শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

ক্রাফটি বায়োস্কোপ – কে সাথে নিয়ে সানজিদার অদম্য পথচলা

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ৮ জুলাই, ২০২১
  • ৩৯৬ সময় দেখুন


“২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মনে হল পারিবারিক বিধিনিষেধ কিছুটা কমে এসেছে, এই স্বাধীনতা টাকে একটু অন্য রকম ভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

ব্যবসার আইডিয়া খুঁজতে খুঁজতে প্রথমে কাপড়, তারপর গয়না নিয়ে কয়েক বন্ধু মিলে কাজও শুরু করে দিই।

কিন্তু কখনো ব্যবসার ধরণ আবার কখনো টিম (কর্মীদল) নিয়ে শান্তি পাচ্ছিলাম না। তাই ১ বছর পর সব বন্ধ করে দিয়ে একটা বিরতি নিই আরও একটু পরিকল্পনা করে সবকিছু নতুন করে শুরু করব ভেবে।

ততদিনে ক্যাম্পাসের সিনিয়র ভাই-বোন বা বন্ধুদের জন্মদিনে আমার হাতে বানানো “স্ক্র্যাপবুক” বা “এক্সপ্লোরেশন বক্স” গিফট করার কথা বেশ জানাজানি হয়ে গেল।

আর তখনই ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সিনিয়রের পরামর্শে তাদের বন্ধুমহলের জন্য সম্মানীর বিনিময়ে কাজ করা শুরু করলাম।”

ক্রাফটিং এর জগতে নিজের পা রাখা এবং তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান “ক্রাফটি বায়োস্কোপ” এর শুরুর গল্পটি বলছিলেন বন্ধুমহলে “ওসমান ভাই” নামে পরিচিত সানজিদা ওসমান। পৈতৃক আবাস গাইবান্ধাতে হলেও জন্মসূত্রে আর পড়াশোনার জন্য ছোটবেলা থেকেই চট্টগ্রামে বসবাস। বর্তমানে চাকরি সূত্রে থাকছেন কক্সবাজারে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

“২০১৫ সালে এক ভাইয়া তার বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার আমার কাছে বানিয়ে দেওয়ার অর্ডার দেন।ওটাই ছিল আমার প্রথম বিক্রির অভিজ্ঞতা। উপহার হিসেবে ৭৫০ টাকার একটা মাল্টিলেয়ার্ড কার্ড বানিয়েছিলাম।

তারপর নিজের প্রতিষ্ঠান এর জন্য ফেইসবুকে পেইজ-গ্রুপ খোলা, নতুন নতুন কার্ড-এলবাম বানিয়ে ছবি তোলা-ভিডিও করা এসব সমানতালে চলতে লাগল। ২০১৫ এর ১৭ আগস্ট পুরোদমে আমার প্রতিষ্ঠান “ক্রাফটি বায়োস্কোপ” এর যাত্রা শুরু হয়েছিল।”

এই বিস্তীর্ণ চলার পথে কার কার থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে এসেছেন? পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজের পাশাপাশি নিজের ব্যবসা কিভাবে সামলে নিয়েছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনুপ্রেরণা কারা দিয়েছে বলতে গেলে তা শেষ করা যাবেনা। যদি বলি ক্রাফটিং এর ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার কথা – তাহলে বলব পরিবার, বন্ধুমহল কিংবা সিনিয়র ভাইয়া-আপুরা অবশ্যই অনুপ্রেরণা আর সাহস দিয়েছে সবসময়। ক্যাম্পাসে যখন কেউ আমাকে দেখিয়ে বলত – মেয়েটা কাগজ দিয়ে খুব সুন্দর কাজ করে, তখন খুব বেশি অনুপ্রাণিত হতাম।যখন কেউ অবাক হয়ে বলত – অর্থনীতি পড়ে, এতোগুলো টিউশন করে ক্রাফটিং ও করো, আবার ক্যাম্পাস লাইফের প্রতিটা মুহুর্ত ও উপভোগ কর,কিভাবে পারো? সেই মানুষগুলোর আমার প্রতি মুগ্ধতাও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতো।

পড়াশোনা, ক্রাফটিং আর ব্যবসা একসাথে চালিয়ে নেয়া একই সাথে কঠিন এবং সহজ। কঠিন হয় যদি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। আর সহজ হয় যদি ভারসাম্য ধরে রাখতে পারি। প্রথমত আমি পেরেছি কারণ আমি যেকোনো কাজ খুব মন দিয়ে করি যদি সেটা আমার ভালো লাগার কাজ হয়৷ পড়াশোনা করতে ভালো লাগতো কারণ আমার সাবজেক্ট টা খুবই ইন্টারেস্টিং, রেজাল্ট ভালো করার একটা নেশা কাজ করতো সবসময়। পড়াশোনা, টিউশন, ক্রাফটিং – এই ৩ টা কাজই আমার ভীষণ পছন্দের ছিল। তাই সময়টা সবসময় ভাগ করা থাকতো এই ৩ টা কাজের জন্য, যার সাথে কোন আপোষ করতাম না।

তাছাড়া এই ৩ টা কাজ আমি নেশার মত করতাম বলে পরিবার ও বন্ধুরা খুব সাপোর্ট করতো। কখনো অর্ডারের চাপ থাকলে বন্ধুরা সাপোর্ট করতো, পরীক্ষার চাপ থাকলে ক্লায়েন্টরা সাপোর্ট করতো। মজার বিষয় হচ্ছে, আমার প্রতিটা টিউশনে আমাকে আমার কাজের জন্য খুব তারিফ করত।”

ব্যবসার ক্ষেত্রে কি কি প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে? কিভাবেই বা এই চলার পথের বাধাগুলোকে কাটিয়ে উঠেছেন? এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি শুরু করেন একেবারে ব্যবসার গোড়ার দিকের ঘটনা থেকে, “প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল কাগজের কাজ কিংবা “স্ক্র্যাপবুকিং” বিষয় টা মানুষের কাছে পরিচিত করা, এটা যে শুধু ৫ টাকার আর্ট পেপার কিনলেই তৈরি করা যায় না – এটা বুঝানো। কাগজের জিনিস হলেও এটা যে কাগজে-কলমে ঠোঙার মত ক্ষণস্থায়ী না – এটা বিশ্বাস করানো, ম্যাটেরিয়াল মার্কেট খুঁজে বের করাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

ডেলিভারি মেথডগুলো শুরুর দিকের সময় এতো “ফ্রেন্ডলি” ছিল না। তাই নিজে গিয়ে ডেলিভারি করতে পারলে তবেই অর্ডার নিতে পারতাম। ২০১৪-১৫ এর দিকে এই কাজের কদর করার মত মানুষ হাতেগোনা কয়েকজন ছিল। সবাই কৌতুহল দেখাতো, কেউ কেউ হুজুগে ইউটিউব দেখে টুকটাক ক্রাফটিং শিখে মার্কেট প্রাইস কমাতে লাগল কপিড ডিজাইন বা লোকাল ম্যাটেরিয়াল দিয়ে রেপ্লিকা সেল করে।

লোকাল মার্কেটের প্রচলিত সস্তা ম্যাটেরিয়াল এর ভীড়ে কিছুটা দামি আর মানসম্পন্ন ইম্পোরটেড ম্যাটেরিয়াল এর জায়গা তৈরি করাটা সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হতো।

ক্রাফটি বায়োস্কোপ এর মূল বিশেষত্ব হল আমরা কাস্টমাইজড কাজ করি। যখন দেখলাম পেপার ক্রাফট চট্টগ্রাম এর মার্কেটে বেশ কম পরিচিত তখন পেপার ক্রাফট এর দিকে কম ফোকাস করে ফোকাস করেছিলাম কাস্টমার আর কাস্টমাইজেশন এর দিকে। ক্লায়েন্টের রুচি, যাকে গিফট করবে তার চোখের মুগ্ধতার থেকে তার মনে কিভাবে জায়গা করে নেয়া যায় তাতে জোর দিলাম। ক্লায়েন্টের গল্প গুলো ফুটিয়ে তুলতে চাইলাম কাগজে। কোন জিনিস দেখে যদি মনে হয় এটা শুধু আমার জন্যই বানানো, আমার গল্পটা কেবল আমিই বুঝতে পারব আর যাকে বোঝাতে চাই তাকেই বোঝাতে পারব তাহলে সেই জিনিসটা একটু বেশি আপন হয়ে যায় আমাদের জন্য। আর এই বিষয়টাতে ফোকাস করার পর আমার কাজ অনেকটা সহজ হয়ে গেছে।

এবার যদি বলি বাধাটা কীভাবে পার করলাম তাহলে বলব লেখা দিয়ে। আমি রেপ্লিকা প্রোডাক্ট কিনতাম, একই প্রোডাক্ট আমি কোয়ালিটিফুল ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি করতাম। তারপর দুটোর মধ্যে পার্থক্য নিয়ে লিখতাম ফেসবুক পেইজে বা গ্রুপে। আমার লেখালেখির দুটো সুফল ছিল –

প্রথমত, রেপ্লিকা আর অরিজিন এর পার্থক্য বোঝাতে পারতাম, মামুষ আসল ম্যাটেরিয়াল যেন চিনতে পারে সেটা নিশ্চিত করতাম। দ্বিতীয়ত, আমার লেখা পড়ে মানুষ আমাকে ভরসা করতে লাগল আগের থেকে বেশি। তারা ভরসা করতে লাগল আমি জেনে বুঝে ক্রাফটিং করি, কোয়ালিটি মেইনটেন করি এবং যেহেতু আমি বিষয়গুলো নিয়ো স্বচ্ছ ধারণা রাখি, তাই ক্লায়েন্ট আমার কাছে অবশ্যই ভালো প্রোডাক্ট পাবে।”

কিভাবে কাজগুলো পরিচালনা করছেন? কাজ নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? এসব ব্যাপারে তিনি বলেন, “যা কিছু করার সব আগে আমি নিজেই করতাম। এখন আমার বেশ স্ট্রং একটা টিম আছে আলহামদুলিল্লাহ। ছোট হলেও এই টিম দিয়ে আমার দিব্যি চলে যাচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে টিম বড় করার ইচ্ছে আছে। নতুন টিম মেম্বার খুঁজছিও। তবে নতুন টীম মেম্বারের ক্ষেত্রে শর্ত হল অবশ্যই ক্রাফটিং ভালোবাসতে হবে, ক্রাফট বিজনেস এর ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে প্রফিট না বরং একটা সুন্দর প্রোডাক্ট দেখতে জানতে হবে আর অবশ্যই সৎ হতে হবে।

আমরা প্রি-অর্ডার এ কাজ করি। আমাদের রেডিস্টক মোটামুটি থাকেই না বলা যায়। যেহেতু আমরা কাস্টমাইজেশন এ ফোকাস করি তাই অর্ডার কনফার্ম হওয়ার পর কাজ শুরু করি। প্রতিটা প্রোডাক্টই আমাদের নিজস্ব ডিজাইন এবং নিজেদের ক্রাফটার দিয়ে বানানো।

সামনে একটা ক্রাফট শপ খোলার স্বপ্ন নিয়েই এগোচ্ছি। বাকিটা মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছা। তবে কয়েকমাস পর থেকে ঢাকার একটা ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করার ইচ্ছে আছে, তাদের গ্যালারিতে আমাদের প্রোডাক্ট প্রদর্শনী এবং বিক্রয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে।”

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক কিছু কথা বলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলেন, “নতুন উদ্যোক্তা এবং ক্রাফটার – যাই বলি না কেন তাদের জন্য কয়েকটা দিকনির্দেশনা দিতে হলে প্রথমেই বলব, যেকোনো কাজেই সফল হতে হলে সবার আগে প্রচুর ধৈর্য্য থাকতে হবে। ইদানীং সবার মধ্যে একটা ডেসপারেট টেন্ডেন্সি দেখা যায়। শুরু করার আগেই সবাই প্রফিট নিয়ে ভাবে। এটা ঠিক না।

দ্বিতীয়ত, নিজেকে অন্যদের সাথে তুলনা করা বন্ধ করুন। নিজেকে মিজের সাথে তুলনা করুন। ১ বছর আগে আপনি কোথায় ছিলেন, আজকে কোথায় আছেন, ১ বছর পর কোথায় থাকতে চান। আপনার মাপকাঠি আপনি নিজেই।

ভীড়ের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরা অনেক কঠিন একটা কাজ। তার থেকেও কঠিন কাজ হল নিজের আশেপাশে ভিড় তৈরি করা। আমি দ্বিতীয় কঠিন কাজটি বেছে নিয়েছি। আপনাকে প্রথমেই ঠিক করে নিতে হবে আপনি কোনটা করবেন। এবং যেটা করবেন সেটাতেই অনড় থাকবেন। বিভ্রান্ত হবেন না। আপনার মানসিক দৃঢ়তার ওপর আপনার স্বপ্ন টিকে আছে। অতএব, সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করবেন নিজেকে।

সব শেষ যেটা বলব, অন্যের উপকার করেন। অন্যের স্বপ্নকে সম্মান করেন। আপনার প্রাপ্য টা আপনি পাবেনই। অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় করতে চাইলে মানুষের মনে জায়গা পাবেন না। ব্যবসায় সফল হওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল আপনার ব্যাক্তিত্ব, প্রোডাক্ট, সার্ভিস দিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়া। যারা যারা স্বপ্ন দেখেন তাদের জন্য শুভকামনা রইল।”

সানজিদার জন্য লেখকের পক্ষ থেকেও অনেক দোয়া ও শুভকামনা রইল। সানজিদার প্রতিষ্ঠান “ক্রাফটি বায়োস্কোপ” এর ফেইসবুক পেইজ এর লিংক নিচে দেওয়া হল। সবাইকে পেইজে ঘুরে আসার জন্য লেখকের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হল।

https://www.facebook.com/craftybioscope/

– Written by,

Faraz-Al-Mahamood Chy.

Content Writing Department, YSSE.



Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর