন–২, ২৯ শতাংশে ডেন–৩ এবং ৯ শতাংশে ডেন–২ ও ডেন–৩ এই দু’টিই পাওয়া যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে। এমনকি, চলতি বছরও দেশের কিছু স্থানে ডেন-২ আবার কিছু স্থানে ডেন-৩ প্রধান ভূমিকা পালন করছে।

কীটতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি মৌসুমে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-যুবকেরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৪২ শতাংশ।

চলতি বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুতে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে এবং ডেঙ্গুর চারটা ধরনের মধ্যে ‘ডেন-২’ এবং ‘ডেন-৩’- দুটোই মূলত প্রভাব বিস্তার করছে। এ বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর বিস্তার হঠাৎ করে হয় নাই, এটা হওয়ার কথা ছিল। কারণ, ডেঙ্গু যখন কোনো একটি জায়গাতে বা কোনো একটি দেশে শুরু হয়, তখন ওইটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এটা থামাতে না পারলে বাড়তে থাকে। তো ওটাই হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গুর চারটা সেরোটাইপ হওয়ার কারণে একটা মানুষের চারবার ডেঙ্গু হওয়ার একটি ঝুঁকি থাকে। সেজন্য ডেঙ্গুটা অনেক দিন পর্যন্ত চলতে থাকে। ধীরে ধীরে ডেঙ্গু বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতেই বিস্তৃত হবে, বাড়তেই থাকবে। কোনো কোনো সময় কোনো একটা সেরোটাইপ বাড়ে, কমে। কারণ, কোনো একটা সেরোটাইপ দিয়ে অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে গেলে সেই সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিটা কমে যায়। সেজন্য কোনো একটা সেরোটাইপ যেটা আগে আক্রান্ত বেশি হয় নাই, সেটা আক্রান্তের হার বেড়ে যায়।’

ডেঙ্গু থেকে প্রতিকার কীভাবে সম্ভব?- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিকারের জন্য লাগবে সামাজিক আন্দোলন। প্রত্যেকেই এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের বাড়ির আঙিনায় এডিশ মশার প্রজনন না হয়। সিটি করপোরেশন কাজ করবে রাস্তাঘাট, উন্মুক্ত স্থাপনা, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আর নিজ নিজ বাড়ি নিজেদেরই পরিষ্কার করতে হবে।’

ডেঙ্গু চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি আছে কিনা? বা কি করণীয় রয়েছে? এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখন রোগী মারা যাচ্ছে। কারণ, রোগী হাসপাতালে আসছে শেষ মুহূর্তে। রোগী শেষ মুহূর্তে কেন আসছে? যখন একেবারে রোগের প্রাথমিক পর্যায় তখন যদি রোগী হাসপাতালে যায়, তখন হাসপাতাল থেকে বলে দেওয়া হয় এখন গিয়ে বাসায় চিকিৎসা নেন, যদি খারাপ হয় তাহলে আইসেন। তো ফলে দেখা যাচ্ছে যে, হাসপাতালগুলোতে যে রোগীগুলো ভর্তি হচ্ছে, সেগুলো মোটামুটি অবস্থা যখন খারাপ তখন আসছে। এটা হলো একটা কারণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে সিস্টেমটা আছে- ধরেন ঢাকা শহরে আমি কড়াইল বস্তিতে থাকি। তো আমার বাচ্চার জ্বর হয়েছে, বা আমারই জ্বর হয়েছে। এটা পরীক্ষা করতে আমাকে কোথায় যেতে হবে? আমাকে যেতে হবে মুগদাতে অথবা সোহরাওয়ার্দীতে বা অন্যান্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে। এখন সেখানে গেলে আমার তো ওই আধাবেলার মজুরি মার যাবে; আমি তো দিন আনি দিন খাই। রিকশা চালাই অথবা যে কাজ করি, আমি তো আর মাসিক বেতন পাই না।’

“মানে এই আমাদের হাসপাতালগুলো দুটোর পরে আর খোলা থাকে না। এমন না যে আমি সকালবেলা অফিস করে বিকেলবেলা যেতে পারব। তার কারণে হাসপাতালের যে সিস্টেমটা আমরা দাঁড় করিয়েছি, সেটা রোগী বা জনবান্ধব না। যিনি ছাত্র, তাকে স্কুল-কলেজ কামাই দিয়ে যেতে হবে; যিনি কর্মজীবী, তাকে কাজ বাদ দিয়ে যেতে হবে। যেগুলো সাধারণত করতে চায় না- ‘জ্বর আছে, ঠিক আছে দেখি কী হয়’। আর যখন বাধ্য হচ্ছে, তখন হয়তো অবস্থাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এগুলো হচ্ছে সিস্টেমের প্রবলেম।”

ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু পরীক্ষা তো আর এমন কোনো কঠিন পরীক্ষা না। একটা পিকআপে বা মাইক্রোবাসে একজন টেকনিশিয়ান বা লোক দিয়ে ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরির মাধ্যমে এটা করা যায়। এই ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি যদি কারওয়ান বাজারে তিন ঘণ্টা, কড়াইল বস্তিতে যেয়ে পাঁচ ঘণ্টা, কমলাপুরে যেয়ে দুই ঘণ্টা দাঁড়ায়, তাহলে কিন্তু রোগগুলো দ্রুত শনাক্ত হবে। দ্রুত শনাক্ত হলে তারা আগে চিকিৎসা নিতে যাবে। আগে চিকিৎসা নিলে মৃত্যুর হার কমবে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার তখনই কমবে যখন অসুখের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষজন চিকিৎসকের কাছে আসবে।’

ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সংক্রমণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রামে তো অবস্থা আরও শোচনীয়। গ্রামের লোকজনকে উপজেলা পর্যন্ত আসতে হবে সেই গ্রাম থেকে। উপজেলাতে এসে পরীক্ষা করাতে ওইদিনও চলে যায়। তার মানে আমরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাকে রোগীবান্ধব করতে পারিনি। কিন্তু, এটি করা খুব বেশি কঠিন না।’

ডা. আব্দুস সবুর বলেন, ‘ওই যে আমি শহরের উদাহরণ দিলাম, এটা তো ইমার্জেন্সি। প্রতিদিনই তো কয়েকজন করে মানুষ মারা যাচ্ছে। এর চেয়ে জরুরি অবস্থা তো কিছু হয় না। ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি দাঁড় করাতে পারব না কেন? ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি দাঁড় করাতে পারলেই রোগ আগে শনাক্ত হবে। আর রোগ আগে শনাক্ত হলে আগে চিকিৎসা হবে। আগে চিকিৎসা হলে মৃত্যুর হার কমবে।’





Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর