রিয়াদ আহাম্মেদ, শ্রীবরদী (শেরপুর):
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গোশাইপুর ইউনিয়নের ভারেরা গ্রামের অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের সন্তান লিটন মিয়া। ২০১০ সালে কর অঞ্চল-৬ এ নোটিশ সার্ভার পদে চাকরি পাওয়ার পর থেকে রুপকথার ‘আলাদিনের চেরাগ’ এর মত আশ্চর্যজনকভাবে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে ফেলেন তিনি। লিটনের বাবা আব্দুল খালেক ছিলেন সাধারণ একজন মাছ বিক্রেতা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মতিয়া চৌধুরীর ভাগিনা পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়াতেন লিটন। এমনকি আওয়ামী লীগ আমলের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দিয়েও প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। আওয়ামী লীগের অনেক দাপুটে নেতার ফাইল সমন্বয় করে ও সরকারি চাকরি নিয়ে দেয়ার মাধ্যমে লিটন কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, লিটন মিয়া তার স্ত্রীর নামে ঢাকা ও তার নিজ এলাকায় গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। তার এই রাজকীয় জীবনের কাহিনী এলাকায় ইতোমধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দশ বছর আগেও যেখানে বাবার পাঁচ শতাংশ জায়গার উপরে ছিল একটি ছোট্ট টিনের ঘর, সেখানে এখন লিটন মিয়া পাঁচ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে গড়ে তুলেছেন বিশাল অট্টালিকা। এলাকায় কিনেছেন বিঘায় বিঘায় সম্পত্তি। শ্রীবরদী শহরের উত্তর বাজার এলাকায় রয়েছে তার দুইটি বাড়ি এবং শহরের এপিপিআই স্কুলের পেছনে রয়েছে আরেকটি বাড়ি। তবে এই বাসা-বাড়ির জায়গাগুলো লিটনের স্ত্রী পান্না বেগমের নামে কেনা হয়েছে। শ্রীবরদী এপিপিআই হাইস্কুলের পিছনে রাহাত নিকেতন লাবিয়া ভিলা নামে ৫ কক্ষবিশিষ্ট হাফ বিল্ডিং বাসা যেটি বর্তমানে ভাড়া দেয়া। অপরটি পৌরসভার উত্তর বাজার এলাকায় মহির উদ্দিনের নিকট ক্রয়কৃত বাসা যা একজন শিক্ষিকার কাছে ভাড়া দেয়া আছে। এছাড়াও উত্তর বাজার এলাকায় ব্যবসায়ী দেলোয়ারের কাছ থেকে ক্রয়কৃত জায়গায় বহুতল ভবনের ফাউন্ডেশন দেয়া আরেকটি বাসা রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাসার কাজটি অসমাপ্ত রয়ে যায়। আবার বাসার পেছনেও জমি কিনে রেখেছেন তিনি।
এদিকে ভায়াডাঙ্গার হাঁসধরা এলাকায় ২২ একর জমিতে লোকমান অ্যান্ড লিয়া এগ্রো ফিসারিজ নামে রয়েছে বিশাল একটি মাছের ঘের। এখানে যাওয়ার জন্য লিটন মিয়া প্রায় কিলোমিটার রাস্তাও সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে দুই পাশে আরসিসি পিলার দিয়ে নির্মাণ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার একজন বাসিন্দা জানান, মাছের ঘেরের পাশেই আরও একশ বিঘার মত জমি বায়না রেজিস্ট্রি করেছেন তিনি।
এছাড়াও উপজেলার শ্রীবরদী থেকে ভায়াডাঙ্গা যাওয়ার পথে কন্টিপাড়া নামক এলাকায় সড়কের পাশে লুহমান এগ্রো অটো রাইস মিল নামে ২.৫ একর জায়গা ক্রয় করে সেটাতে বাউন্ডারি করে রাখেন লিটন মিয়া। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকার উপরে। এদিকে চতুর লিটন মিয়া নামে বেনামে আরও অঢেল সম্পদ গড়েছেন বলে জানা যায়। লিটনের ছোট বোন নিলুফা ও কলাকান্দা শ্বশুরবাড়ি এলাকায়ও কয়েক একর সম্পত্তি ক্রয় করেছেন বলে একটি বিশেষ সূত্রে জানা যায়।
লিটন মিয়ার গ্রামের বাড়িতে একাধিক প্রতিবেশীর সাথে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও যেখানে লিটন মিয়ার শ্বশুর ভ্যানে করে বাজারে বাজারে সবজি বিক্রি করতেন, আর এখন আয়েশী জীবন যাপন করেন। লিটন মিয়ার স্ত্রী গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীর একাউন্টে রয়েছে কোটি কোটি টাকার হিসাব। রাজধানী ঢাকার একাধিক জায়গায় তাঁর জমি ও আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে। ঢাকার ধামরাইয়ে জমি ও রামপুরা বনশ্রীতে রয়েছে একটি ফ্লাট যেখানে তিনি স্ত্রী সন্তানদেরকে নিয়ে বসবাস করেন। এছাড়াও নিজ গ্রামে প্রায় ১ একর সম্পত্তি কিনেছেন বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে। যাতায়াতের জন্য রয়েছে তার একটি প্রাইভেটকার যেটির নাম্বার ঢাকা মেট্রো চ-১৯-৯১৪৮ । তবে গাড়িটিও লিটন বা তার স্ত্রীর নামে কেনা হয়নি। বিআরটিএ অফিস থেকে জানা যায়, গাড়িটির মালিক শ্রীবরদীর কলাকান্দা গ্রামের তাজুল ইসলাম লিমন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাজুল ইসলাম লিমন লিটনের স্ত্রী পান্না বেগমের ভাতিজা এবং আনুমানিক দুই বছর আগে একটি দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।
লিটনের নিজ গ্রাম ভারেরা এলাকার আবু শামা বলেন, ‘লিটন এলাকায় দুই লাখ টাকা কাঠা জমি চারগুণ উচ্চমূল্যে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা করে প্রায় এক একর জমি কিনেছেন।’
একই গ্রামের রুবেল তালুকদার বলেন, ‘লিটনের ভায়াডাঙ্গা হাঁসধরা এলাকায় প্রজেক্ট, কন্টিপাড়া এলাকায় রাস্তার পাশে জমি ও শ্রীবরদী পৌরশহরে তিনটি বাসাসহ তার শ্বশুরবাড়ি কলাকান্দা এবং শেরপুর শহরেও একটি বাসা আছে। লিটনের বাবা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাছ বিক্রি করতো। সেই সুবাদে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের ভাগ্নের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি হওয়ায় লিটনকে চাকরি নিয়ে দেন। এরপর থেকেই ঘুষ বাণিজ্য করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।’
লিটনের নিজ গ্রামের বাল্যবন্ধু গার্মেন্টস কর্মী উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘আমি সাভারে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করি। লিটনের সাথে মাঝে মধ্যে ঢাকায় দেখা হয়। একবার ধামরাইয়ে দেখা হলে উজ্জ্বল মিয়া লিটনকে এখানে কেন? জিজ্ঞেস করলে এখানে জমি কিনেছি বলে জানান তিনি।’
লিটনের বাবা আব্দুল খালেকের সাথে কথা হলে তিনি জানান, ‘আমার দ্বিতীয় বিবাহের পর থেকে লিটন আমার সাথে তেমন যোগাযোগ করেনা। শুধু প্রতি মাসে সংসার খরচের টাকা পাঠিয়ে দেয়। এছাড়াও লিটনের আয়, সম্পদ, বাসা ও জমি সম্পর্কে কিছুই জানেননা তিনি।’
এই অঢেল সম্পদের বিষয়ে জানতে লিটন মিয়ার সাথে একাধিক যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার নামে কোনো সম্পত্তি নেই। আর এসব বাসা ও মাছের প্রজেক্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে করা। আমি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি আয়কর বিভাগ, সেটি জানেনতো? আমার চেয়ে বেশি আইন আপনি জানেননা। আইন মেনেই সব করেছি।’
তবে স্থানীয়দের দাবি, ঋণ নিয়ে এসব সম্পদ করতে হলে আগে জমি কিনতে হয়েছে। আর এত টাকা লিটন কোথায় পেলেন? এলাকাবাসীর কৌতূহল একজন ‘নোটিশ সার্ভার’ কিভাবে শত কোটি টাকার মালিক হলেন। চতুর্থ (২০ তম গ্রেডের) শ্রেণীর একজন কর্মচারী হয়ে শুধু বেতনের টাকা দিয়ে লিটন মিয়া কিভাবে শত কোটি টাকার মালিক হলেন এ বিষয়ে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। লিটন মিয়ার মত দুর্নীতিবাজ চাকুরিজীবীদের বিষয়ে সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এদেশে দুর্নীতির পরিমাণ কমে আসবে বলেও সংশ্লিষ্ট সকলের অভিমত।