ফিরোজ মাহবুব কামাল
বিলুপ্ত কুর’আনী দর্শন এবং অর্জিত পরাজয়
নানা ব্যক্তির মাঝে ধর্ম, কর্ম, চরিত্র, আচরণ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে বিবিধ ভিন্নতা সেটি তাদের হাত-পা, মগজ, হৃৎপিন্ড ও ফুসফুসের ন্যায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভিন্নতার কারণে নয়। সেটির তাদের দর্শনের ভিন্নতার কারণে। দর্শন পাল্টে গেলে মানুষও পাল্টে যায়। মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তাই দর্শন। উদাহরণটি অন্য ভাবেও দেয়া যায়। একই কোম্পানীর একই হার্ড ডিস্কের কম্পিউটার নানারূপ কাজ করে সফ্টওয়ারের ভিন্নতার কারণে। তাই কম্পিউটারের গুণাগুণ পাল্টে যায় সফটওয়ারের গুণে। পবিত্র কুর’আনে সে সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে সুরা বনি ইসরাইলের ৮৪ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “বল (হে মুহম্মদ), প্রতিটি মানব কাজ করে তার চেতনা বা দর্শনের ধরণ (শাকেলা বা মডেল) অনুযায়ী; এবং আপনার রব জানেন কে পথচলার ক্ষেত্রে সত্যপথ প্রাপ্ত।” এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালার হিকমত হলো, তিনি মানব জীবনের গুণগত পরিবর্তন আনতে বিপ্লব আনেন দর্শনের ভূবনে, সম্পদে বা জলবায়ুতে বিপ্লব এনে নয়। তিনি সে কাজটি করেন কিতাব নাযিল করে। এক্ষেত্রে তাঁর সর্বশেষ কিতাব হলো পবিত্র কুর’আন। এটিই হলো সমগ্র মানব জাতির জন্য তার সর্বশ্রেষ্ঠ দান। পৌত্তলিক আরবদের মাঝে বিশ্বাস, চরিত্র, আচরণ ও কর্মে যে আমূল বিপ্লব এসেছিল তার মূলে ছিল এই কুর’আন। সে বিপ্লবের বলেই আরবগণ জন্ম দেয় মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার।
যে কোন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিপ্লব আনতে দর্শন পাওয়ার হাউসের কাজ করে। অপরদিকে শক্তিহীনতা ও পরাজয় আসে দর্শনের বিলুপ্তিতে। মুসলিমদের আজকের শক্তিহীনতা ও পরাজয় নিতান্তই তাদের নিজেদের কামাই। কারণ, তারা পবিত্র কুর’আন থেকে দূরে সরেছে। ফলে তাদের মাঝে বিলুপ্ত হয়েছে দর্শনের বল। বিপুল জনশক্তি, তেল-গ্যাস ও অর্থসম্পদ দিয়ে সে শক্তিহীনতা ও পরাজয় এড়ানো যাচ্ছে না। বাংলা যখন ইংরেজদের হাতে অধিকৃত হয় তখন দেশটি ইংল্যান্ডের চেয়ে সম্পদশালী ছিল। বৃহৎ ছিল জনসংখ্যাতেও। বাংলার মসলিন ও মখমলের ন্যায় বস্ত্র সম্পদের বিশ্বজুড়া বাজার ছিল। প্রাচুর্য্য ছিল কৃষি সম্পদে। বাংলার তটে নির্মিত নৌ-জাহাজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি হতো। কিন্তু ছিল না দর্শনের বল। ফলে বিদেশী হানাদারদের প্রতিরোধে জনগণেরও যে দায়-দায়িত্ব থাকে -সে হুশটি জনগণের মাঝে ছিল না। ফলে পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর পুরা দেশ কবজায় নিতে শত্রুদের জনগণের পক্ষ থেকে কোনরূপ প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি। অথচ কুর’আনের দর্শনের বল থাকলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঘরে ঘরে যুদ্ধ শুরু হতো –যেমনটি হয়েছে আফগানিস্তানে। আফগানিস্তানের জনসংখ্যা বাঙালী মুসলিমের সিকি ভাগেরও কম। কিন্তু তারা ব্রিটিশ, সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় তিনটি বিশ্ব শক্তিকে পরাজিত করেছে। কারণ তাদের কুর’আনী দর্শন শত্রুর হামলার মুখে জিহাদের জন্ম দিয়েছে।
দর্শন পাল্টে গেলে রাজনীতিও যে কীরূপ পাল্টে যায় তারও উদাহরণ হলো বাঙালী মুসলিমগণ। বাঙালী মুসলিমদের ১৯৪৭’য়ের দর্শন ও ১৯৭১’য়ের দর্শন এক ছিল না। ফলে উভয় ক্ষেত্রে তাদের রাজনীতিও এক ছিল না। ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিমের চেতনায় জোয়ার এসেছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের। ফলে প্রতিবেশী বাঙালী হিন্দুদের বদলে বাংলার বাইরের অসমীয়, বিহারী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান, গুজরাতী ইত্যাদি পরিচয়ের মুসলিমগণ তাদের কাছে আপন মনে হয়। তখন তাদের সাথে নিয়ে হিন্দু ও ইংরেজদের প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও তারা অখণ্ড পাকিস্তানের জন্ম দেয়। অপরদিকে ১৯৭১’য়ে আসে ভাষাভিত্তিক সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের প্রবল জোয়ার। সে জোয়ারে শত্রু-মিত্রের সংজ্ঞাই পাল্টে যায়। নিজেদের মুসলিম পরিচয়টি তখন গুরুত্ব হারায়। বাঙালী মুসলিমদের কাছে তখন অবাঙালী মুসলিমগণ হত্যাযোগ্য শত্রু গণ্য হয়। সে চেতনায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা প্রায় ৪ লাখ বিহারীর প্রত্যেককে তার গৃহ, ব্যবসা, চাকুরীতে থেকে বিতাড়িত করা, হাজার হাজার বিহারীকে হত্যা করা এবং শত শত বিহারী মেয়েদের ধর্ষণ করা তখন বীরত্ব ও দেশপ্রম গণ্য হয়। পরম বন্ধু রূপে গণ্য হয় ভারতের হিন্দুত্ববাদী হিন্দুগণ। দেশপ্রেম গণ্য হয়, ভারতীয়দের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে অবাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং যুদ্ধ শেষে দেশের সীমান্ত, বাজার, বন্দর, করিডোর সবকিছুই ভারতীয়দের জন্য খুলে দেয়া। ভারতের পররাষ্ট্র নীতিই পরিণত হয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি। এবং ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নীতিতে সহনীয় গণ্য হয় ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর পানি তুলে নেয়া, সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা এবং ভারতে মুসলিম নিধন ও মসজিদ ধ্বংস।
দেশ বাঁচানোর ন্যায় মহৎ ও পবিত্র কর্মটি কখনোই যারা বাঁচার জন্য বাঁচে এরূপ স্বার্থপর অর্থনৈতিক ও সেক্যুলার জীবদের দ্বারা হয় না। সেজন্য চাই আদর্শিক পুষ্টি। চাই দর্শনের বল। মুসলিমদের জন্য সে শক্তিটি জোগায় কুর’আনী দর্শন। ইসলাম এ কর্মকে রাজনীতির পেশা নয়, বরং সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত তথা জিহাদের মর্যাদা দিয়েছে। যারা সে জিহাদে নিহত হয় তারা পায় শহীদের মর্যাদা। তারা প্রবেশ করে বিনা হিসাবে জান্নাতে। মুসলিমগণ যখন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল এবং উত্থিত হয়েছিল সবচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বশক্তি রূপে -তখন না ছিল তাদের কোন অর্থনৈতিক শক্তি। না ছিল কোন জনশক্তি। এবং ছিল না কোন উন্নত অস্ত্রশস্ত্র। কিন্তু তাদের হাতে যা ছিল সেটিই হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তির ভাণ্ডার। সেটি হলো কুর’আনী দর্শন। সেটি এসেছিল মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক শক্তি বা জনশক্তি কি মহান আল্লাহতায়ালার এ দানের সমকক্ষ হতে পারে?
মহান আল্লাহতায়ালা বিস্ময়কর শক্তির ভাণ্ডার রেখেছেন ক্ষুদ্রতর পরমানুর মধ্যে। এবং তার চেয়েও বিস্ময়কর শক্তি রেখেছেন মানব মনের গভীরে। ব্যক্তির সে সামর্থ্যটিই হলো, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যক্তির কাছে গচ্ছিত সর্বশ্রেষ্ঠ আমানত। সে আমানতের বিস্ফোরণ ঘটে কুর’আনী দর্শনে। মানুষ তখন ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্টতর হয়। সে কুর’আনী দর্শন হযরত উমর (রা:) উদ্বুদ্ধ করেছিল তাঁর চাকরকে উটের পিঠে চড়িয়ে লাগামের রশি টানতে। অথচ তিনি ছিলেন বাংলাদেশের চেয়ে ৫০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের খলিফা। মদিনা থেকে জেরুজালেমের পথে ৭০০ মাইলের পথ পাড়ি দিয়েছেন মাত্র একটি উট এবং একজন চাকর নিয়ে। অথচ বাংলাদেশে একজন ইউনিয়নের চেয়্যার ম্যানও দলবল নিয়ে হাটে। মুসলিমগণ যতদিন সে দর্শনের সাথে সংযোগ রেখেছিল ততদিন তাদের শক্তি ও ইজ্জতে ধ্বস নামেনি। কিন্তু যখনই সে দর্শন থেকে দূরে সরেছে তখনই তাদের জীবনে দ্রুত পতন শুরু হয়েছে। ইঞ্জিন থেকে বগি পৃথক হলে সেটি গতিহীন হয়। মুসলিমগণও তেমনি গতি হারিয়েছে কুর’আনী দর্শনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায়। বরং মুসলিমগণ বাঁচছে সে দর্শনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে।
পবিত্র কুর’আন নিজে কোন দর্শনের গ্রন্থ নয়। এটি হলো হিদায়েতের গ্রন্থ। তবে হিদায়েতের জন্য জরুরী হলো মানবের মনের আঙ্গণে তথা দর্শনের অঙ্গনে মানুষকে আলোকিত করা। সে সাথে আন্দোলিত করাও। দর্শন ভাবতে শেখায়। জাগ্রত করে বিবেককে। শেখায় সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ও বিচিত্র ধ্যানধারণা নিয়ে গবেষণা করতে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানারূপ শাখা-প্রশাখার মাঝে এটিই হলো শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান। কেউ সফল চিকিৎস্যক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী বা ব্যবসায়ী না হলেও তার জীবন ব্যর্থ হয় না। কিন্তু পুরাপুরি ব্যর্থ হয় দর্শনের সামর্থ্য না থাকলে। সে সামর্থ্য না থাকলে অসম্ভব হয় জান্নাত পাওয়া। চিন্তাশূণ্য মানুষকে দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা কখনোই তাঁর পবিত্র জান্নাত পূর্ণ করবেন না। এমন চিন্তাশূণ্য মানুষকে তিনি পশুদের চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। দর্শনের সামর্থ্য বাড়াতে পবিত্র কুর’আনে মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাগিদ এসেছে বার বার। প্রশ্ন করা হয়েছে “আ’ফালা তাদাব্বারুন”, “আ’ফালা তা’ক্বুলুন”, “আ’ফালা তাফাক্বারুন” বলে। অর্থাৎ কেন তোমরা ধ্যানমগ্ন হও না? কেন তোমরা তোমাদের বুদ্ধিকে কাজে লাগাও না? কেন তোমরা ফিকর করো না? দর্শন থেকেই ব্যক্তি পায় জীবন ও জগত নিয়ে চিন্তা-ভাবনার সামর্থ্য। সেটি না থাকাটি হলো মনের দৃষ্টিহীনতা ও অন্ধত্ব। মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক রোগটি ক্যান্সার নয়। দেহের পঙ্গুত্ব বা চোখের অন্ধত্বও নয়। সেটি হলো মনের অন্ধত্ব। মনের অন্ধত্বের কারণে অসম্ভব নয় সত্যকে মিথ্যা থেকে এবং ন্যায়কে অন্যায় থেকে পৃথক করা। তখন বিলুপ্ত হয় সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার সামর্থ্য। সে অন্ধত্ব অসম্ভব করে মহান আল্লাহতায়ালার আয়াতগুলি চেনা। ফলে পথভ্রষ্ট হওয়াটি তখন অনিবার্য হয়ে উঠে। এরূপ অন্ধদের জন্য শাস্তিটি হলো, তারা আখেরাতেও পাবে অনন্ত কালের অন্ধত্ব। পবিত্র কোরআনে সে শাস্তির ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “এবং যারা অন্ধত্ব নিয়ে এ দুনিয়াতে বাঁচে, তারা আখেরাতেও হবে অন্ধ। বস্তুতঃ তারাই হলো সবচেয়ে পথভ্রষ্ট।”–( সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৭২)।
মানুষের ধর্মবিশ্বাস, সত্যপথ প্রাপ্তি, পথভ্রষ্টতা, কর্ম, চরিত্র, আচরন, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি হলো তার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও দর্শনের বহিঃপ্রকাশ। মানব সন্তানেরা শুধু দেহের কাঠামো নিয়েই বাঁচে না, বাঁচে চিন্তা-চেতনা ও দর্শনের বিশেষ কাঠামো বা মডেল নিয়েও। দেহের ন্যায় তাদের দর্শনেরও একটি ধরণ বা মডেল থাকে। ইংরেজীতে এটিকে বলা প্যারাডাইম। আরবী ভাষায় সেটিকে বলা হয় শাকেলা। শাকেলা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে শকল তথা অবয়ব বা চেহারা থেকে। শকল শব্দটি উর্দু এবং ফার্সি ভাষাতেও একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। দর্শনের সে মডেল বা ধরণই নির্ধারণ করে সে নেককর্ম করবে, না কুকর্ম করবে। সে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলবে, না শয়তানের পথে চলবে।
জুটেছে কি ফুরকান?
জীবন ও জগতকে ঈমানদার যেভাবে দেখে, কাফেরগণ সেভাবে দেখে না। একই ভাবে ভাবেও না। দেখা ও ভাবনার মধ্যে এরূপ পার্থক্যের মূল কারণ হলো জনে জনে গড়ে উঠা দর্শনের ভিন্নতা। দর্শন যেমন দেখতে শেখায়, তেমনি ভাবতেও শেখায়। ঈমানদারগণ সে ভিন্ন দর্শনটি পায় পবিত্র কুর’আন থেকে। কাফেরগণ সেটি পায় ভ্রান্ত ধ্যানধারণা থেকে। কুর’আন দেয় সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা রূপে চেনার সামর্থ্য। দেয়, কোনটি ন্যায় ও কোনটি অন্যায় -সেটি পৃথক করার সামর্থ্য। এটিই হলো পবিত্র কুর’আনের দর্শনের জ্ঞান। কোনটি জান্নাতের পথ আর কোনটি জাহান্নামের পথ –মানব জীবনে সে সঠিক উপলব্ধটিও ঈমানদার পায় কুর’আন-লব্ধ দর্শনের বল থেকে। মহান আল্লাহতায়ালা মু’মিনের সে বিশেষ সামর্থ্যকে সংজ্ঞায়ীত করেছেন “ফুরকান” বলে। সে সামর্থ্যটি কাফের বা মুনাফিকদের থাকে না। মু’মিন ব্যক্তির জীবনে সেটি জুটে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত রূপে। তবে মহান আল্লাহতায়ালার সে শ্রেষ্ঠ দানটি পাওয়ার জন্য স্রেফ ঈমানদার হওয়াই যথেষ্ট নয়। এজন্য চাই, কিছু বাড়তি যোগ্যতা। সেটি তাকওয়া তথা মনের গভীরে মহান আল্লাহতায়ালার ভয়। তাকওয়ার সে প্রস্তুতিটি নিতে ঈমানদারদের প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশটি হলো, “হে ঈমানদারগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তবে তোমাদের দেয়া হবে ফুরকান, এবং তোমাদের গুনাহকে আড়াল করা হবে এবং তোমারা পাবে মাগফিরাত; এবং (জেনে রাখো) আল্লাহই তো শ্রেষ্ঠ ফজিলত-দানকারি।” –(সুরা আনফাল, আয়াত ২৯)।
প্রশ্ন হলো, মুসলিমদের ঘরে ঘরে আজ কুর’আন, কিন্তু ক’জন পেয়েছে ফুরকান। এমন কি যারা নিজেদেরকে আলেম, আল্লামা ও মাওলানা রূপে জাহির করেছেন, তারাও কি পেয়েছেন সে ফুরকান? পেয়েছেন কি তারা ন্যায় ও অন্যায়, সত্য ও মিথ্যা, জালেম ও মজলুমের মাঝে পার্থক্য করার সামর্থ্য? অনেকের মাঝে সে সামর্থ্যটি যে শূণ্যের কোঠায় -সে প্রমাণ তো প্রচুর। সে পার্থক্যটি যারা বুঝে তারা কি কখনো অন্যায় ও জুলুমের পক্ষ নেয়? কোয়ালিশন গড়ে কি নৃশংস খুনির সাথে? সেটি তো বেঈমানীর প্রকাশ। মু’মিন ব্যক্তির ঈমানদারী হলো, মিথ্যা, অন্যায় ও জুলুমকে সে শুধু ঘৃণাই করবে না, বরং সে অপরাধ কর্মের নায়কদের বিরুদ্ধে বীবদর্পে দাঁড়াবে। পবিত্র কুর’আনের সুরা আল ইমরানে ১০৫ নম্বর আয়াতে সমগ্র মানব জাতির মাঝে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে। সেটি এই কারণে যে, জিহাদ করে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় এবং অন্যায়ের নির্মূলে। কিন্তু সে মিশন থেকে আজকের মুসলিমদের বিচ্যুতিটি বিশাল। এমন কি যারা নিজেদেরকে আলেম, আল্লামা, ইমাম ও কুর’আনের হাফেজ রূপে পরিচয় দেয় তাদের মাঝেও সে বিচ্যুতি প্রকট। উদাহরণ দেয়া যাক। সম্প্রতি ক্বাবার ইমাম হাফেজ সুদায়েসী জুম্মার খোতবা দিয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমানের পক্ষে সাফাই গেয়ে। তাকে তিনি মোজাদ্দেদের দরজা দিয়েছেন। অথচ সে যুবরাজের হুকুমে সে দেশের হাজার হাজার আলেম গ্রেফতার হয়েছেন, জেলের অভ্যন্তরে তারা নৃশংস ভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন এবং অনেকে নিহতও হয়েছেন। শুধু কি তাই? ২০১৩ সালে মিশরের নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট ডক্টর মুহম্মদ মুরসীর বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে স্বৈরাচারি জালেম শাসক জেনারেল আবুল ফাতাহ সিসিকে ক্ষমতায় বসানোর ক্ষেত্রে সৌদি সরকারের ষড়যন্ত্রটিও কি গোপন বিষয়? সম্প্রতি প্রখ্যাত সৌদি বুদ্ধিজীবী জামাল খাসোগীকে যে ভাবে হত্যা করা হলো এবং হত্যার পর এসিডে ডুবিয়ে তাঁর দেহ গলিয়ে গায়েব করা হলো -সে বর্বরতা কি কোন সভ্য মানুষ ভাবতে পারে? সে নৃশংস বর্বরতাকে ঘৃণা করার সামর্থ্য তো বহু নাস্তিকেরও থাকে। অথচ সে সামর্থ্য নেই পবিত্র ক্বাবার ইমামের! ইসলামের পবিত্র স্থানগুলি কাদের হাতে অধিকৃত –সেটি বুঝতে এরপরও কি কিছু বাঁকি থাকে? এমন ব্যক্তি হাফেজে কুর’আন হতে পারে, আলেম বা আল্লামা রূপেও নিজেকে দাবী করতে পারে, এমন কি পবিত্র ক্বাবার ইমামও হতে পারে –কিন্তু সে যে ফুরকান পায়নি তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে?
আলেম, আল্লামা ও মাওলানা নামধারিদের দ্বারা এরূপ ব্যর্থতা কি বাংলাদেশেও কম হচ্ছে? শাপলা চত্ত্বরের নৃশংস গণহত্যাটি কোন বিদেশী কাফের শক্তির হাতে হয়নি। ২০১৪ দেশ ভোট ডাকাতির নির্বাচনও মহল্লার চোর-ডাকাতদের হাতে হয়নি। সংবিধান থেকে মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার ঘোষণাটিও কোন কাফের বিলুপ্ত করেনি। এ সবই হয়েছে স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার হাতে। তারই হাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে গুম, খুন, মিথ্যা মামলা, বিনাবিচারে হত্যা ও ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যার রাজনীতি। হাসিনার ন্যায় সে নৃশংস খুনির সাথে যারা কোয়ালিশন করে ও তার সাথে হাত মেলায় -তারা যতই কুর’আন পাঠ করুক না কেন, ফুরকান যে পায়নি তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ থাকে? অথচ হিফাজতে ইসলামের আলেমগণ হাসিনার সাথে একই মঞ্চে বসে শুধু হাতই মেলায়নি, তাকে নির্বাচনে বিজয়ী করার জন্য ময়দানের নেমেছে। এ খুনিকে অনেকে কওমী (মাদ্রাসার) জননীও বলেছে। তারা ভূলে গেছে শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার কথা। অথচ ঈমানদার তো বাঁচবে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার জন্য, কোন স্বৈরাচারি জালেমকে খুশি করার জন্য নয়। কিন্তু সে নিয়েত তাদের জীবনে কই?
মুক্তি মেলেনি অধিকৃতি থেকে
মনের ভূবনটি যেমন জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার হাতে অধিকৃত ভূমি হতে পারে, তেমনি হতে পারে কুর’আনী জ্ঞানেরও। মনের ভূবনে উভয়ের শাসন কখনোই একত্রে চলে না। যেমন কোথাও একত্রে থাকে না আলো ও আঁধারে উপস্থিতি। তাই ব্যক্তির জীবনে ইসলামের শুরুটি হয় শয়তানের অধিকৃতি বিলুপ্ত করার মধ্য দিয়ে। তবে আধুনিক যুগের শয়তানেরা মুসলিমদের কাছে মুর্তিপূজার প্রসার বাড়াতে ধর্ণা দেয় না। বরং হাজির হয় জাতিপূজা, ভাষাপূজা দেশপূজা, নেতাপূজা, নেতার ছবি পূজা, দলপূজা, কবরপূজা এবং ফেরকাপূজার শিরক নিয়ে। হাজির হয় লিবারালিজম, সেক্যুলারিজম, ক্যাপিটালিজম ও ন্যাশনালিজমের জাহিলিয়াত নিয়ে। চেতনার ভূমিতে শয়তানের অধিকৃতি বাঁচিয়ে রেখে নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাতকে কখনোই যথার্থ ইবাদতে পরিণত করা যায় না। তাই মহা প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ক্বাবা থেকে মুর্তি সরানোর আগে গুরুত্ব পেয়েছে মক্কার মানুষদের মনের ভূবন থেকে শয়তানের অধিকৃতি বিলুপ্তি। ক্বাবার ভিতর থেকে মুর্তি সরানো হয়েছে প্রথম ওহী নাযিলের ২১ বছর পর। সেটি মক্কা বিজয়ের দিন। কিন্তু মনের ভূবন থেকে অন্ধকার সরানোর কাজ শুরু হয়েছে নবুয়তের প্রথম দিন থেকেই। মক্বী যুগে নবীজী (সা:)র সিংহ ভাগ সময় ব্যয় হয়েছে সে কাজে।
শয়তানের অধিকৃতি থেকে বাঁচতে ঈমানদারকে শুধু দেশের ভূগোল পাহারা দিলে চলে না। পাহারা দিতে হয় মনের ভূগোলকেও। মনের ভূগোল পাহারা দেয়ার কাজে মূল অস্ত্রটি হলো দর্শনের বল। তাই পবিত্র কুর’আন শুধু হারাম-হালালের বিধানই দেয় না, বরং বৃদ্ধি ঘটায় তাদাব্বুর, তাফাক্কুহ ও তাফাহ্হুমের সার্মথ্যে। সে সামর্থ্য বৃদ্ধির কারণেই যারা এক সময় ভেড়া চড়াতো তারাই দ্রুত পরিণত হয় মানব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বিচারক, শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ প্রশাসকে। মানবকে শিক্ষিত, পরিশুদ্ধ ও প্রজ্ঞাময় করার ক্ষেত্রে কুর’আনী দর্শন কীরূপ শক্তশালী ও বিপ্লবী –সেটিই সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল। সে আমলে আরবের অসভ্য, অশিক্ষিত ও পাপপূর্ণ মানুষকে পবিত্র করার জন্য নবীজী(সা:)র হাতে পবিত্র কুর’আন ছাড়া অন্য কোন হাতিয়ারই ছিল না। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল না। ১৩ বছরের মক্কী জীবনে নবীজী (সা:)র হাতে কোন মসজিদ, মাদ্রাসাও ছিল না। কিন্তু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদ-মাদ্রাসা না থাকলে কি হবে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব গড়ায় পবিত্র কুর’আন যে একাই যথেষ্ট – সেটিই প্রমাণিত হয়েছে মক্কী জীবনের উক্ত ১৩ বছরে। পবিত্র কুর’আনের বরকতে সেদিন গরীবের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহ পরিণত হয়েছিল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মাদ্রাসায়। যে মানবগুলো সেদিন মক্কার বুকে গড়ে উঠেছিল -তারাই হলো সমগ্র মানব ইতিহাসের সর্বশ্রষ্ঠ মানব। পৃথিবীর সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মিলেও কি সে মাপের চরিত্রবান একজন মানুষ সৃষ্টি করতে পেরেছে? এভাবেই সেদিন প্রকাশ পেয়েছিল পবিত্র কুর’আনের বিস্ময়কর সামর্থ্য। কুর’আনকে বাদ দিয়ে হাজার হাজার বই পড়িয়ে বা বহু লক্ষ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা নির্মান করে যে কাজ সম্ভব নয় -সেটিও অকাঠ্য ভাবে প্রমাণিত হয়েছে বিগত হাজার বছরে। বরং বাংলাদেশের মত দেশে যতই বাড়ছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, ততই বাড়ছে দুর্নীতি, খুন, গুম, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, ধর্ষণে সেঞ্চুরি, ভোট ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ার মার্কেট লুট এবং স্বৈরাচারের অসভ্যতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্ত উৎপাদনের ইন্ডাস্ট্রীতে।
সংকটটি চেতনার পরিশুদ্ধিতে
পবিত্র কুর’আন নাযিলের মূল এজেন্ডা কী এবং ঈমানদারগণ তা থেকে কীরূপে পেতে পারে কল্যাণ -নবীজী (সা:) সেদিন তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়েছিলেন। কুর’আন দেয় সিরাতুল মুস্তাকীমের সন্ধান। দেয় জাহিলিয়াত থেকে মুক্তি। দেয় চেতনার পরিশুদ্ধি। দেয় অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞা। গড়ে সুশিক্ষিত মানব। এটিই তো পবিত্র কুর’আনের মিশন। খোদ মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আন নাযিলের মূল এজেন্ডার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: “হুয়াল্লাযী বা’য়াছা ফিল উম্মিয়ীনা রাসূলাম মিনহুম ইয়াত্লু আলায়হীম আয়াতিহি ওয়া ইউযাক্কিহুম ওয়া ইউয়াল্লিমুহুমু কিতাবা ওয়াল হিকমাতা ওয়া ইন কানু মিন কাবলু লা ফি দালালীম মুবিন” –(সুরা জুমুয়াহ, আয়াত ২)। অর্থ: “তিনিই সেই (মহান আল্লাহ) যিনি নিরক্ষরদের মাঝে তাদেরই মধ্য থেকে উত্থিত করেছেন একজন রাসূলকে, যিনি তেলাওয়াত করে শুনান তাঁর আয়াতকে এবং (যা দিয়ে) তাদের (চেতনা, চরিত্র ও আমলের) মধ্যে আনেন পরিশুদ্ধি, এবং শিক্ষা দেন কিতাবের ও প্রজ্ঞার; অথচ এর আগে তারা ছিল সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে।” মুসলিমের আজকের ব্যর্থতার কারণ, মুসলিম দেশগুলিতে ঘরে ঘরে পবিত্র কুর’আনের ছড়াছড়ি থাকলেও “ইউযাক্কিহুম ওয়া ইউয়াল্লিমুহুমু কিতাবা ওয়াল হিকমাতা”র মিশনটি বিদায় নিয়েছে বহু আগেই। অর্থাৎ বিদায় নিয়েছে পবিত্র কুর’আন থেকে হিদায়েত, পরিশুদ্ধি, শিক্ষা ও প্রজ্ঞা লাভের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি।