কর্মময় জীবনের চার দেয়ালের বদ্ধতা থেকে বেরিয়ে গ্রাম—বাংলার বৈচিত্র্যময় ধুলোবালি মাখা পথ দেখার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাকে তাড়া করে ফেরে। বৃহস্পতিবারের অফিস শেষ করে যখন ঘরে ফিরলাম, তখনই মনে হলো, ধারাবাহিক এই সফরনামায় এবার বাংলার এক নতুন দিগন্তকে যুক্ত করার সময় এসেছে। ৪ এপ্রিল ২০২৬ ইংরেজি, শুক্রবার অতিভোর; ঢাকা শহর তখনো ঘুমের চাদরে ঢাকা। বসন্তের সেই কাকডাকা ভোরে, যখন পূর্ব দিগন্তে সূর্য কেবল তার রঙের আভাস দিতে শুরু করেছে, আমি বেরিয়ে পড়লাম। আলো আর অন্ধকারের সেই মায়াবী সন্ধিক্ষণকে সঙ্গী করে আমার প্রিয় ‘কালো ঘোড়াটি’র (বাইক) পিঠে সওয়ার হলাম এক অজানা গন্তব্যের সন্ধানে।
নিস্তব্ধ ঢাকা তখনো নিজেকে জাগিয়ে তোলেনি। চন্দ্রিমা উদ্যান, গাবতলী আর আমিনবাজার পেরিয়ে হেমায়েতপুরকে পাশে রেখে যখন ছুটছি, তেলের সংকটে মহাসড়ক আজ আশ্চর্য রকমের শান্ত। যানবাহনের কোলাহল নেই, নেই ব্যস্ততার চিরচেনা হাহাকার। পথ যেন নিজেই কানে কানে বলল, “এসো মুসাফির, আজ আমি কেবল তোমারই।” আমার কালো ঘোড়াও সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলল।
পদ্মার প্রশান্তি ও এক বিষণ্ণ হৃদয়ের আলাপন:
মানিকগঞ্জ পেরিয়ে আমার যাত্রা নিল নতুন মোড়, আরিচা ফেরিঘাট। লক্ষ্য পাবনার কাশিনাথপুর। সকাল ৭টা ২০ মিনিটের ফেরিতে উঠতেই সেটি কাজীরহাটের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাল। ফেরির বুক আজ নিস্তব্ধ, মাত্র কয়েকটি ট্রাক, একটি কার আর আমার বাইক। হকারের চিৎকার নেই, নেই ভিড়ের ক্লান্তি; এক প্রশান্ত নীরবতায় পদ্মার বুক চিরে এগিয়ে চলছে ফেরি, স্থির অথচ গভীর ছন্দে। ভিআইপি লাউঞ্জের দ্বিতীয় তলায় পরিচয় হলো এক বয়স্ক দম্পতির সঙ্গে। সময়ের ভারে শরীর ন্যুব্জ হলেও তাদের চোখে ছিল অমলিন এক বেদনা, দীর্ঘ ৬৫ বছর ধরে ছেলে হারানোর স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। তবু গল্পে গল্পে তারা যেন আমাকে আপন করে নিলেন। ফেরির ছোট দোকানের সেই রঙ চা আর বিস্কুট আমাদের আলাপচারিতাকে এক অদ্ভুত উষ্ণতা দিল। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দেখলাম মাঝনদীতে গাঙচিলের অবাধ ওড়াউড়ি, নদীর জলে শুশুকের খেলা, যেন তারা কোনো জাগতিক সীমাবদ্ধতা জানে না। হঠাৎ চরের কারণে ফেরির গতি কমে এল। দুই পাশে দুই ভিন্ন জগৎ, একপাশে ধু ধু বালুচর, অন্যপাশে সবুজে মোড়া জমি। ডিঙি নৌকায় জেলেদের মাছ ধরা আর কৃষকের মাথায় ধানের আঁটি তুলে দেওয়ার সেই দৃশ্য, জীবনের এক চিরন্তন ছন্দ যেন মূর্ত হয়ে উঠল। এই মায়ার মাঝেই আলী আজগর সাহেবের বিদায় বেলা এল; অনুরোধ করলেন ঘিওরে গেলে যেন দেখা করি। কিছু মানুষ অল্প সময়েই এমনভাবে মনের মণিকোঠায় গেঁথে যায়!
পাবনার জনপদ ও আধ্যাত্মিক সুবাস:
ফেরি থেকে নেমে পাবনার নতুন পথে যাত্রা শুরু। কাশিনাথপুর পৌঁছে কিছুটা দ্বিধা, আগে বেড়া—সাঁথিয়া নাকি সুজানগর? পথই আমাকে টেনে নিয়ে গেল বেড়া আর সাঁথিয়ার দিকে। এক মাদ্রাসার সামনে থেমে সেই চিরচেনা সকালের নাস্তাÑডুবো তেলে ভাজা পরোটা, সবজি আর ডাল। সাধারণ খাবারেও যেন এক অসাধারণ তৃপ্তি! এ অঞ্চলের কবরস্থানগুলোও এক নীরব সৌন্দর্যের প্রতীক, পরিপাটি আর ফুলে ঘেরা। রাস্তার দুই পাশে যতদূর চোখ যায়, পেঁয়াজ আর রসুনের ক্ষেত। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় রোদে শুকোতে দেওয়া ফসলই যেন এই জনপদের পরিচয়। সুজানগরের গাজনার বিল, যা বর্ষায় জলে টইটম্বুর থাকে, চৈত্রের খরায় তা এখন পেঁয়াজের সবুজ প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। খয়রান ব্রিজে দাঁড়িয়ে মানুষের শ্রম আর প্রকৃতির এই অপূর্ব মেলবন্ধন দেখে মুগ্ধ হলাম। সেখান থেকে চাটমোহরের শাহী মসজিদে যোহরের নামাজ আদায়ের ইচ্ছা নিয়ে এগিয়ে চললাম… তবে সেই গল্প আরেক দিনের জন্য তোলা থাক।
এনায়েতপুর: রূহানী জগতের প্রবেশদ্বার:
সফরের এক অবিস্মরণীয় অংশ সিরাজগঞ্জ। বেলকুচি উপজেলার এনায়েতপুর দরবার শরীফে যখন পৌঁছালাম, মনে হলো সময় সেখানে থমকে গেছে। পীর কেবলাজান হযরত মাওলানা খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী (র.), যিনি আজও বাংলার মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছেন। এখানে এসে যা দেখলাম তা বিরল; আধ্যাত্মিকতার সাথে মানবসেবার এমন মেলবন্ধন খুব কম জায়গায় দেখা যায়। মেডিকেল কলেজ থেকে শুরু করে বালিকা বিদ্যালয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেন এক একটি ইবাদতেরই অংশ। রওজা মুবারকের পাশে বসে এক অপার্থিব প্রশান্তি অনুভব করলাম। আসরের পর সেই পড়ন্ত বিকেলের মায়াবী আলোয় ফাতেহা পাঠ করার সময় এক গভীর আত্মিক অনুভূতির জন্ম হলো। চারপাশের প্রাচীন গাছগুলো যেন শত শত বছর ধরে জাকেরদের রূহানী আলাপের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে এসে সেই পুরনো দিনের গভীর কূপ আর এনায়েতপুরী সাহেবের ঐতিহাসিক দার্শনিক উক্তিগুলো মনে গেঁথে গেল। এ যেন কেবল এক সফর নয়, বরং এক রূহানী পথচলার গল্প।
যমুনার স্বাদ ও বিদায় বেলা:
ফিরে আসার আগে যমুনা বেড়িবাঁধের পাশে ‘গোলাম হোটেল’—এ রসনাতৃপ্তি। অনাড়ম্বর এই হোটেলটি স্বাদের এক অনন্য তীর্থস্থান। যমুনার টাটকা মাছ আর গরুর মাংসের সেই স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে। মাত্র বিশ টাকার ভাত আর সাশ্রয়ী মূল্যে এমন তৃপ্তিকর আহার ভাবাই যায় না! যারা এখনো এই রূহানী আর প্রাকৃতিক প্রশান্তির স্বাদ নেননি, তাদের বলব, একবার বেরিয়ে পড়–ন। হয়তো আপনার জন্যও অপেক্ষা করছে জীবনের সেরা কোনো রূহানী মুহূর্ত।