বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ১০:০৯ অপরাহ্ন

চামড়া ও চামড়া শিল্পঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা – কাজী ফারহান হায়দার

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ৮৭ সময় দেখুন
চামড়া ও চামড়া শিল্পঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা                                                       – কাজী ফারহান হায়দার

চামড়ার ব্যবহার সম্পর্কে জানার আগে আমাদের জানতে হবে চামড়া ও চামড়ার গঠন সম্পর্কে। পশুর শরীর থেকে চামড়া ছাড়ানোর পর রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত করার পর যে চামড়া পাওয়া যায় তাকে চামড়া বা লেদার বলা হয়।
প্রাণীর চামড়া টিস্যুর সমন্বয়ে গঠিত। চামড়াকে এর পুরুত্ব বিবেচনায় তিনটি অংশে ভাগ করা হয়, যেমন-
1) এপিথেলিয়াম টিস্যু
2) ডারমা বা কোরয়াম টিস্যু
3) এডিপস টিস্যু
এপিথেলিয়াম টিস্যু এপিডার্মিস স্তর হিসেবে পরিচিত। এই স্তর চামড়ার উপরের দিকে থাকে যা পাতলা আবরণ হিসেবে চামড়া কে আবৃত করে রাখে, এর পুরুত্ব মোট চামড়ার ২০০ ভাগের ১ ভাগ। ভারমা বা কোরিয়াম টিস্যু এপিডারমিস ও এডিপস টিস্যু এই দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্থানে ডারমা বা কোরিয়াম স্তরে অবস্থিত, এই কোরিয়াম হচ্ছে আসল চামড়া। চামড়া তৈরিতে যে প্রোটিন প্রয়োজন হয় তা প্রকৃতপক্ষে এই কোরিয়াম থেকে পাওয়া যায়। এটি আবার দুই স্তরের বিভক্ত, যথা-থার্মোস্ট্যাট স্তর ও নিচের কোরিয়াম স্তর।
থার্মোস্ট্যাট স্তরের পুরুত্ব মোট কোরিয়াম স্তরের ৫০ ভাগের ১ গুণ, এবং এতে চুলের মূল অংশ ও তেল এবং কিছু মিষ্টি পদার্থের গ্রন্থি থাকে। নিচের কোরিয়াম স্তর ফাইব্রাস বান্ডিল দ্বারা তৈরি যা চামড়া কে মজবুত করে রাখে। এডিপস টিস্যু চামড়ার নিচের স্তর এবং এ স্তরে চর্বি কোষ অবস্থিত। এ স্তরের পুরুত্ব নির্ভর করে চামড়ার উৎসের উপর, তবে সাধারণত এ স্তরের পুরুত্ব মোট চামড়ার পুরুত্বের ৩০ ভাগের ১ গুণ। ভালো চামড়া তৈরি করতে হলে এপিডার্মিস টিস্যু, চুল এবং এডিপস স্তর সম্পন্ন রূপে দূরীভূত করতে হয়।
প্রাচীন মিশরীয়রা ৩০০০~৩৫০০ বছর পূর্বে থেকে চামড়া দিয়ে দ্রব্য-সামগ্রী তৈরি করতো। চামড়া জন্য মিশরীয়রা বায়ু ও সূর্যের কিরণ ব্যবহার করে শুকিয়ে রাখত, পরে ওটা তৈলের উপর সংরক্ষণ করে পানিতে ভিজিয়ে রাখত। পানিতে ভিজিয়ে রাখার সময় তারা গাছের পাতা ডাল ও কাণ্ডের ব্যবহার করত, যার ফলশ্রুতিতে ট্যানিংয়ের ধারণা আসে, ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের রাসায়নিক পদ্ধতি চালুর ধারণা প্রচলিত হয়।
বর্তমানে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ক্রোম পদ্ধতিতে চামড়া পাকা করা হয়। জুতায় যে চামড়া ব্যবহার করা হয় তার প্রায় 90% ক্রোম পদ্ধতিতে পাকা করা হয়। যেখানে উদ্ভিজ ট্যানিংয়ে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে সেখানে মাত্র এক থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ক্রোম পদ্ধতিতে চামড়া পাকা করা যায়। উদ্ভিজ ট্যানিং পদ্ধতিতে ভারী চামড়া যেমন – সোলের চামড়া, বেল্টের চামড়া এসব পাকা করা যায়। বর্তমানে কৃত্রিম উপায়েও পাকা চামড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে।
চামড়া হল একটি শক্তিশালী, নমনীয় ও টেকসই উপাদান যা পশুর চামড়াকে পচন থেকে রক্ষার জন্য রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণের বা ট্যানিং এর মাধ্যমে পাওয়া যায়। চামড়ার উৎস যেমন- গরু, ছাগল, ভেড়া, উট পাখি, উট, মহিষ সহ অন্যান্য গৃহপালিত পশুপাখি। জলজ প্রাণীর মধ্যে সীল ও কুমির অন্যতম।
বিশ্বজুড়ে চামড়ার ব্যবহার ব্যাপক ও বহুমুখী। বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় চামড়া ব্যবহৃত হয়, চামড়া সবচেয়ে বড় ব্যবহার হয় জুতা তৈরিতে। জুতা, স্যান্ডেল, তৈরি পোশাক যেমন জ্যাকেট, প্যান্ট ও ফ্যাশনেবল পোশাকে চামড়া ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বেল্ট, মানিব্যাগ, হ্যান্ডব্যাগ, ঘড়ির বেল্টে চামড়া ব্যবহার করা হয়। যানবাহনের সিট, বিমানের সিট, ট্রেনের সিটে এই চামড়া ব্যবহার বহুল প্রচলিত আছে। ক্রীড়া সামগ্রী যেমন ফুটবল, বাস্কেটবল, বেসবল, বক্সিং গ্লাভস, ক্রিকেট গ্লাভস, ক্রিকেট এ চামড়া ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন যন্ত্রাংশের বেল্ট, গ্লাভস সরঞ্জামে ও ব্যবহৃত হয়। বই বাঁধানো, ডায়েরি, বিভিন্ন সৌখিন হস্তশিল্প, ফ্যাশনেবল বিভিন্ন সমৃদ্ধিতে চামড়া ব্যবহার করা হয়।
পশুর চামড়া কে তিন ভাগে ভাগ করা হয় –
 হাইড- বড় এবং পূর্ণবয়স্ক পশুর চামড়া কে হাইড বলে যেমন গরু, মহিষ, ঘোড়া এবং উটের চামড়া (৩০ Ib এর বেশি ওজনের চামড়া) ।
 স্কিন – ক্ষুদ্রাকৃতি পশু যেমন ছাগল ভেড়া বাছুর ইত্যাদি পশুর চামড়াকে স্কিন বলা হয়। (১৫ Ib কম ওজনের চামড়া)
 কিপ- প্রায় পূর্ণবয়স্ক একটি বাছুরের চেয়ে ক্ষুদ্র পশুকে কিপ বলে, (যা সাধারণত ১৫ Ib হতে ২৫ Ibওজন বিশিষ্ট) ।
পাকা চামড়ার উৎপাদন চামড়া থেকে কান, লেজ ফেলে দেওয়া হয়। ১২~২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে প্যাচালো ব্লেড যুক্ত সিলিন্ডার মেশিন দ্বারা মাংস দূরীভূত করা হয়। এরপর সাতদিন ধরে Na2S, ডাইমিথাইল অ্যামিন সহ সম্পৃক্ত চুনের দ্রবণে ভিজিয়ে রাখা হয়। চুলহীন পরিষ্কার চামড়াকে এনজাইম জাতীয় পদার্থ দ্বারা দুই দিন ধরে নরম করা হয় এবং ইহা হতে সম্পূর্ণরূপে চুন দূর করে ধৌত করার পর ট্যানিং এর উপযুক্ত করা হয়। দুই পদ্ধতিতে চামড়া ট্যানিং করা হয়- উদ্ভিজ ট্যানিং এবং ক্রোম ট্যানিং পদ্ধতি বা অক্সাজোলিডিন(Oxazolidine) ব্যবহার করেও ট্যান করা হয়। এছাড়া অ্যালডিহাইড – ট্যানিং চামড়া গ্লুটারালডিহাইড ট্যানিং করার পর ফিনিশিং করে চামড়া কে পাকা চামড়ায় রূপান্তর করা হয়। চামড়া কে পচনশীলতা ও সংকোচনশীলতা থেকে রক্ষা করে চামড়ার কোন পরিবর্তন না করে ইন্ডাস্ট্রিতে পাঠানোর উপযোগী করাকে কিউরিং বলে। চামড়া সংগ্রহের পর কারখানায় পাঠাতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় দরকার হয় এজন্য চামড়ার সংরক্ষণ করতে হয়। চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ দিয়ে চামড়া ফেলে রাখা হয়, লবণের উপস্থিতিতে চামড়া থেকে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যায় যার ফলে চামড়া পচনের হাত থেকে রক্ষা পায়। কাঁচা চামড়া তে 60-70% পানি থাকে। কিউরিং করা চামড়াকে ৫০~৫৫°F তাপমাত্রায় ৩০~৪০ দিনের মতো সংরক্ষণ করা হয়।
কাঁচা চামড়াকে পাকা করার প্রক্রিয়াকে পাকাকরণ বা লেদার ফিনিশিং বলে। সব চামড়ার ফিনিশিং একই রকম নয়, কি কাজে এই চামড়া ব্যবহার করা হবে সেটার উপর ভিত্তি করে কাঁচা চামড়াকে পাকাকরণ করা হয়। চামড়ার ফিনিশিং এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো চামড়ার তৈলাক্তকরন প্রসারণ ক্ষমতা বাড়ানো। চামড়া ট্যানিং এরপর শুকিয়ে গুদামে জমা করা হয় যাকে ক্রাস্ট চামড়া বলে, পরে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধাপে চামড়াকে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, ধাপগুলো হল – বিরঞ্জন, কারিং এবং রঙ করা।
চামড়াকে ট্যানিং করার পূর্বে ট্যানিং এর উপযোগী করতে চারটি পদ্ধতিতে কাজ করা হয় –
১) সোকিং পদ্ধতি
২) পশম দূরীকরণ পদ্ধতি
৩) বেটিং পদ্ধতি
৪) পিকলিং
সোকিং পদ্ধতিতে চামড়ার পানি দূরীকরণ ও মাংস অপসারণ করা হয়। চামড়া হতে পশম দূরীকরণের জন্য চামড়াকে অতিরিক্ত কঠিন চুন সম্বলিত সম্পৃক্ত চুনের দ্রবণে ডুবানো হয়। চুন প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে সল্ট লিকেজগুলো ভেঙ্গে দেয় ফলে প্রোটিন তার বিভিন্ন অ্যামিনো এসিডে ভেঙে পড়ে। এজন্য যতক্ষণ পর্যন্ত কোলাজেন প্রোটিনের আদ্র বিশ্লেষণ শুরু না হয় ততক্ষণ চামড়াকে চুনের দ্রবনে রাখা হয়। পরবর্তীতে দ্রবণ থেকে তুলে পশম গুলো অতি সহজে চামড়া থেকে তুলে ফেলা যায়।
এরপর বেটিং পদ্ধতিতে চুন করার ফলে চামড়ায় যে অতিরিক্ত ক্ষার ঢুকেছিল তা বের করা হয়। বেটিং করার জন্য চামড়াকে NH4CL দ্বারা ভিজিয়ে তারপর প্যানক্রিয়াটিক এনজাইম দ্রবণের ভিতর ডুবিয়ে রাখা হয়। এই এনজাইম চামড়ার অতিরিক্ত ক্ষারকে কমিয়ে ফেলে, বেটিং দ্রবণের pH= ৭.৬ এর মধ্যে রাখলে ভালো হয়। pH এর মান নিয়ন্ত্রণ চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেটিং বাথ-এ এনজাইমের ক্রিয়া ও চুনের প্রশমন ক্রিয়ার মাধ্যমে pH নিয়ন্ত্রিত হয়।
ক্রোম ট্যানিংয়ের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক ধাপকে পিকলিং বলা হয় । ভেজিটেবল ট্যানিং এর জন্য পিকলিং এর দরকার হয় না। ব্যাটিং করার পর চামড়াতে ক্যালসিয়াম থেকে যেতে পারে। ক্যালসিয়াম দূর করার জন্য পিকলিং এর প্রয়োজন হয়। পিকলিং এর জন্য ০.১M H2SO4 ও ০.১M Nacl দ্রবণের মিশ্রন ব্যবহার করা হয়। পিকলিং করার ফলে চামড়া পিচ্ছিল থাকে না। পিকলিং এর সময় প্রোটিন আর ক্যালসিয়াম লবন এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে Ca2+ দূর করে দেয় এবং প্রোটিনের মধ্যে পুনরায় লবণ গঠিত হয়। এজন্য দ্রবনের pH= ২.৮ এর মধ্যে রাখতে হয়। এই মানে চামড়া সবচেয়ে বেশি ভালো অবস্থায় রাখা যায়। pH এর ৫~৭ রাখতে পারলে চামড়ার জন্য সবচেয়ে ভাল।
জিলাটিন একটি জৈব নাইট্রোজেন ধারী প্রোটিন। মাত্র ১% জিলাটিন জলীয় দ্রবনকে ঠান্ডা করলে এটি জেলিতে পরিনত হয়। গ্লু ও জিলাটিন প্রায় একই রকমের দ্রব্য। গ্লুকে অপরিশোধিত জিলাটিন হিসেবে গন্য করা হয়। এরা উভয় কোলাজেন নামক পদার্থ হতে পানি বিশ্লেষণ দ্বারা তৈরি হয়। কোলাজেন পশুর চামড়া ও হাড়ের সংযোজক কোষের সাদা তন্তু।
চামড়া থেকে তিন প্রকার জিলাটিন তৈরি করা হয় যথা –
১) এডিবল (ভক্ষনীয়)
২) ফটোগ্রাফি
৩) নন- এডিবল (অভক্ষণীয়)
বর্তমানে জিলাটিন খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। এটি চর্বি ও প্রোটিনের সাথে মিশে খাদ্যদ্রব্য পরিপাকে সাহায্য করে। ফটোগ্রাফি শিল্পে জিলাটিনের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলছে।
চামড়ার গুণগত মান ও ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে চামড়াকে কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। স্তরের উপর ভিত্তি করে ফুল-গ্রেইন লেদার, টপ-গ্রেইন লেদার, কারেক্টেট গ্রেইন লেদার। সুইড এবং ফিনিশিং এর উপর ভিত্তি করে অ্যানিলিন লেদার, সেমি অ্যানিলিন লেদার , প্রোটেক্টেড লেদার, পেটেন্ট লেদার। পাকা করন বা ট্যানিং এর উপর ভিত্তি করে ভেজিটেবল ট্যানড লেদার, ক্রোম ট্যানড লেদার এভাবে ভাগ করা হয়। বাংলাদেশের কাঁচা চামড়াকে আর যোগ্য চামড়ায় রূপান্তরের জন্য অনেকগুলো ধাপে কার্যসম্পাদন করা হয় যা ট্যানারি গুলোতে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশে চামড়ার শিল্পে কাঁচা চামড়াকে ব্যবহারযোগ্য, টেকসই ও আকর্ষণীয় চামড়ায় রূপান্তর করতে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়। প্রধান রাসায়নিক গুলো হল :
১. সংরক্ষণের জন্য Nacl- লবণ
২. বিম হার্ডস অপারেশনের জন্য: Na2S (সোডিয়াম সালফাইড)- চামড়া থেকে লোম ছাড়ানো
চুন (ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড) – চামড়া পরিষ্কার ও ফোলাতে ব্যবহৃত হয়।
সোডা-অ্যাশ Na2CO3 ক্ষারীয় করার জন্য
সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH) চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য

ট্যানিং ধাপে বেসিক ক্রোমিয়াম সালফেট চামড়া কে টেকসই ও নরম করার জন্য প্রধান ট্যানিং এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফরমিক এসিড (HCOOH): PH কমানোর জন্য
সালফিউরিক এসিড H2SO4 চামড়া সংরক্ষণের জন্য
ফিনিশিং ধাপে:
নিনটেন: চামড়াকে নির্দিষ্ট আকার ও অনুভূতি দেয়ার জন্য
ফ্যাটলিকুইর: চামড়া কে নরম ও নমনীয় করার জন্য তৈল জাতীয় পদার্থ ডাই(2gh) চামড়া রং করার জন্য
ফিনিশিং এজেন্ট: চামড়ার উপরিভাগ চকচকে ও মজবুত করার জন্য।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চামড়ার মূল্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ভিয়েতনামে ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ চামড়ার খুচরা মূল্য প্রায় ৭.৬৬ থেকে ১৯.১৫ ডলার। প্রতি বর্গফুট চামড়ার মূল্য ৩ থেকে ৫ ডলার। উন্নত মানের চামড়া প্রায় ১০ ডলার/বর্গফুট। ভারতের যেটি ৪ থেকে ৫ ডলার প্রতি বর্গফুট এবং চায়নাতে প্রতি বর্গফুট চামড়া ২-৭ ডলার।
কিন্তু বিগত ১৫ বছরের ও বেশি সময় ধরে আমাদের দেশে চামড়া খাত ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। আমাদের দেশে চামড়া সংরক্ষণ ও চামড়া প্রক্রিয়াজাত প্রক্রিয়াটি ভেঙ্গে গেছে উদাসীন মনোভাব ও বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের তৈরি না করার কারণে। আমাদের দেশে কোরবানীর সময় সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে সুযোগ হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলছি, নালা নর্দমায় ফেলে দিচ্ছি। কোরবানির সময় পশুর চামড়া যেগুলো ১০০০~১২০০ টাকায় বিক্রি হত সেসব চামড়া ১০০~২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
অপরদিকে বাংলাদেশকে বলা হত চামড়া দেশ। দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল চামড়া। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার যে চামড়া ছিল সে চামড়া এখন আমরা বিদেশ থেকে আমদানি করি। বিভিন্ন উৎস হতে প্রাপ্ত তথ্য মতে বাংলাদেশ ১৫০০~২০০০ কোটি টাকার চামড়া আমদানি করে থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চামড়ার চাহিদা যদি দেখি তাহলে দেখা যাবে চামড়ার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রায় ১০~১২ বছর আগে থেকে হ্যান্ড ব্যাগ কোম্পানিগুলো অস্ট্রেলিয়ার কুমিরের খামারগুলো ইজারা নেওয়া শুরু করেছে যাতে চামড়ার চাহিদা মিটানো যায় পক্ষান্তরে আমরা চামড়া শিল্পকে ধ্বংস করে ফেলছি। বিশ্বে যেসব চামড়া জাত পণ্য কারখানা ও চামড়া জাত পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আছে তারা বিভিন্ন সময় আমাদেরকে তাগাদা দিয়েছেন আমাদের চামড়া শিল্পকে রক্ষা করার জন্য, আমাদের চামড়া গুণগত মান খুবই ভালো তাই তাদের আগ্রহও বেশি তাই চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উপর জোর দিয়েছেন প্রতিনিয়ত। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধান-চাল যেভাবে সংগ্রহ করা হয় সেভাবে চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণে তাগদা দিয়েছেন আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী বিদেশী বন্ধুরা। বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান গুলো চামড়া জাত ও পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে শুধুমাত্র চামড়ার সহজপ্রাপ্যতার জন্য। অপরিকল্পিতভাবে হাজারীবাগে ট্যানারি গুলো স্থানান্তর ফলে বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস নামে । হাজারিবাগের ট্যানারি পরিবেশ দূষণ করার কারণে এবং বুড়িগঙ্গার পানিতে ট্যানারি বর্জ্য ছড়ানোর কারণে পানি দূষিত হয়ে পড়ছিল। ২০১৭-২০১৮ যেটি সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করা হয়। এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপ চামড়া শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। অপরদিকে ভিয়েতনামের বেশ কিছু চামড়ার কারখানা লেদার ওয়াকিং গ্রুপ প্রত্যায়িত । এর মধ্যে ১৪ টি গোল্ড সার্টিফাইড ও ৩টি সিলভার সার্টিফাইট কারখানা রয়েছে। পাকিস্তানের চামড়া শিল্প দেশটির অর্থনীতিতে জিডিপির ৫% অবদান রাখে এবং এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত । ভারত বিশ্বের চামড়া উৎপাদনের প্রায় ১৩% ভাগ দখল করে আছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুতে দেশটির প্রধান চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এলাকাগুলো অবস্থিত। চীনের ট্যানারি শিল্প অত্যন্ত উন্নত এবং সুসংগঠিত যা বিশ্বজুড়ে চামড়াজাত পণ্যের প্রধান সরবরাহকারী। ডং ওয়ান ও জিয়ামেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে Prime Asia ও ECCO এর মতো এর মত গোল্ড রেটেড ট্যানারি গুলো বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও পরিবেশ বান্ধব মানদণ্ড বজায় রেখে কাজ করছে। বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচা চামড়া আমদানি করে তারা উচ্চমানের চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে। বিশ্বে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলছে। বাংলাদেশ হাতে গোনা কয়েকটি হ্যান্ড ব্যাগ ও সুজ ফ্যাক্টরি রয়েছে যা বিশ্ববাজারে চাহিদার তুলনায় নগণ্য। আমরা বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্পের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। একক শিল্পের নির্ভরতা যে কোন মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। চামড়ার জাত পণ্যের চাহিদার কথা মাথায় রেখে চামড়া জাত পণ্য তৈরির জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য । চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ট্যানারি শিল্পের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। আমাদের দেশেই কাঁচা চামড়ার পাকাকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে আমাদের কাঁচা চামড়া চীন ও ভারত নিয়ে পাকাকরণের কাজ করে উন্নত মানের চামড়া তৈরি করছে। আমাদেরকে অবশ্যই উন্নতমানের ট্যানারি স্থাপন করতে হবে এবং LWG(Leather Working Group) সার্টিফিকেট থাকতে হবে। বাংলাদেশের চামড়ার শিল্প সম্ভাবনাময় খাত হলেও ট্যানারি স্থাপন ও স্থানান্তরের অব্যবস্থাপনার কারণে চামড়া শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। হাজারীবাগ থেকে অপরিকল্পিতভাবে ট্যানারি স্থানান্তর করা হয়েছে সাভারের হেমায়েতপুরে। যেখানে CETP স্থাপন কার্যকর ভাবে না করার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে যার ফলে LWG সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক নামি-দামি ব্রান্ডগুলো LWG সনদ ছাড়া চামড়া কেনে না। সাভারের ট্যানারিগুলো অতিরিক্ত পরিবেশ দূষণের কারণে LWG সনদ পাওয়া কঠিন হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য CETP স্থাপন করে পরিবেশ দূষণ রোধ করতে হবে। অপরদিকে বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে প্রচুর চামড়া একসাথে পাওয়া যায় ফলে এর সঠিক সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অভাবে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। চামড়া শিল্প ও চামড়া সম্পদ চরম অবহেলিত, একসময় চামড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারীর মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে থেকে এখন তলানিতে নেমে গেছে। আমাদের দেশের চামড়ার ৭৫% কাঁচা চামড়া হিসেবে রপ্তানি হয় । আমরা যদি চামড়া প্রক্রিয়ার হাত করে রপ্তানি করে তাহলে ৭ থেকে ৮ গুণ বেশি দামে চামড়া থেকে আয় করা সম্ভব।
চামড়া শিল্পের সাথে পরিবেশের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ও পাকা করনের সময় বিভিন্ন ধাপে রাসায়নিক ব্যবহরের প্রয়োজন পড়ে। যেমন- ক্রোসিয়াম, ফিনেল, সাবান, চুন, সালফাইড, ফরমিক অ্যাসিড, সালফিউরিক অ্যাসিড ইত্যাদি।
তাছাড়া চামড়া ট্যানিং এর সময় প্রচুর বর্জ্য বের হয়। বর্জ্যগুলো পরিবেশে দূষিত করে। এসব বর্জ্য পরিশোধন করে ট্যানারি শিল্পগুলোকে আধুনিকরণ পরিবেশ দূষণ থেকে মানুষ রক্ষা পাবে। হাজারীবাগ ট্যানারির পরিবেশ দূষনের কারণে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনায় ৪ এপ্রিল ২০১৭ সালে হাজারীবাগের প্রায় ১০০ ট্যানারি বন্ধ করে দিতে হয়। পরবর্তীতে সাভারের হেমায়েতপুর এ ট্যানারি স্থানান্তর হলে ও তা আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে পারেনি। LWG সনদ পেতে হলে অবশ্যই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও পরিবেশ দূষনের দিকে নজর রাখতে হবে। CETP স্থাপনের মাধ্যমে প্রত্যেক ট্যানারির বর্জ্য পরিশোধন করে তাদের দৈনন্দিন কার্য সম্পাদন করলে আন্তর্জাতিক বড় বড় কোম্পানীগুলো বাংলাদেশী চামড়ায় প্রতি আগ্রহ দেখাবে। চামড়ার বর্জ্য স্বাভাবিকভাবে মাটির সাথে মিশে না যা ২৫-৪০ বছর সময় লাগে মাটির সাথে মিশতে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরনের সময় বায়ু দূষণ ও হয়। এর কারনে এসিডের সাথে মেশানোর সময় হাইড্রোজেন সালফাইড তৈরী হয়। চুন অপসারনের সময় অ্যামোনিয়া নির্গত হয়। এক টন কাঁচা চামড়া থেকে সাধারণত ২০-৪০ ঘনমিটার বর্জ্য পানি উৎপন্ন হয়। যার মধ্যে ১০০-৪০০ mg/ltr ক্রোমিয়াম, ২০০-৮০০ mg/ltr সালফাইড। উচ্চমাত্রার চর্বি ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্যে রোগ-জীবানু থাকে। চামড়া ট্যানিং এর সময় বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখতে হবে।
Leather Working Group (LWG) Certified হতে হলে অবশ্যই ট্যানারি গুলোকে পরিবেশগত সচেতনাতার দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষত বর্জ্য পানি শোধন, ক্ষতিকর ক্যামিকেলের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।বাংলাদেশের হাতে গোনা কয়েকটি ট্যানারি LWG গোল্ড বা সিলভার সনদ পেয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ২০০ এর উপরে ট্যানারি রয়েছে। এসব ট্যানারিগুলো প্রধানত হাজারীবাগ ও সাভারে অবস্থিত। এসব ট্যানারি থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য ও পানি পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে। ভারী ধাতু ক্রোমিয়াম বুড়িগঙ্গার পানিতে পাওয়া যাচ্ছে। দৈনিক ১৫০০০ লিটার বর্জ্যযুক্ত পানি নদীতে মিশছে যার ফলে উচ্চমাত্রায় TDS (Total Dissolved Solids) থাকছে পানিতে। বুড়িগঙ্গার পানি ভয়াবহ মাত্রায় দূষিত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি BOD এর মান ৭৫~১৭৪ mg/ltr এবং COD ১৪৫ mg/ltr এর বেশি। একই ভাবে ট্যানারি অপরিশোধিত বর্জ্য ও পানি তুরাগ নদীতে যাওয়ার কারনে তুরাগ নদীর পানি ও মারাত্মক ভাবে দূষিত হচ্ছে। ট্যানারি বর্জ্য ও পানি অপরিশোধিত পানি তুরাগ থেকে ধলেশ্বয়ী নদীর পানিতে ও মিশছে। ধলেশ্বরীর নদীর পানিতে উচ্চ মাত্রায় ক্রোমিয়াম পাওয়া যাচ্ছে। LWG সনদ প্রদানের সময় পরিবেশগত দিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় তাই ট্যানারি দূষণ কমানো বা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য সব পক্ষকে গুরুত্বসহকারে কাজ করতে হবে।
চামড়া ও চামড়া শিল্প বর্তমানে চরমভাবে অবহেলিত ও উপেক্ষিত। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতের মধ্যে যেটি ছিল দ্বিতীয় স্থানে। আমরা একটু সচেতন হলে সঠিক পরিল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ শিল্পকে সম্ভাবনাময় শিল্পে রুপান্তর করতে পারব। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টর মাধ্যমে এ খাতে বৈদেশিক মুদ্র অর্জন আবার আগের অবস্থান নিয়ে যেতে পারব। উন্নত দেশগুলোতে চামড়া চাহিদার কথা বিবেচনা করে এ খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমানে আমাদের কাঁচা চামড়ার ৭৫% ওয়েট ব্লু হিসেবে রপ্তানি হয়ে থাকে। এ ওয়েট ব্লু বিদেশে কাঁচা মাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। “ওয়েট ব্লু” হিসেবে চামড়া রপ্তানি করার কারনে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভারত ও চীন আমাদের দেশ থেকে ওয়েট ব্লু ক্রয় করে প্রক্রিয়াজাত করনের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। আমরা যদি ওয়েট ব্লু হিসেবে বিক্রি না করে নিজেরা প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করলে ৭-৮ গুন বেশী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। পাশাপাশি চামড়া প্রক্রিয়াজাত করনের কাজে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জলবায়ূ ও প্রাকৃতিক কারনে বাংলাদেশের চামড়া উন্নত মানের কিন্ত আমাদের চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়া জাতকরনের অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারনে কাক্ষিত লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের সংগৃহীত চামড়ার ১৫~২০ % চামড়া সংরক্ষণ পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিটি জেলায় চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষনের জন্য সরকারী পর্যায়ে উদ্যেগের অভাবের কারনে এ খাতে আমরা দিন দিন পিছিয়ে পড়ছি। জেলা পর্যায়ে যদি চামড়া গ্রেডিং করে সংরক্ষণ করা য়ায় তাহলে চামড়া গুনগত মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াজাত করনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। চামড়া শিল্পে প্রচুর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহৃত হয়। এসব রাসায়নিক উপদান বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। এজন্য চামড়া বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এ খাতে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। সেখানে উল্লেখ্য যে এক ক্যামিকেলের নাম দিয়ে অন্য ক্যামিকেল আনার প্রবনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। চামড়া শিল্পের উন্নয়ন করতে হলে লেদার টেকনোলজি বিষয় দেশের পাবলিক ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের আদলে বিভাগ খোলা প্রয়োজন। তাহলে দক্ষ লেদার টেকনোলজিস্ট তৈরী করা সম্ভব। পাকা চামড়া ও চামড়া জাত পন্যের চাহিদা বৃদ্ধির কারনে উন্নত দেশ সমূহে রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পচ্ছে। বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়া শিল্পের জন্য সরকারী পার্যায়ে তদারকি না থাকার কারনে উন্নত মানের বিপুল চামড়া থাকা সত্ত্বেও আমরা এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
এ মূহুর্তে সরকারের চামড়া ও চামড়া শিল্পের তদাকির জন্য আলাদা বিভাগ অথবা অধিদপ্তর খোলা যা এ বিষয়ে তদারকি করে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিবে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে চামড়াজাত পন্য রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্র অর্জন সম্ভব হবে।
চামড়া শিল্প বাঁচাতে আমাদের করনীয়ঃ

বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজনীয় কর্ম পরিকল্পনা নির্ধারন করতে হবে। এ বিষয়ে করনীয় নিয়ে আলোচনা করা য়াক—
১। সারা বছর পশুর চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষনের ব্যবস্থা নিতে হবে যেভাবে শস্য সংগ্রহ করা হয় রাষ্ট্রীয় ভাবে।
২। বিশেষত ঈদুল আজাহার সময় প্রচুর পশু কোরবানী হয় তাই এ সময়ে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষনের জন্য সরকারী বিশেষ টাষ্ক ফোর্স গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
৩। লবনের সরবরাহ নিয়মিত চেক করা যাতে লবনের ঘ্টাতির কারনে চামড়া সংরক্ষণ ব্যহত না হয়।
৪। চামড়া ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থ করা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।
৫। চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যসমূহ যথাসময়ে সঠিকভাবে আমদানি, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে কাঁচা চামড়ার মান বজায় থাকে এবং সংরক্ষণে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়।
৬। গ্রাম, উপজেলা ও শহর পর্যায়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য চামড়ার গুরুত্ব, সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) সম্পর্কে প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে, যাতে তারা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।
৭। ট্যানারি শিল্পে CETP স্থাপন বাধ্যতামূলক করা যাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক ভাবে করা যায় এবং দূষণ মুক্ত পরিবেশে ট্যানারি শিল্পগুলো গড়ে উঠে।
৮। ট্যানরিগুলো LWG সনদ পায় সে লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা।
৯। চামড়া পাকা করনের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা।
১০। চামড়াজাত পন্য উৎপাদনের জন্য দেশী-বিদেশী বিনোয়োগকারীদের উৎসাহ প্রদান ও প্রণোদনার ব্যবস্থ করা।
১১। চামড়া শিল্পের উন্নয়নে চামড়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর কার্যক্রম জোরদার করা।
১২। চামড়া ও চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে হলে অতি দ্রুত শিল্প মন্ত্রনালয়ের অধীনে একটি বিভাগ অথবা অধিদপ্তর করা যাতে চামড়া খাত নিয়ে বিশেষ তদারকির ব্যবস্থা করা যায়।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
Ads by coinserom