বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
Koffee With Karan 9: Janhvi Kapoor, Varun Dhawan Shoot Episode; Arjun Kapoor Makes A Cameo? | Exclusive | Bollywood News Ex-Pakistan batter calls India ‘arrogant’ as he defends Mohsin Naqvi after Asia Cup trophy row | Cricket News ঢাবিতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ছাত্রদলের বিক্ষোভ শ্যামনগরের জলবায়ু- স্মার্ট কৃষি ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণের সমাপনী সহকারী প্রধান শিক্ষক মহসীনের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে পিটিয়ে অজ্ঞান করার অভিযোগ রায়পুরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ হাম উপসর্গে ৬ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩১৬ স্মার্টফোনের স্লো চার্জিং দূর করার সহজ উপায় প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ মা‌র্কিন দূতাবাসের কালিয়াকৈরে মাদক ও অস্ত্র সহ গ্রেফতার -৬

ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বনাম জনকল্যাণ: বিনিয়োগের আড়ালে কার স্বার্থ রক্ষা হলো?

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ১০৫৫ সময় দেখুন
ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বনাম জনকল্যাণ: বিনিয়োগের আড়ালে কার স্বার্থ রক্ষা হলো?

কাজী মামুনুর রহমান মাহিম
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ঊর্ধ্বে; এটি মূলত জনগণের আমানত। সেই আমানত যখন কোনো বিশেষ ব্যক্তির ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি রক্ষা বা ব্যবসায়িক প্রচারণার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা কেবল নৈতিক বিচ্যুতি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি চরম অবজ্ঞা। চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন যখন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন জনমনে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল, তাঁর ‘গিনেস রেকর্ডধারী’ ইমেজ ও গ্লোবাল পরিচিতি হয়তো স্থবির বিনিয়োগে প্রাণ সঞ্চার করবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা সেই অর্জনের হিসাব মেলাতে বসি, তখন প্রাপ্তির খাতাটি পর্যালোচনায় এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে।

সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি দৈনিক—বাংলাদেশ প্রতিদিন ও কালের কণ্ঠ (৭ মার্চ ২০২৬)—বিডার বিগত ১৮ মাসের কার্যক্রম নিয়ে যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা কেবল হতাশাজনকই নয়, বরং দেশের বিনিয়োগ নীতির এক গভীর সংকটের দিক উন্মোচন করেছে। বিনিয়োগের প্রসারে বিডার অভিভাবকসুলভ ভূমিকা থাকার কথা থাকলেও আশিক চৌধুরীর কর্মপদ্ধতি নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—বিডা কি তবে ব্যক্তিগত বিপণন সংস্থায় পরিণত হয়েছে? বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে যে, আশিক চৌধুরী বিডার চেয়ারম্যান হিসেবে যতটা না দেশের বিনিয়োগের স্বার্থে কাজ করেছেন, তার চেয়ে বেশি সচেষ্ট ছিলেন তৎকালীন প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যক্তিগত ইমেজ ও ‘সামাজিক ব্যবসা’ সংক্রান্ত প্রচারণায়। পত্রিকাটির ভাষায়, “বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান যেন হয়ে ওঠেন গ্রামীণের বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং ম্যানেজার।”

জনস্বার্থের প্রশ্নে এটি একটি বড় নৈতিক অন্তরায়। ভুলে গেলে চলবে না যে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে এই নিয়োগ কি সত্যিই দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থে ছিল, নাকি এর পেছনে ছিল কেবলই ব্যক্তিগত সখ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রক্ষার প্রচেষ্টা? পত্রিকাগুলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ড. ইউনূস দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির চেয়ে তাঁর নিজস্ব বলয় ও ব্যবসায়িক দর্শনের প্রচারক হিসেবেই আশিক চৌধুরীকে বেছে নিয়েছিলেন। যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে এভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার করা হয়, তবে তা কেবল অর্থনীতির ক্ষতি করে না, বরং দেশের জনগণের সাথে এক গভীর বিশ্বাসভঙ্গের নামান্তর। একুশে টেলিভিশনের টকশো ‘একুশের রাত’-এ এই সংকটের এক নগ্ন রূপ ফুটে উঠেছে। সেখানে আলোচকরা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ড. ইউনূস ব্যক্তিস্বার্থ ও লোভের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের হাজার কোটি টাকার সুদ মওকুফ করিয়েছেন এবং নিজের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কালের কণ্ঠের ভাষ্য এবং একুশে টিভির আলোচনার সারমর্ম এটাই যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভবান করার জন্যই আশিক মাহমুদকে বিডার চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়েছিল।

জনগণ আশা করেছিল যে তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্বের হাত ধরে সারা পৃথিবী আমাদের সাথে যুক্ত হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে অভাবনীয় সাপোর্ট পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি হয় একটি ‘মাকাল ফল’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন অথবা তিনি এই দেশকে নিজের মনে করেন না। অর্থনীতি আবেগ বা চটকদার বক্তৃতা দিয়ে চলে না, চলে তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে। পরিসংখ্যানের আয়নায় তাকালে বর্তমান পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। পত্রিকা দুটির প্রতিবেদনে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) নেমে এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলারে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রতিবেদনের মতে, এটি করোনাকালের প্রতিকূল সময়ের চেয়েও কম। এছাড়া বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব আগের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য আরও বলছে, শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি (Capital Machinery) আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২৮ শতাংশের বেশি। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে বিডা কেবল ব্যর্থই হয়নি, বরং প্রকৃত সমস্যাগুলো সমাধানেও ছিল উদাসীন। বিনিয়োগকারীরা যখন ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটে তটস্থ, তখন বিডার পক্ষ থেকে ‘হাই-ভ্যালু ডিল’-এর ঘোষণা কেবল প্রচারণার মরীচিকাই তৈরি করেছে।

বিডার বর্তমান কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাঠামোগত সংস্কারের চেয়েও চমক তৈরির দিকেই ছিল তাদের মূল ঝোঁক। ইলোন মাস্কের স্টারলিংক বা নাসার সাথে চুক্তির মতো বিষয়গুলো নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক ‘হাইপ’ তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত নীতিগত সংস্কারের চেয়ে বিডার মনোযোগ ছিল কেবল ‘চমকপ্রদ ঘোষণা’ ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি তৈরির দিকে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মাসরুর রিয়াজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, আমলাতন্ত্রের বাইরে থেকে কাউকে এনে সাহসী সংস্কারের আশা করা হলেও বাস্তবে কোনো বড় কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি। বিনিয়োগের হিটম্যাপ তৈরি বা আন্তর্জাতিক সামিট আয়োজনে রাষ্ট্রীয় তহবিলের যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার বিপরীতে প্রকৃত কতটুকু কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে—সেই স্বচ্ছ হিসাব আজ জনসাধারণের দাবি। সংবাদমাধ্যমে আসা তথ্যগুলো স্পষ্ট করছে যে, যখন রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত করের অর্থের অপচয় ঘটে।

দেশের শিল্পায়ন ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি কোনো রোমাঞ্চকর শখ বা ব্যক্তিগত শ্লাঘার বিষয় নয়। বিগত সময়ের এই বিনিয়োগ ব্যর্থতার নির্মোহ পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি। সংবাদমাধ্যমের এই প্রতিবেদনগুলো যদি সত্য হয়, তবে এটি স্পষ্ট যে টেকসই বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল পরিবেশ, নিরপেক্ষ নীতি এবং দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ‘মার্কেটিং ম্যানেজার’ নয়। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা আকাশ থেকে লাফ দিয়ে রেকর্ড গড়ার চেয়ে মাটির অর্থনীতিকে সচল করতে বেশি মনোযোগী হবেন। ব্যক্তিস্বার্থ যখন জনস্বার্থের ওপর স্থান পায়, তখন তা জাতির জন্য কেবল দীর্ঘশ্বাসের কারণই হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক:
কাজী মামুনুর রহমান মাহিম
সাংবাদিক, আইন ও নীতি বিশ্লেষক এবং সমাজকর্মী।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর