শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কালিয়াকৈরে শিল্পাঞ্চল পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পর অনেকটায় স্বাভাবিক কর্ণফুলীতে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২-এর উদ্বোধন ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৫৩৫ অধ্যক্ষকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ইরান, গাজা, ইউক্রেনের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের মানে কী Ramayana Box Office Collection Day 1: Ranbir Kapoor, Yash’s Film Mints Rs 64.85 Crore On Opening Day | Bollywood News ‘Ordinary bowler’: Ex-India captain slams CSK’s ‘confusing’ trade, says SRH are the real winners | Cricket News শিল্পকারখানায় অস্থিরতা সৃষ্টিতে পলাতক আ.লীগের ইন্ধন রয়েছে: রিজভী মইজ্জ‍্যারটেকে আবাসিক হোটেলের আড়ালে দেহ ব্যবসার অভিযোগ ‎শ্যামনগরে লবণাক্ততা নিরসন ও কৃষি অভিযোজনবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত

হাতের বদলে কলম ধরেছে পা

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ২৮৩ সময় দেখুন
হাতের বদলে কলম ধরেছে পা


রংপুর: পরীক্ষার হলে শত শত পরীক্ষার্থী যখন হাতে কলম নিয়ে লিখছেন, তখন কলি রানী লিখছেন ডান পা দিয়ে। জন্ম থেকেই তার দু’হাতের কবজি নেই। কিন্তু শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা কখনোই থামাতে পারেনি তার পড়াশোনার পথ। রংপুরের কাউনিয়ার গদাই গ্রামের এই মেয়েটি এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রমাণ করলেন— স্বপ্নের কাছে প্রতিবন্ধকতা কখনো বড় হয় না।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় রংপুরের কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিচ্ছেন কলি রানী। অন্যদের মতো তিনিও পরীক্ষার কক্ষে বসে ছোট একটি বেঞ্চে খাতায় লিখছেন। শুধু পার্থক্যটা হলো, তার হাতের বদলে কলম ধরেছে পা। এই দৃশ্যই এখন অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

যে সংগ্রামের গল্প সবার জানা উচিত

কলি রানীর বাড়ি কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গদাই গ্রামে। তিনি মৃত মনোরঞ্জন রায় ও রুপালী রানীর ছয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। জন্মের সময় থেকেই তার দু’হাতের কবজি নেই—এ খবর পরিবারের জন্য ছিল চরম বেদনার। কিন্তু কলি রানী সে বেদনাকে শক্তিতে পরিণত করেছেন।

ছোটবেলা থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অন্য শিশুদের মতো তিনি হাতে কলম ধরে লেখা শিখতে পারবেন না। কিন্তু তাই বলে কি থেমে যাওয়ার কথা? না, তিনি বেছে নিলেন ভিন্ন পথ। ধীরে ধীরে ডান পা দিয়ে লেখার অনুশীলন শুরু করলেন। শুরুতে ছিল অসংখ্য ব্যর্থতা, পায়ে ব্যথা, কলম বারবার পড়ে যাওয়া— কিন্তু তিনি হার মানেননি। প্রতিদিনের চর্চায় একসময় পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম ধরা শিখে গেলেন, আর তখন থেকেই তার হাতের (পায়ের) লেখা হয়ে উঠল অসাধারণ।

কেবল লেখাপড়া নয়, গানেও সিদ্ধহস্ত

শুধু লেখাপড়ায় নয়, কলি রানী গানেও পারদর্শী। গান গেয়ে তিনি এরই মধ্যে একাধিক সম্মাননা ও স্মারক অর্জন করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহারেও তিনি পিছিয়ে নেই—পা দিয়েই চালান কম্পিউটার ও মুঠোফোন। তার কাছে এটি কোনো বিস্ময় নয়, বরং নিয়মিত অনুশীলনের ফল।

কলি রানীর দর্শন পরিষ্কার— মানুষের শক্তি শরীরে নয়, থাকে ইচ্ছাশক্তিতে। আর এই ইচ্ছাশক্তিকেই তিনি করেছেন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। পঞ্চম শ্রেণিতে এ গ্রেড, এসএসসিতে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ—সবটাই তিনি করেছেন পায়ের সাহায্যে। এবার এইচএসসি পরীক্ষার খাতায়ও পা দিয়েই লিখছেন নিজের ভবিষ্যতের ঠিকানা।

পথ যত কঠিনই হোক স্বপ্ন বড়

কলি রানীর স্বপ্ন একদিন বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করা। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য কিছু করতে চান তিনি। তার এই স্বপ্নের পথ কিন্তু সহজ নয়। অভাব, সীমাবদ্ধতা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা—সব মিলিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল চ্যালেঞ্জের। তবু তিনি কখনো থেমে থাকেননি।

কলি রানীর ভাই মন্টু রাম রায় সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে জানান, বোনের জন্ম থেকেই হাতের আঙুল নেই, হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় হাতে কলম ধরা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার ইচ্ছাশক্তি ছিল অসাধারণ। নিজের চেষ্টায় তিনি পা দিয়ে লেখা শিখে নেন, আর এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রশাসনের পাশে থাকার অঙ্গীকার

কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী কলি রানীকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। তিনি অন্যদের মতোই পরীক্ষার হলে বসে পা দিয়ে লিখছেন, যা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা সারাবাংলাকে বলেন, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলি রানীকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। উপজেলা প্রশাসন চায়, তার এই অদম্য অগ্রযাত্রা যেন কোনোভাবেই থেমে না যায়। তিনি যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন, সে পথচলায় প্রশাসন তার পাশে থাকবে।’

ভালোবাসা আর সহজ সরল জীবন

যে পা দিয়ে লেখেন, সেই পা দিয়েই চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া—সবকিছু করেন কলি রানী। খুব সহজ-সরল জীবন তার। কিন্তু সেই সরলতার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক অদম্য মানসিকতা। কাউনিয়ার গদাই গ্রামের মাটি এখন গর্বিত তার এই মেয়েকে নিয়ে। তিনি প্রমাণ করেছেন, সীমাবদ্ধতা মানেই শেষ নয়, বরং তা হতে পারে নতুন শুরুর সম্ভাবনা।

কলি রানী আজ শুধু একজন পরীক্ষার্থী নন; তিনি একটি প্রতীক—প্রতিটি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আশার আলো, যারা মনে করে শরীরের কোনো ঘাটতি তাদের স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা। কলি রানী দেখিয়ে দিয়েছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে সব বাধাই অতিক্রম করা যায়।

কলি রানীর এই পথচলা এখনও শেষ হয়নি। বরং সবে শুরু। তার হাত নেই, কিন্তু হাজারো মানুষের হাত হয়ে তিনি পৌঁছে যাবেন তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে— এটুকু বিশ্বাস রাখতে বাধ্য প্রত্যেকে, যারা তার এই লড়াই দেখেছেন।





Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর