সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৫ অপরাহ্ন

অর্থনীতির গতি বাড়াতে বছরে ২ বার ঘড়ির কাঁটা বদলায় যুক্তরাষ্ট্র

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩৯ সময় দেখুন
অর্থনীতির গতি বাড়াতে বছরে ২ বার ঘড়ির কাঁটা বদলায় যুক্তরাষ্ট্র


ডেলাইট সেভিংস যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সময়ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সন্ধ্যায় প্রাকৃতিক দিনের আলো বেশি সময় পাওয়া যায়। এতে মানুষ কর্ম জীবনের সমস্ত রুটিন পালটে যায়। অর্থনীতেতে যার রয়েছে ইতিবাচক প্রভাব।

শুধু নিউইয়র্কে নয় যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে এই পদ্ধতি চালু রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার, বিদ্যুতের চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের দৈনন্দিন কর্মঘণ্টার সঙ্গে সূর্যালোকের সময়ের সমন্বয় ঘটানো।

কীভাবে ঘড়ির সময় পরিবর্তন করা হয়?

ডেলাইট সেভিংস কার্যকর হলে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয়। আবার নির্ধারিত সময়ে এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, মার্চ মাসের দ্বিতীয় রোববার রাত ২টার সময় ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে ৩টা করা হয়। এরপর নভেম্বর মাসের প্রথম রোববার রাত ২টার সময় ঘড়ি এক ঘণ্টা পিছিয়ে ১টা করা হয়।

সহজ ভাষায়, বসন্তে ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে যায়, আর শরৎকালে আবার এক ঘণ্টা পিছিয়ে আসে।

নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ৮ মার্চ ডেলাইট সেভিংস শুরু হয়েছিল। গতকাল ১ নভেম্বর রোববার ২০২৬ তারিখে এটি শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে গতকাল রাত ২টার পরিবর্তে ঘড়ির সময় আবার ১টা হয়ে গেছে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অধিকাংশ ডিজিটাল ঘড়িতে সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়।

কত মাস থাকে?

প্রতি বছর মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় আট মাস ডেলাইট সেভিংস কার্যকর থাকে। নির্দিষ্ট হিসাবে এটি ২৩৮ দিন বা বছরের প্রায় ৬৫ শতাংশ সময়। অন্যদিকে নভেম্বর থেকে পরবর্তী মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আবার স্বাভাবিক সময় বা স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুসরণ করে। কখন এবং কেন শুরু হয়েছিল?

ডেলাইট সেভিংসের ধারণা যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চালু হয় ১৯১৮ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জ্বালানি সাশ্রয় এবং দিনের আলোর কার্যকর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দেশটি এ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯১৯ সালে কেন্দ্রীয়ভাবে এ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আবার বছরব্যাপী সময় এগিয়ে রাখার ব্যবস্থা চালু ছিল।

এরপর বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলে সময় পরিবর্তনের নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এ সমস্যা দূর করতে ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ইউনিফর্ম টাইম অ্যাক্ট (Uniform Time Act) পাস করে। এর মাধ্যমে ডেলাইট সেভিংসের সময় পরিবর্তনের জন্য একটি অভিন্ন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালের এনার্জি পলিসি অ্যাক্ট (Energy Policy Act)-এর মাধ্যমে সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। ২০০৭ সাল থেকে বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী মার্চের দ্বিতীয় রোববার শুরু এবং নভেম্বরের প্রথম রোববার শেষ করার ব্যবস্থা কার্যকর হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কতটি অঙ্গরাজ্যে চালু?

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৮টি অঙ্গরাজ্যে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ডেলাইট সেভিংস চালু রয়েছে। তবে দুটি অঙ্গরাজ্য এ ব্যবস্থা অনুসরণ করে না। নিউইয়র্কে ডেলাইট সেভিংস চালু রয়েছে। হাওয়াই ডেলাইট সেভিংস অনুসরণ করে না। অ্যারিজোনা নাভাহো নেশন এলাকার ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ এলাকায় এটি চালু নেই। এ ছাড়া পুয়ের্তো রিকো, গুয়াম, আমেরিকান সামোয়া, নর্দার্ন মারিয়ানা আইল্যান্ডস এবং ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসেও ডেলাইট সেভিংস পালন করা হয় না। অর্থাৎ এটি শুধু নিউইয়র্কের কোনো স্থানীয় ব্যবস্থা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঞ্চলে প্রচলিত একটি ফেডারেল আইন নির্ধারিত সময়ব্যবস্থা।

অর্থনীতিতে ডেলাইট সেভিংসের প্রভাব

ডেলাইট সেভিংসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো দিনের আলোর ব্যবহার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির দেশে এর কয়েকটি সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বৃদ্ধি: সন্ধ্যায় অতিরিক্ত এক ঘণ্টা দিনের আলো থাকায় মানুষ কর্মস্থল থেকে ফেরার পর কেনাকাটা, বাজার করা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ পায়। এতে শপিং মল, সুপারমার্কেট, রেস্টুরেন্ট ও খুচরা ব্যবসায় ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়তে পারে।

পর্যটন ও বিনোদন শিল্পের প্রসার: দিনের আলো বেশি সময় থাকায় মানুষ পার্ক, সমুদ্রসৈকত, পর্যটনকেন্দ্র ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক স্থানে বেশি সময় কাটাতে পারে। এতে পর্যটন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং পরিবহন খাত উপকৃত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

কর্মঘণ্টার কার্যকর ব্যবহার: অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে দিনের আলোর সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হয়। বিশেষ করে নির্মাণশিল্প, কৃষি এবং বাইরের পরিবেশে পরিচালিত বিভিন্ন কাজে দিনের আলো বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

বিদ্যুৎ ব্যবহারে সম্ভাব্য সাশ্রয়: সন্ধ্যায় সূর্যের আলো বেশি সময় পাওয়া গেলে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহার কমতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ খরচ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি: অফিসের কাজ শেষে মানুষ পরিবার নিয়ে বাইরে যাওয়া, কেনাকাটা, খেলাধুলা ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার বেশি সুযোগ পায়। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ভোগ ও ব্যয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেলাইট সেভিংসের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় বা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতভাবে বাড়ে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো সর্বসম্মত গবেষণা নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েও যেতে পারে।

কেন এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে?

ডেলাইট সেভিংসের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে। বছরে দুইবার ঘড়ির সময় পরিবর্তনের কারণে মানুষের ঘুম, দৈনন্দিন রুটিন এবং কর্মজীবনে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মার্চ মাসে এক ঘণ্টা সময় এগিয়ে দেওয়ার পর অনেকের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন ঘটে।

এ ছাড়া সমালোচকদের প্রশ্ন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য ঘড়ির সময় পরিবর্তন কতটা যৌক্তিক? অনেকেই মনে করেন, বছরে দুইবার সময় পরিবর্তনের পরিবর্তে স্থায়ীভাবে একটি সময়ব্যবস্থা চালু করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এ নিয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগও দেখা গেছে। তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো অঙ্গরাজ্য নিজে থেকে স্থায়ী ডেলাইট সেভিংস চালু করতে পারে না; এ জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।

ডেলাইট সেভিংস কেবল ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং মানুষের জীবনযাত্রা। শতাধিক বছরের ইতিহাসে এই সময়ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্য এখনো এটি অনুসরণ করছে। বিশেষ করে দিনের আলোকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তা এখনো এর পক্ষে অন্যতম প্রধান যুক্তি।





Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর