মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কর্মশালায় বক্তারা / দেশে ৭১ শতাংশ মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগ, এফওপিএল নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে ঢাকা বোর্ডের সামনে শিক্ষার্থীরা সচেতনতা কার্যক্রমে জাতীয় স্বীকৃতি, সেরা চারে ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে ইরানের হামলায় ভারতীয় নাবিক নিহত, আহত ৮ ‘We were talking at nets about…’: Shubman Gill opens up on 2027 World Cup planning with Virat Kohli | Cricket News ‘মাদকের মূল হোতারা বসে সংসদে, ধরা পড়ে কেবল বাহকরা’ Ranveer Singh To Begin Pralay Shoot In August?; Varun Badola Calls Satluj Ban ‘Robbery Under Broad Daylight’ | Bollywood News ব্যবহারকারীদের জন্য সুখবর দিলো হোয়াটসঅ্যাপ ‘মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ৯২ শতাংশই চিকিৎসা করেন না’ সিরির নতুন রূপ: বদলে যাচ্ছে আইফোনের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট

আয়ুর্বেদ; প্রাকৃতিক নিরাময়

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: বুধবার, ২ নভেম্বর, ২০২২
  • ১৩০ সময় দেখুন
আয়ুর্বেদ; প্রাকৃতিক নিরাময়


লাইফস্টাইল ডেস্ক

ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি ‘আয়ুর্বেদ’ নামে পরিচিত। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভেষজ উদ্ভিদ, গাছের পাতা, ফল, নানা ধরনের বীজের তেল আর ছাল বাকল হয়ে ওঠে এই চিকিৎসাধারার মূল উপকরণ। হরিতকি, বহেরা, তুলসী, আমলকি, নিম, পানপাতা, কালোজিরা, বাসক, অর্জুনের ছাল, মধু ইত্যাদি প্রকৃতিক উপাদানগুলোই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার মূল উপকরণ। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে যুক্ত হয় এই ধারা। ‘বেদ’ এর একটি ভাগ- অথর্ববেদের যে অংশে চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে, সেটাই হল আয়ুর্বেদ। তাই চিকিৎসাশাস্ত্রের মূল বা আদি ধারা এটি।

আদিযুগে গাছপালার মাধ্যমেই মানুষের চিকিৎসা করা হত। ‘আয়ুর্বেদ’ শব্দটি দুটি সংস্কৃত শব্দের সংযোগে তৈরি- ‘আয়ুষ’ অর্থ্যাৎ জীবন, ‘বেদ’ অর্থ্যাৎ বিজ্ঞান। আয়ুর্বেদ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় জীবনের বিজ্ঞান। এটি এমনই এক চিকিৎসা পদ্ধতি যাতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আয়ুর্বেদে জীবনকে ভাবা হয় দেহ, মন, অনুভূতি ও আত্মার এক সমন্নয়। আয়ুর্বেদ রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিবেচনা করে তবেই রোগ নির্ণয় করা হয়। তাছাড়া রোগীর দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ইত্যাদি বিষয়গুলোকে এই চিকিৎসায় খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

ব্রিটিশদের ভারত আগমনের সময় ভারতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল আয়ুর্বেদ, ইউনানী ও নানা ধরনের লোকজ চিকিৎসা পদ্ধতি। উনিশ শতকে বাংলার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকর ওষুধ সেবনের সময় রোগীকে যথাযথ খাদ্য-পথ্য গ্রহণ এবং অন্যান্য আচার ও নিয়ম-কানুন মেনে চলার পরামর্শ দিতেন। খ্যাতিমান আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা টোলে শিক্ষার্থীদের এই চিকিৎসা সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন। ধীরে ধীরে এই চিকিৎসার মাহাত্ম্য পাশ্চাত্যেও ছড়িয়ে পড়ল। পাশ্চাত্য গবেষকরা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন এবং এই চিকিৎসার কার্যকারিতা তাদের গবেষণার ফলাফলে বেড়িয়ে এল। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা- এই দেশগুলো আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় উন্নতি করেছে। এছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশেও আয়ুর্বেদ চিকিৎসা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এই চিকিৎসা বর্তমানে অলটারনেটিভ ট্রিটমেন্ট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

আয়ুর্বেদ; প্রাকৃতিক নিরাময়

আমাদের দেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার পরিধি এখনও অনেক ছোট। সাধারণত পুরনো বা ক্রনিক সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। যেমন ঠান্ডা, কাশি, শরীর ব্যথা, ত্বক-চুলের সমস্যা, হাঁপানি, গ্যাস্ট্রিক, মানসিক চাপ ও ওজন কমানোর ক্ষেত্রে অনেকে এই চিকিৎসার দ্বারস্থ হয়। এদেশে একটি মাত্র সরকারি আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত। ঢাকার বাইরে সরকারি আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল নেই।

সময়ের সাথে সাথে এদেশে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা যত উন্নত হয়েছে আয়ুর্বেদিকে তা হয়নি। ফলে আর্য়ুবেদ চিকিৎসার প্রসার ও গ্রহণযোগ্যতা এখনও কম। আবার দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা করার ধৈর্য অনেকের থাকে না। তাই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার দিকে অনেকেই পা বাড়ান না।

আয়ুর্বেদের গুণাগুণ

আয়ুর্বেদ পঞ্চকর্মার মধ্য দিয়ে শরীরের ভেতরে থাকা জটিল রোগের কারণ অনুসন্ধান করা যায়। বোমেটিং থেরাপি (ওয়ানামা), লুজ মোশন (ভিরেচানম), এনিমা (ভাস্তি), নেজল থেরাপি (নাস্বিয়াম), ব্লাড লেটিং থেরাপি (রক্তমুখ সানামা) এগুলোই হল আয়ুর্বেদের পঞ্চকর্মা। যেকোন দূষিত পদার্থ শরীর থেকে বের করার জন্য পঞ্চকর্মা ব্যবহৃত হয়। অর্থ্যাৎ শরীরকে শুদ্ধি করার এক ধরনের প্রক্রিয়া এটি। রোগের সঠিক কারণ নির্ধারণের পর চিকিৎসা শুরু হয়। কোন রাসায়নিক পদার্থের ছোঁয়া নেই আয়ুর্বেদ চিকিৎসায়। যে কারণে ফলাফল পেতে একটু বেশি সময় লাগে। তবে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী। শুধুমাত্র ওষুধ খেলেই ভাল ফল পাওয়া যায় না। ওষুধের পাশাপাশি কিছু নিয়মও মেনে চলতে হয়। সকালে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম, খাদ্য গ্রহণ ও নিয়ম-কানুন পালন করতে হয়।

আয়ুর্বেদ; প্রাকৃতিক নিরাময়

সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ডা. মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘আয়ুর্বেদ চিকিৎসার মূলত দুটি উদ্দেশ্য আছে। দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো ও রোগীকে আয়ুর্বেদিক ওষুধে সারিয়ে তোলা। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় প্রথম উদ্দেশ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে এই চিকিৎসায় এখনও সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এতে গবেষণার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে না।’

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কেরালা, কর্ণাটক, ব্যাঙ্গালুরসহ নানা প্রদেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এমন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে ওই দেশের আয়ুর্বেদিক রিসার্চ সেন্টারগুলোতে গবেষণা হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের পরিস্থিতি অনেকটা বিপরীত। জটিল রোগগুলোর আয়ুর্বেদিক ওষুধ এখনও এদেশে আবিষ্কৃত হয়নি। এই বিষয়ে গবেষণার জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ নেই। একটি মাত্র সরকারি আয়ুর্বেদিক হাসপাতালের বেহাল দশা। পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স, ঔষধ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার নেই বললেই চলে। ওয়ার্ডগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে। সেখানে মূলত গরীব বা নিম্নবিত্ত মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে ব্যর্থ মানুষগুলোর বাঁচার এটাই যেন শেষ সম্বল!

ওষুধের দাম

আয়ুর্বেদিক ওষুধ প্রস্তুত হয় উদ্ভিজ্জ, প্রাণীজ ও খনিজ- এই তিনটি উৎস থেকে। উদ্ভিদ ও প্রাণীজ উৎস থেকে প্রস্তুতকৃত আয়ুর্বেদিক ওষুধের দাম কম। বেশিরভাগ ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই আছে। সাধারণত ৪৫০ এমএল আয়ুর্বেদিক ওষুধ ১০০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। অথচ একই পরিমাণ অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কিনতে দুই বা তিনগুণ টাকা বেশি গুনতে হয়- জানালেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ডা. নাজমুল হুদা। তবে খনিজ উৎস যেমন তামা, রুপা, সোনা ইত্যাদি ধাতু থেকে তৈরি ওষুধগুলোর দাম একটু বেশি।

আয়ুর্বেদ; প্রাকৃতিক নিরাময়

আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরির জন্য আমাদের দেশের সরকারের নিজস্ব কোন প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো নেই। চট্টগ্রামের শ্রীকুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়, আয়ুর্বেদিক ফার্মেসি, মোজাহের ঔষধালয়, বেক্সিমকো, একনি, স্কয়ার, হামদর্দসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আয়ুর্বেদিক ওষুধ বানায়। তবে সরকারিভাবে ওষুধ তৈরি করলে দাম আরও অনেক কম হত।

বেসরকারিভাবে পরিচালিত কিছু প্রতিষ্ঠান

কোন কোন শারীরিক সমস্যা ছোট হলেও যেন পিছু ছাড়ে না। সেইসব ক্ষেত্রে অন্য সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মানুষ যায় প্রকৃতির কাছে। বেসরকারি আয়ুর্বেদিক সেন্টারগুলোর ব্যয় একটু বেশি, ফলে নিম্নবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরেই থাকে। যেমন বনানীতে অবস্থিত আয়ুর্বেদিক রিসার্চ এন্ড হেলথ সেন্টারের কথা অনেকের জানা আছে। ত্বক ও চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, ওজন কমানো, ব্যথা উপশম- সাধারণত এ জাতীয় সমস্যার চিকিৎসা করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এখানে আয়ুর্বেদিক ‌ওষুধগুলো ভারত থেকে আনা হয়। ফলে দাম কিছুটা বেশি।

বনানীর আয়ুর্বেদিক রিসার্চ সেন্টারের চিকিৎসক শালীন ভাট্টি বলেন, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে সাধারণ ক্রনিক অসুখগুলোর চিকিৎসা এখানে করানো হয়। তবে খরচ একটু বেশি। তাই মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা এখানে চিকিৎসা করতে পারেন।

এই আয়ুর্বেদিক সেন্টারের ঔষধের দাম ২০০০ টাকা থেকে শুরু হয়। একেকটা রোগের ক্ষেত্রে একেক রকম খরচ হয়ে থাকে। এখানে প্রতিবার ফেসিয়াল করাতে ত্বকের ধরন ও সমস্যাভেদে ২,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা লাগে। যেকোন থেরাপি ধরনভেদে ১৫০০ থেকে ৭০০০ টাকার মধ্যেই হয়। ওজন কমানোর জন্য এখানে চিকিৎসা নেন অনেকেই। সেক্ষেত্রে প্র্রথম ৩ দিনে শরীর থেকে টক্সিন বের করা হয়। ৩ দিনে লাগে ১২ হাজার টাকা। এরপর ৭ দিনের প্রোগ্রাম আছে, যাতে খরচ হবে ১২ হাজার। এরপর ডাক্তারের পরামর্শমত আরও কিছুদিন ট্রিটমেন্ট করাতে হবে। ঢাকা শহরে বেসরকারিভাবে পরিচালিত বেশ কিছু আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেন্দ্র আছে।

আয়ুর্বেদ; প্রাকৃতিক নিরাময়

চিকিৎসার নামে প্রতারণা

সত্যিকার অর্থে ‘আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা’ বলতে যা বোঝায় তার সাথে আমাদের পরিচয় ঘটেনি। উপরন্তু এর বিকৃত রূপটিই আমরা দেখছি। চিকিৎসার নামে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন ইদানিং। রাস্তায় কিংবা বাসে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার নামে অনেক ধরনের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। ‘মাত্র ১০ দিনে মোটা হউন’, ‘গোপন অঙ্গের সমস্যায় ১০০% সমাধান’ ইত্যাদি। আবার, পাবলিক বাসগুলোতে লিফলেট বিলি করানো হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে একদল প্রতারক ব্যবসায়ী। তারা নিম্নবিত্ত মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করছে। দুঃখের বিষয় হল, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাব্যবস্থা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোন আইন নেই এদেশে। ফলে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা বেড়েই যাচ্ছে। এ কারনে শিক্ষিত ও বড় অংশের মানুষ এই চিকিৎসায় আস্থা পাচ্ছে না।

দিনশেষে মানুষ প্রকৃতির কাছেই ফিরে আসে। প্রকৃতির নির্যাসে দেহ ও মনের রোগ সারিয়ে তুলতে চায়। সেক্ষেত্রে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার বিকল্প নাই। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের অভাবে আমরা এই চিকিৎসাব্যবস্থায় তেমন উন্নতি করতে পারিনি। সেই সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়েই উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে।

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি





Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
Ads by coinserom