শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১০:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
‘Can’t believe it’: Ex-England captain stunned by Vaibhav Sooryavanshi snub | Cricket News মসজিদে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে জামায়াতের সভা Khushbu Sundar Gets Emotional As Daughter Avantika Marries Shravan Sreenivasan: ‘Eyes Are Still Moist’ | Tamil Cinema News ১০৪ দিনে হাম ও হামের উপসর্গে ৭০২ শিশুর মৃত্যু ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫ Ecuador vs Germany FIFA World Cup 2026 Match highlights: Ecuador 2-1 Germany; Resilient Ecuador stun sluggish Germany to close in on Round of 32 একই পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গোলাম পরওয়ারের শোক সিএমপির কোতোয়ালী থানার বিশেষ অভিযানে ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইকৃত ১৫৭টি মোবাইল ফোন, ০৫টি ল্যাপটপ, নগদ টাকা, আইএমইআই (IMEI) পরিবর্তনের মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি উদ্ধারসহ সংঘবদ্ধ চক্রের ০৫ সদস্য গ্রেফতার Samantha Ruth Prabhu Takes A Dig At Sobhita Dhulipala?; Ashok Pathak Recalls Meeting PM Modi | Bollywood News এবার আসছে মেটার ‘AI পেনডেন্ট’!

বাঙালী মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: রবিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ২৭৮ সময় দেখুন

ফিরোজ মাহবুব কামাল

রোগ ভাবনাশূণ্যতার‌                                                                                      

চিন্তা-ভাবনা একমাত্র জীবিত মানুষের গুণ, মৃতের নয়। মানুষ বাঁচে, বেড়ে উঠে এবং নিজের জীবনে পরিশুদ্ধি আনে চিন্তা-ভাবনার গুণে। নিজেক নিয়ে ও অন্যদের নিয়ে ভাবনা বন্ধ হলে শুধু পতনই শুরু হয় না,  মরণও শুরু হয়। মানব জীবনে চিন্তাভাবনার গুরুত্ব যে কতটা গভীর -সেটি বুঝা যায় মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার নিন্মুক্ত কয়েকটি প্রশ্নের দিকে নজর দিল। পবিত্র কুর’আনে তিনি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবকে লক্ষ্য করে সরাসরি কয়েকটি প্রশ্ন রেখেছেন: এক). “তোমরা কেন ভাব না (আ’ফালা তাফাক্কারুন)?” দুই). “তোমরা কেন নিজেদের আক্বলকে কাজে লাগাও না (আ’ফালা তা’ক্বিলুন)?” তিন). “তোমরা কেন মনকে গভীর ভাবে নিবিষ্ট করো না (আ’ফালা তাদাব্বারুন)?” মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রশ্নগুলোর মূল লক্ষ্য হলো, মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে নাড়া দেয়া এবং চিন্তা-ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠতে উৎসাহ দেয়া।

চেতনাই মানব জীবনের ইঞ্জিন। কর্ম, চরিত্র, বিশ্বাস ও আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয় চেতনার ভূমি থেকে। তাই মানবকে জাগাতে হলে তার ইঞ্জিনকে তথা চেতনাকে চালু করতে হয়। মহান আল্লাহতায়ালার উপরুক্ত প্রশ্নগুলির মূল লক্ষ্য তো সেটিই। মহাজ্ঞানী মহান প্রভু চান, মানুষ তার নিজেকে নিয়ে ভাবুক। ভাবুক, কিসে তার পার্থিব ও আখেরাতের জীবনের কল্যাণ –জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে। ভাবুক, কিসে জাহান্নামে আগুন থেকে পরিত্রাণ -তা নিয়ে। কল্যাণের পথ তো সেই পায় যে ব্যক্তি সে কল্যাণের পথটি পেতে চিন্তা-ভাবনা করে। এরূপ কল্যাণ চিন্তা ভাবনাশূণ্য মানুষের জীবনে কখনোই আসে না। ভাবনাশূণ্য মানুষেরাই জীবনে লক্ষ্যশূণ্য ও কর্মশূণ্য হয়। এমন ভাবনাশূণ্য মানুষেরদের বিভ্রান্ত করা সহজ। তাদের চেতনার ভাবনাশূণ্য স্থানটি শয়তান সহজেই দখলে নেয়; এরাই সহজে শয়তানের ফাঁদে পড়ে এবং জাহান্নামের পথে চলে। সে ভাবনা শূণ্য ভয়ানক অবস্থা থেকে বাঁচাতে চিন্তা করাকেও মহান আল্লাহতায়ালা ফরজ করেছেন। চিন্তাভাবনা তথা বুদ্ধিবৃত্তি তাই কোন পেশাজীবীর পেশা বা নেশা নয়। প্রতিটি ঈমানদারের জন্য এটি বাধ্যতামূলক। ইসলামে এটি ফরজ ইবাদত।

নবীজী (সা:) বলেছেন: আফজালুল ইবাদাহ তাফাক্কুহ। অর্থ: উত্তম ইবাদত হলো চিন্তা ভাবনা করা। হযরত আলী (রা:) বলেছেন: ইবাদত ওজনহীন তথা মূল্যহীন হয় যদি তা ভাবনাশূণ্য হয়। ঈমানদারের ভাবনাই হলো তাঁর ধ্যানমগ্নতা। তাই নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও নেক আমলে ওজন বাড়াতে হলে তাতে গভীর ভাবনার তথা ধ্যানের সংযোগ ঘটাতে হয়। আর মহান আল্লাহতায়ালা তো আমলের ওজন দেখেন, সংখ্যা নয় –সেটিও তিনি বার বার উল্লেখ করেছেন পবিত্র কুর’আনে। সাধু-সন্যাসীগণ বন-জঙ্গলে গিয়ে ধ্যানে বসে, আর মু’মিন ব্যক্তি ধ্যান করে চলতে-ফিরতে, উঠা-বসায়, কর্ম ও অবসরে, শয়নে এবং পথচলার প্রতি কদমে। ঈমানদারের সে গুণটিই মহান আল্লাহতায়ালা বর্ণনা করেছেন সুরা আল ইমরানের ১৯১ নম্বর আয়াতে। পবিত্র কুর’আনের কৃতিত্ব তো এখানেই, এ গ্রন্থ্যটি আরবের বিপুল সংখ্যক মানুষকে জগত-বিখ্যাত দার্শনিকে পরিণত করেছে। দুনিয়ার আর কোন দেশে এবং আর কোন যুগে এত দার্শনিক গড়ে উঠেনি। এবং সেটি সম্ভব হয়েছে, পবিত্র কুর’আনে ছত্রে ছত্রে চিন্তা-ভাবনার উপর তাগিদ দেয়ার কারণে।

অথচ আজ মুসলিমগণ চিন্তাশূণ্যতায় রেকর্ড গড়েছে। যারা চিন্তাশূণ্যতায় রেকর্ড গড়ে তারা যে নীতি-নৈতিকতার স্কেলে দ্রুত নীচে নামাতেও রেকর্ড গড়বে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ সবার আগে। ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের পরিসংখ্যান মতে এ শতাব্দীর শুরুতে যে দেশটি বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশকে হারিয়ে পর পর দুর্নীতিতে ৫ বার প্রথম হওয়ার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে -সেটি কোন অমুসলিম দেশ নয়। সেটি হলো শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশ বাংলাদেশ। একটি ভাবনাশূণ্য জনগণই এতোটা দ্রুত নীচে নামতে পারে। কারণ, চিন্তাশূণ্যতার বিলুপ্ত হয় অন্যদের মাঝে ইজ্জত হারানোর শরম। পাগলের সে ভাবনা থাকে না বলেই তারা জনসম্মুখে উলঙ্গ হয়। এমন একটি ভাবনা শূণ্য দেশের সরকার দিনের ভোট রাতে ডাকাতি করে নিতে পারে। মানব জাতির ইতিহাসে কোথাও কি এমন রেকর্ড নির্মিত হয়েছে? বিশ্বের কোন দেশে কি ডাকাতকে মাননীয় বলার রীতি আছে? প্রতিটি সভ্যদেশে ডাকাতকে তো কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু কি বিস্ময়! বাংলাদেশে হয় উল্টোটি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের ডাকাত-সর্দারনীকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়ে তাকে মাননীয় বলা হয়।  এবং যারা এরূপ দুর্বৃত্তকে সন্মান করে তারা সবাই অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত মানুষ নয়। তাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, সেনাবাহিনীর জেনারেল, আদালতের বিচারক, প্রশাসনের সচিব, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া কর্মী এবং ডিগ্রিধারী পেশাজীবী। সংখ্যায় এরা লক্ষ লক্ষ। বাঙালী মুসলিমের চেতনার ইঞ্জিন যে কতটা অচল -সেটি বুঝতে কি এর পরও কিছু বাঁকি থাকে? অথচ পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে উত্থাপিত উপরুক্ত প্রশ্নগুলো বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ বার বার পড়ে। কিন্তু তার আছড় কই? পশুপাখি ও গাছপালাকে উদ্দেশ্য করে এ প্রশ্নগুলো করা হলে নিশ্চয়ই তার আছড় হতো না। কারণ চিন্তা-ভাবনার সামর্থ্য পশুপাখি ও গাছপালাকে দেয়া হয়নি। কিন্তু মুসলিমদের বিশেষ করে বাঙালী মুসলিমদের অবস্থা কি পশুপাখি ও গাছপালা থেকে ভিন্নতর? মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রশ্নাগুলিকে মুসলিমগণ যতটা মুখস্থ্য করেছে -তা নিয়ে ততটা চিন্তা করেনি। সেগুলোকে আমলেও নেয়নি। আমলে নিলে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব আসতো। কিন্তু সে বিপ্লব আসেনি। ফলে ১৭ কোটি মুসলিমের দেশে বহু লক্ষ হাফেজ ও ক্বারী সৃষ্টি হলেও ফকিহ, মোজতাহিদ বা চিন্তাবিদ গড়ে উঠেনি। লেখা হয়নি বাংলাতে কোন তাফসিরে কুর’আন বা ইসলামের উপর মৌলিক বই। দেশটির দ্বীনী মাদ্রাসায় যে তাফসির গ্রন্থ্যগুলো পড়ানো হয় তার অধিকাংশই উর্দু বা আরবী ভাষা থেকে অনুদিত। দর্শন, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেই বা ক’খানী বই লেখা হয়েছে? এগুলো হলো বাঙালী মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার বড় দলিল।

তবে বাঙালী মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক এ পশ্চাৎপদতা আজকের নয়, বহু শত বছরের। বাংলাদেশে ইসলামের প্রবেশ বঙ্গবিজয়েরও বহু পূর্বে। মুসলিমদের হাতে বঙ্গবিজয় হয়েছে প্রায় আটশত বছর আগে। এ দীর্ঘ সময়ে জাতির চিন্তা-চেতনায় বিপ্লব আসতে পারতো। সৃষ্টি হতে পারতো বহু লক্ষ বইয়ের বিশাল ভূবন। যেমন হয়েছে আরবী, ফার্সী ও উর্দুতে। ইসলামের আগমনের মাত্র একশত বছরের মধ্যেই আরবে ও ইরানে বিস্ময়কর বিপ্লব এসেছিল বুদ্ধিবৃত্তিতে। অথচ সে আমলে তাদের সমুদয় লোকসংখ্যা আজকের ঢাকা শহরের চেয়ে বেশী ছিল না। এমনকি আফগানরাও ছিল সংখ্যায় অতি নগন্য। অথচ একমাত্র সুলতান মাহমুদের সাম্রাজ্যে যতজন বিজ্ঞানীর বসবাস ঘটেছিল, আমরা বিগত এক হাজার বছরেও ততজন বিজ্ঞানী গড়তে পারিনি। উল্লেখ্য হলো, ইবনে সীনা, ইবনে ফারাবী, আল বেরুনীসহ সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী সুলতান মাহমুদের সাম্রাজ্যে বসবাস করতো।

ইসলাম আক্বল তথা বুদ্ধিবৃত্তির ধর্ম। কুর’আনের প্রতিটি আয়াত ব্যক্তিকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এক মহুর্তের চিন্তা-ভাবনাকে নবীজী (সা:) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। চিন্তাভাবনার অভাবে নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলি নিছক চিন্তাশূণ্য আনুষ্ঠিকতায় পরিণত হয়েছে। অথচ যার মধ্যে চিন্তাভাবনা নাই, তার মধ্যে আল্লাহভীতিও নেই। মহান আল্লাহতায়ালার ভয় তো আসে পরকালের ভয় থেকে। সেটি আসে আখেরাতে নিজের পরিণতি নিয়ে ভয়ের কারণে। আর ভয় তো সৃষ্টি হয় জ্ঞানের কারণে। এই জ্ঞানশূণ্য ও ভয়শূণ্যদের বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন: “এদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে এরা দেখে না। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শুনে না। তাদের ক্বালব আছে বটে কিন্তু তা দিয়ে তারা ভাবে না।” ভাবনার সামর্থ্য তো তারাই পায় যারা তাদের চোখ, কান ও ক্বালবের দোয়ারকে সব সময় খোলা রাখে। এবং বিশ্বচরাচরে মহান আল্লাহতায়ালার যে আয়াত বা নিদর্শনগুলো ছড়িয়ে ছিটেয়ে আছে -সেগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। এই হলো ঈমানদারের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ঠ -যা বর্ণিত হয়েছে সুরা আল-ইমরানের ১৯০ নম্বর আয়াতে।

অজ্ঞতা অসম্ভব করে মুসলিম হওয়া

বুদ্ধিবৃত্তির গুরুত্ব যে কত গুরুত্বপূর্ণ -সেটি বুঝা যায় পবিত্র কুর’আন পাকে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার একটি বয়ান থেকে। সে ঘোষণাটি হলো, ‘‘ইন্নামা ইয়াখ’শাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা।’’ অর্থ: সমগ্র সৃষ্টিকূলের মাঝে একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। এখানে জ্ঞানী বলতে তাদের বুঝায় যারা পবিত্র কুর’আনের জ্ঞানে জ্ঞানী। এর অর্থ দাড়ায়: পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান ছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি ভয় সৃষ্টি হয়না। উপরুক্ত আয়াতে যে সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে তা হলো: প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য অপরিহার্য হলো হৃদয়ে সব সময় মহা আল্লাহতায়ালার ভয় নিয়ে বাঁচা। এবং সে ভয় সৃষ্টি করে পবিত্র কুর’আন। ঈমানের খাদ্য হলো কুর’আনের জ্ঞান হলো। ঈমান বাঁচাতে এ খাদ্যের বিকল্প নাই। উপরুক্ত আয়াতে এ কথাও সুস্পষ্ট করা হয়েছে: ঈমান ও মহান আল্লাহতায়ালার ভয় কখনোই অজ্ঞতার উপর গড়ে উঠে না। বীজ রোপন করতে হলে প্রথমে আগাছা সরাতে হয়। তেমনি ঈমানের বীজ রোপনে চেতনার ভূমি থেকে প্রথমে অজ্ঞতা সরাতে হয়। নামায-রোযা পালন করেও অনেকে ঘুষ খায়, সূদ খায় এবং মিথ্যা কথা বলে। বেপর্দাও হয়। এর কারণ, নামায-রোযা ব্যর্থ হয়েছে তাকওয়া তথা আল্লাহতায়ালাতে ভয় সৃষ্টিতে। অভাব এখানে পবিত্র কুর’আনের জ্ঞানে।

যে ব্যক্তি তার জ্ঞানচক্ষুতে সামনে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে পায়, সে ব্যক্তি প্রতিটি মহুর্ত বাঁচে আখেরাতের ভয় নিয়ে। এমন ব্যক্তি অফিসে বসে কখনোই ঘুষ খায়না। দোকানে বসে এমন ব্যক্তি কখনোই ক্রেতাকে ঠকায় না। সে পাপাচারে অনন্ত অসীম আখেরাতকে নষ্ট করতে ভয় পায়। শিশু আগুনে হাত দেয় আগুনের দাহ্য ক্ষমতা না জানার কারণে। নামাজীও তেমনি ঘুষ খায় বা মিথ্যা কথা বলে হৃদয়ে পরকালের জ্ঞান বদ্ধমূল না হওয়াতে। অজ্ঞতা নিয়েও নামাযী ও রোযাদার হওয়া যায়। বার বার হজ্জ-উমরাহও করা যায়। কিন্তু পরিপক্ক ঈমানদার ও আল্লাহভীরু হওয়া যায় না। সে সাক্ষ্যটি অন্য কারো নয় বরং সেটি মহাজ্ঞানী ও মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার।

অজ্ঞতার ইসলামী পরিভাষা হলো জাহিলিয়াত, যার মধ্যে এটি বিদ্যমান তাকে বলা হয় জাহেল। আর এর বিপরীত শব্দ হলো মা’রেফাত। যিনি এর অধিকারী তিনিই আরেফ। মৃত্যুর এপারে বসে ওপারে কি হবে -তা উপলব্ধি করার সামর্থ্যই হলো মা’রেফাত। এ সামর্থ্যটি চোখের নয়, অন্তরের। সে দৃষ্টি একমাত্র কুর’আন-লব্ধ জ্ঞানেই সৃষ্ঠি হয়। এমন জ্ঞানই মানুষকে পাপাচারের থেকে দূরে রাখে। অপর দিকে জাহেল শুধু নাস্তিকেরা নয়, বহু আস্তিকও। যুগে যুগে ইসলামের সর্বনাশ হয়েছে মুসলিম বেশধারী এসব জাহিল আস্তিকদের কারণে। ইবাদতের নামে এসব অজ্ঞরা স্বাস্থ্যপতন ঘটালেও তাদের মনে মহান আল্লাহতায়ালার ভয়ের চেয়ে এজিদদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের ভয়ই অধিক ছিল। সে যুগে এজিদের বাহিনীতে যারা যুদ্ধে খেটেছে তারা কেউ স্বঘোষিত কাফের ছিল না। অথচ এদের হাতে জান্নাতের এই যুব-ইমাম হযরত ইমাম হোসেন (রা:) শুধু নিহতই হননি; তার লাশকে ঘোড়ার পায়ের নীচে দলিত-মথিতও করা হয়েছে। যার মধ্যে আখেরাতের ভয় আছে সে কি এরূপ বীভৎস নৃশংসতায় লিপ্ত হতে পারে? আজও মুসলিম দেশগুলিতে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনকে বিলুপ্ত করে রেখেছে তারা কি পৌত্তলিক কাফের? এরা তো তারাই যারা নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং হজ্জ-ওমরাহ করে। অতীতে হযরত ইমাম হোসেন (রা:)কে যারা হত্যা করেছিল তারাই এখন শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখছে।

বিপদের আরো কারণ, কুর’আনের জ্ঞানে অজ্ঞ বা জাহেল থাকাকে মুসলিম জনগণ আজ আর পাপ ভাবে না। অজ্ঞ থাকাটাই যে ইসলামে সবচেয়ে বড় পাপ –সে হুশও তাদের নাই। মহল্লায় পতিতাপল্লী, সূদী ব্যাংক, জুয়ার আখড়া ও মদের দোকান নিয়ে যেমন বাঁচছে, তেমনি বাঁচছে চেতনা রাজ্যে অজ্ঞতার অন্ধকার নিয়ে। সব পাপের জন্ম তো এই অজ্ঞতা থেকেই। অজ্ঞতার ন্যায় এই কবিরা গুনাহ রুখতেই ইসলাম সকল নরনারীর উপর জ্ঞানার্জনকে নামায-রোযার আগে ফরজ করা হয়েছে। কুর’আনের প্রথম নির্দেশটি নামায-রোযা বা তাসবিহ-তাহলিল না হয়ে “ইকারা” বা “পড়” হওয়ার তাৎপর্য তো এটিই। “ইকরা” বা “পাঠ করা” হলো জ্ঞানার্জনের চাবী। এ চাবী ছাড়া  জ্ঞানার্জনে সামনে এগোনো অসম্ভব। কুর’আন-হাদীসের জ্ঞান নয়, নিছক অক্ষর-জ্ঞান দানের বিনিময়ে নবীজী (সা:) বদরযুদ্ধের হত্যাযোগ্য বন্দীদের মুক্তি দিয়েছিলেন। এ থেকে বুঝা যায়, ইসলামে জ্ঞানদান ও জ্ঞানলাভের গুরুত্ব কত অধিক। জ্ঞানার্জনকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই সেকালে মুসলিমগণ স্বল্পসময়ে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিলেন। অথচ আজকের মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে অজ্ঞতায়। পাশ্চাত্যের দেশগুলি যেখানে অন্ধ, বধির ও বোবাদের জন্যও জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা করেছে, বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে এখনো প্রায় ৩০ ভাগ সুস্থ্য মানুষ নিরক্ষর। যারা অক্ষর জ্ঞান পেয়েছে তারাই বা কতটা সুশিক্ষিত? তথাকথিত এই শিক্ষিত ব্যক্তিগণই তো বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে সমগ্র বিশ্বে প্রথম করেছে।

সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায় এবং শ্লিল-অশ্লিল চিনতে জরুরি হলো ব্যক্তির চিন্তার সামর্থ্য। কারণ তা নিয়ে বিচার বসে ব্যক্তির চেতনার ভূবনে। বিবেকবান মানুষ হওয়ার পথে সে চিন্তার সামর্থ্যটাই মূল। চিন্তার সামর্থ্য একমাত্র চিন্তাতেই বৃদ্ধি পায়। চিন্তার অনভ্যাসে সুস্থ্য মানুষও আহম্মকে পরিণত হয়। তখন পঙ্গুত্ব আসে বুদ্ধিবৃত্তিতে। যেমন দীর্ঘকাল ব্যবহার না করায় রোগীর সুস্থ্য হাত-পা-গুলোও শক্তিহীন হয়। অথচ নিয়মিত ব্যবহারে তা শুধু সুস্থ্যই থাকে না, সবলও হয়। নবীজী (সা:)’র আগমনের কয়েক দশকের মধ্যে আরব ভূমি যে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়কদের জন্ম দিল সে ভূমি কয়েক বছর আগেও দুর্বৃত্তদের জন্মভূমি ও লালনভূমি রূপে পরিচিত ছিল। কারণ, সে আমলে আরব জনগণ সুচিন্তা থেকে নিবৃত ছিল। তাতে মৃত্যু ঘটেছিল তাদের বিবেকের। ফলে ব্যভিচার, দস্যুবৃত্তি, উলঙ্গতা বা নিজ কন্যার জীবন্ত দাফনেও সে বিবেকে দংশন হতো না। এমন বিবেকহীনদেরকে সুচিন্তায় অভ্যস্থ করে কুর’আন বস্তুত তাদের মৃত বিবেককেই জীবিত করেছিল। অভ্যস্থ করেছিল আমৃত্যু এ ভাবনায় ও প্রচেষ্ঠায় যে কি করে দিন দিন আরো সভ্যতর হওয়া যায়। এভাবেই শুরু হয়েছিল তাদের অবিরাম উপরে উঠার প্রক্রিয়া। এর ফলেই তাঁরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ও সভ্যতা গড়তে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু যখনই তারা চিন্তা-ভাবনা থেকে বিরত হয়েছে তখনই শুরু হয়েছে পতনের পথে যাত্রা। এবং সে যাত্রা আজও অব্যাহত রয়েছে।

বিকল বুদ্ধিবৃত্তির ইঞ্জিন

মগজই দেহের ইঞ্জিন। এটি রুগ্ন হলে দেহ বেহুশ হয়। তখন শক্তি হারায় হাত, পা ও দেহ। তেমনি জাতির মগজ হলো আলেম বা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। জাতির পতনের শুরু আলেমদের তথা বুদ্ধিজীবীদের পচন বা অসুস্থ্যতা থেকে। এজন্যই পতনশীল একটি জাতিকে দেখে অন্তত এটুকু সঠিকভাবেই বলা যায়, সে জাতির আলেমগণ বা বুদ্ধিজীবীগণ যথাযথ দায়িত্বপালন করেনি। এবং বুঝা যায়, তাদের নিজেদের শিক্ষিত হওয়ার কাজটি যথার্থ ভাবে হয়নি। বনি ইসরাইলের পতনের বড় কারণ ছিল তাদের আলেমগণ। মহান আল্লাহতায়ালা সুরা জুম্মা’তে তাদেরকে ভারবাহী গাধার সাথে তুলনা করেছেন। গাধা বই বহন করতে পারে কিন্তু সে বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে তারা ভাবতে পারেনা। সে ইহুদী আলেমদের অনুসারি কি মুসলিমদের মাঝে কম?

বুদ্ধিবৃত্তি বা ইলমচর্চা মানুষকে ব্যক্তিস্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র বিশ্বকে নিয়ে ভাবতে ও ত্যাগে উৎসাহিত করে। এগুণটি ছাড়া সমাজের বুকে উচ্চতর ও সভ্যতর বিবর্তন অসম্ভব। তখন জাতির কাঁধে ভর করে ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা ও হানাহানি। বিভক্তি ও অজ্ঞতার মধ্যেই আত্মবেদনা এবং সৃষ্টিশীলতার মাঝেই অনাবিল আনন্দ –সেই উপলব্ধিটিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ব্যক্তিকে ক্ষুদ্র স্বার্থ ও অজ্ঞতা থেকে দূরে রাখতে। তখন ব্যক্তির মনে জাগে দিন দিন মহত্তর ও প্রজ্ঞাবান হওয়ার প্রেরণা। ইবনে সীনা বা ফারাবীদের ন্যায় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠশীল মানবগণ এজন্যই কখনই কোন দুর্বৃত্ত শাসকের গোলামে পরিণত হননি। সেরূপ গোলাম হওয়াতে শৃঙ্খলিত হয় বিবেক। যে সমাজে চিন্তাশীল ও প্রজ্ঞাবান মানুষের অভাব- সে সমাজে স্বার্থশিকারী জীবদের সংখ্যাই অধিক। তখন বাড়ে দলে-বলে বাড়ে মিরজাফরগণ। এ কারণেই অতীতে ঔপনবেশিক বৃটিশের পক্ষে শাতিল আরবে বা অন্যান্য মুসলিম ভুমিতে মুসলিম নিধনে যুদ্ধ করা বা তাদের জাহাজে কয়লা ঢালার জন্য বাংলাদেশ থেকে ভাড়াটিয়া সৈন্য পেতে শত্রু বাহিনীর বেগ পেতে হয়নি। এমন কি সে গোলামদের খাতায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি ও জাতীয় বীরও নাম লেখিয়েছেন। একই কারণে আজও সেবাদাস পেতে অসুবিধা হচ্ছে না বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদীদের।

জনগণের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের মাঝে সজ্ঞানতা বৃদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তি। পানাহারে দেহের বল বাড়লেও তাতে মনের বল বাড়ে না। অথচ অন্যের গোলাম না হয়ে স্বাধীন ভাবে বাঁচার জন্য মনের বলই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দৈহিক বল অধিক থাকায় অনেকেই বাজার খোঁঝে অন্যের গোলাম হওয়ায়। বিশ্বে রাজনৈতিক বিপ্লব কম হয়নি, কিন্তু তাতে মানব জাতির সভ্যতর উত্তরণ ততটা হয়নি। রাজা বদল সহস্রবার হলেও এতে দুর্বল ও ভাগ্যাহতদের ভাগ্য বদলায়নি। অথচ মানব জাতির ইতিহাসের মোড় পাল্টে দেয় ইসলাম। কারণ জ্ঞানচর্চাকে ইসলাম জনগণের স্তরে নামিয়ে আনে। পেশাদারীর স্থলে এটিকে ফরজ ইবাদতে পরিণত করে। এতে বুদ্ধিবৃত্তি পরিণত হয় ব্যক্তির সার্বক্ষণিক অভ্যাসে। ফলে সুচিন্তায় তথা বুদ্ধিবৃত্তিতে অভ্যস্থ্য হয় কৃষক, শ্রমিক, তাঁতী, ব্যবসায়ীসহ সর্ব শ্রেণীর মানুষ। তখন পাঠশালায় পরিণত হয় সমগ্র দশ, প্রতিটি জনপদ ও প্রতিটি গৃহ। এর ফলে গর্জে উঠে ব্যক্তির মাঝে ঘুমিয়ে থাকা বিবেকের ইঞ্জিন। ফলে গতি পায় সমগ্র জাতি। এ কারণেই ইসলাম শুধু একটি জাতির ধর্মই পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে তাদের রুচিবোধ, মূল্যবোধ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি। কৃষক পরিণত হয়েছে বিচারক ও প্রশাসকে। ক্রীতদাস পরিণত হয়েছে সফল সেনাপতিতে। ভেড়ার রাখাল পরিণত হয় সফল গভর্নরে। সেদিন কয়েক লক্ষ আরবদের মাঝে সেদিন যে মাপের ও যে সংখ্যায় চিন্তানায়কের জন্ম হয়েছিল তা আজকের মুসলিম বিশ্বের প্রায় দেড় শত কোটি মুসলিমও জন্ম দিতে পারছে না। এ ব্যর্থতা মূলত তাদের শিক্ষাব্যবস্থার। কারণ এ শিক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে জীবনের মূল পাঠটি শেখাতে। ব্যর্থ হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিকে ইবাদতে পরিণত করতে। ফলে ব্যর্থ হচেছ ব্যক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন তথা বিবেককে চালিত করতে। বাংলাদেশ যেভাবে দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে সেটি নিরক্ষতার কারণে নয়। বরং কুশিক্ষা দানকারী শিক্ষানীতির কারণে। 

বিজয়ী শত্রুপক্ষ

মুসলিমগণ বুদ্ধিবৃত্তিকে পরিহার করেছে দীর্ঘকাল আগেই। সেটি প্রকট বাঙালী মুসলিমদের মাঝে। আক্বলের প্রয়োগ ছেড়ে নকলকে তারা ইলমচর্চা মনে করে। ফলে গুরুত্ব হারিয়েছে সৃষ্টিশীল জ্ঞানচর্চা। যে শিক্ষা শুধু মুখস্থ্য করতে শেখায় এবং ভাবতে শেখায় না -তাকে কি আদৌ শিক্ষা বলা যায়? ভাবতে শিখলে ব্যক্তি তখন নিজেই নিজের শিক্ষকে পরিণত হয়। মগজ তখন জ্ঞানের উৎপাদনে পাওয়ার হাউসে পরিণত হয়। সক্রেটিসের মত বিশ্বের বহু শিক্ষিত ব্যক্তিগণ তাই স্বশিক্ষিত। শিক্ষকের প্রকৃত কাজ হলো, কিভাবে শিখতে হয় এবং কি ভাবে ভাবতে হয় -সেটি শেখানো। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলিতে সে কাজ হয়না। কোন শিক্ষা নীতিই ভাল শিক্ষক ছাড়া চলেনা, যেমন ডাক্তার ছাড়া হাসপাতাল চলে না। বাংলাদেশে প্রকৃত অভাবটি ভাল শিক্ষকের। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ নিজেরাই ভাবতে ও শিখতে আগ্রহী নয়। ফলে ছাত্রদের তারা ভাবতে ও শিখতে আগ্রহী করবে কী করে? শিক্ষকগণ যে ভাবতে আগ্রহী নয় -সেটি বুঝা যায় বুদ্ধিবৃত্তি ও লেখালেখীর জগতে তাদের অনুপস্থিতি দেখে। উন্নত দেশের প্রফেসরগণ বিখ্যাত হন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর কারণে নয়, বরং জ্ঞানসমৃদ্ধ বই লেখার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ প্রফেসর কবরে যান একখানী বই না লিখেই।

বাংলাদেশের বিগত আটশত বছরের মুসলিম ইতিহাসে ইসলামের উপর যে কয়খানী বই লেখা হয়েছে তার শতকরা নিরানব্বই ভাগ সম্ভবতঃ লেখা হয়েছে বিগত ৫০ বছরে। প্রশ্ন হলো বাঁকি সাড়ে সাতশত বছর আমরা কি করেছি? এখনো যা হচ্ছে সেটিও কি আশাব্যঞ্জক? বুদ্ধিচর্চার ময়দানে সেক্যুলার পক্ষ তথা ইসলামের শত্রুপক্ষ এখনো  বিজয়ী। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগের লিখক সম্ভবতঃ তারাই। ইসলামপন্থীরা এদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েই দায়িত্ব সেরেছে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং এভাবে নিজেদের ভাবমূর্তিকে তারা বিনষ্ট করেছে। নিজেরা যে চিন্তাবিমুখ সেটিই তারা জনসম্মুখে প্রমানিত করেছে। ইসলামপন্থীদের দায়িত্ব ছিল, বিপক্ষের যুক্তিকে খন্ডন করে অন্ততঃ বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ইসলামকে বিজয়ী করা। এজন্য প্রয়োজন ছিল দুয়েক জন নয়, বহু হাজার উঁচু মাপের জ্ঞানী বা বুদ্ধিজীবীর। শত্রুপক্ষের জবাবে ইসলাম যা বলতে চায় তা সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলা। কিন্তু সে কাজ হয়নি। ফলে চেতনার রাজ্যে সুচিন্তার চাষাবাদ বাড়েনি, পবিত্র কুর’আন যা বলতে চায় বা যুক্তি দেখায় -সে গুলোকেও মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানো হয়নি। ফলে কুর’আন সবচেয়ে অধিক পঠিত কিতাব হওয়া সত্ত্বেও তাতে সমাজের অন্ধকার দুর হয়নি। অথচ ইসলামের আলো বিতরণের কাজে প্রতিটি মুসলিমই দায়বদ্ধ।

মহান আল্লাহতায়ার নাযিলকৃত সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ্য পবিত্র কুর’আনের সাথে যে জুলুম হয়েছে সম্ভবতঃ কোন কেচ্ছাকাহিনীর বইয়ের সাথেও তা হয়নি। কেচ্ছাকাহিনীর বই যাতে শিশুরা বুঝতে পারে -সে চেষ্টা করা হয়। ভিন্ন ভাষায় হলে সেটির অনুবাদ করা হয়। অথচ বাংলাদেশে সাত শত বছর ধরে কুর’আন পঠিত হয়েছে অনুবাদ ছাড়াই। জ্ঞানের সর্বোচ্চ উৎস্যের সাথে এমন কান্ডজ্ঞানহীন আচরন একমাত্র বিবেকের পঙ্গুত্বেই সম্ভব, সুস্থ্যতায় নয়। এ দীর্ঘকাল যাবত বুদ্ধিবৃত্তি এদেশটিতে যে কতটা গুরুত্বহীন ছিল -সেটি এ থেকেই বুঝা যায়। অনেকে বলেন, কুর’আন বুঝা নিছক আলেমদের কাজ। কথাটি অসত্য। সমগ্র কুর’আন ও হাদিসে এর স্বপক্ষে একটি প্রমাণও নেই। একজনের খাদ্য গ্রহণে আরেক জন বাঁচেনা। খেতে হয় সবাইকেই। তেমনি কুর’আন থেকে এক জনের জ্ঞানার্জনে অন্যের ঈমান পুষ্টি পায় না। জ্ঞানার্জনের ফরজও আদায় হয়না। ফলে তার জন্য মুসলিম থাকাই তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে। রোজ হাশরের বিচার দিনে কোন আলেম কারো পক্ষে দাঁড়াবে না। অজ্ঞ থাকায় যে মহাপাপ –সে পাপের জন্য সবাইকে নিজের হিসাব নিজে দিতে হবে। আহারের ন্যায় জ্ঞানার্জনের দায়িত্বও সবার। নবীজী (সা:)’র আমলে পবিত্র কুর’আন বুঝার চেষ্টা করেছেন ক্ষেত খামারের সাধারণ মানুষ। তাদের ইবাদত স্রেফ নামায-রোযায় সীমিত থাকেনি; জ্ঞানার্জন সেদিন ইবাদত রূপে গণ্য হয়েছিল। এবং জ্ঞানচর্চা সেদিন গণমুখীতা পেয়েছিল। ফলে ঘরে ঘরে সেদিন আলেম ও শহীদ সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, যে ভূমিতে জ্ঞানী পয়দা হয়, সেখানে শহীদও পয়দা হয়। তখন দ্বীনের বিজয় সে ভূমিতে অনিবার্য হয়। মদিনার ক্ষুদ জনপদে সেদিন যত মুজাহিদ ও মুজতাহিদ ফকিহর জন্ম হয়েছিল -বাংলাদেশে বিগত হাজার বছরে তার শত ভাগের এক ভাগও হয়নি। অথচ সে আমলে মদিনার জনসংখ্যা বাংলাদেশের আজকের একটি থানার সমানও ছিল না। এ থেকে বুঝা যায় জ্ঞানার্জন সেদিন কতটা প্রায়োরিটি পেয়েছিল। এবং এটিও বুঝা যায়, জ্ঞানার্জন কতটা গুরুত্ব হারিয়েছে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে।

বিভ্রাট ইলমচর্চা ও নেক আমল নিয়ে

অনেকে বলেন, মুসলিমদের সমস্যা ইলমে নয়, সেটি তাদের আমলে। তাদের বলেন, ইলমচর্চা যথেষ্ট হয়েছে এখন আমল প্রয়োজন। অথচ তারা ভূলে যান, আমল ইলমেরই ফসল। ব্যক্তির কদর্য আমল দেখেই বুঝা যায়, তার ইলমচর্চার কাজটাই হয়নি। গাছ ছাড়া যেমন ফল আশা করা যায় না, তেমনি ইলম ছাড়া আমলও আশা করা যায় না। ইলমের আগে আমলে পরিশুদ্ধি চাওয়া অনেকটা ঘোড়ার আগে আগে গাড়ি জোড়ার মত। আমলে সমস্যা সৃষ্টি হয় ইলমে সমস্যা থাকার কারণে। ইলম অর্থ সার্টিফিকেট লাভ নয়, কিছু বই পাঠও নয়। এটি হলো ব্যক্তির মনের গভীরে আল্লাহভীতি। সেটি তার আত্ম-উপলব্ধি, আত্ম-আবিস্কার ও আত্ম-পরিশুদ্ধির সামর্থ্য। একমাত্র এ সামর্থ্যটি অর্জনের পরই বিপ্লব আসে আমলে, এর পূর্বে নয়। কুর’আনের জ্ঞানের বড় অবদান হলো, এটি ব্যক্তির চিন্তাভাবনা ও বুাদ্ধিবৃত্তিকে প্রবল ভাবে সক্রিয় করে। চিন্তাশীল বিবেক তখন সৎকাজে প্রবল উৎসাহ পায়। সে জ্ঞান নিবৃত করে অন্যায় এবং অসৎ কাজ থেকে। সেটি না হলে বুঝতে হবে, কুর’আন তেলাওয়াত ও কুর’আন হিফযের কাজ যতই হোক, কুর’আনী জ্ঞানার্জনের কাজটি হয়নি।

ঔষধের নামে বিষপান সমাজে কম হয় না। তেমনি কম হয় না শিক্ষার নামে কুশিক্ষা এবং জ্ঞানের নামে অজ্ঞতার বিতরন। এজন্যই মাদ্রাসাতে নকল হয়, বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণে উৎসব হয়। হাজা, মজা, চড়াজাগা নদীতে যে সামান্য পানি থাকে -তাতে নৌকা চলে না, প্লাবনও আসে না। এমন কি সে সামান্য পানি দিয়ে চাষাবাদের কাজ চলে না। তেমনি বিষয়টি জ্ঞানের ক্ষেত্রেও। ব্যক্তির চরিত্র, চেতনা ও জীবনের মোড় পাল্টাতে চাই গভীরতর জ্ঞানের জোয়ার। কয়েক খানি বই পাঠে সেটি হয় না। কুর’আনী জ্ঞানে ব্যক্তিকে সমৃদ্ধ করার প্রয়োজনে নিয়মিত কুর’আন পাঠ এবং কুর’আন মুখস্থ্য করার উপর তাই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গভীর জ্ঞানেরই ফলেই আসে ব্যক্তির ঈমান, আমল ও চিন্তার মডেলে পরিবর্তন। যে কোন সমাজ বিপ্লবের জন্য এরূপ জ্ঞানের বিপ্লব শুধু জরুরি  নয়, অপরিহার্যও। না বুঝে তেলাওয়াতে জ্ঞানার্জনের সে কাজটি হয়না। সেটি সম্ভব হলে বাঙালী মুসলিমগণই হতো জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব পবিত্র কুর’আনের এতো তেলাওয়াত ও হিফয আর কোন দেশেই হয়না, যতটা হয় বাংলাদেশে।

সমস্যা হলো, অজ্ঞতাই যে আমাদের সকল দুরাবস্থার মূল কারণ -সেটির উপলব্ধি নিয়েও রয়েছে ব্যর্থতা। সঠিক পথের সন্ধান লাভের পর কোন সুস্থ্য ব্যক্তিই ভ্রান্ত পথে দৌঁড়ায় না। তেমন একটি পথে শত শত বছর চলার পরও যদি সাফল্য না আসে, তবে বুঝতে হবে পথটি সঠিক নয়। আমাদের ব্যর্থতাই প্রমান করে, আমরা চলেছি ভ্রান্ত পথে। এবং সঠিক পথটি আমাদের চেনাই হয়নি। জাহান্নামের আযাব এতোই কঠিন যে, সে আযাবের সামান্য জ্ঞান ও উপলব্ধিও ব্যক্তির জীবনে আমূল বিপ্লব আনতে বাধ্য। সে বিপ্লব না আসলে বুঝতে হবে, সে আযাবের জ্ঞানলাভই তার ঘটেনি। তার অজ্ঞতাটি তখন সুস্পষ্ট রূপে ধরা পড়ে। নবীজী (সা:) তাঁর ১৩ বছরের মক্কী জীবনে মুসলিমদের মাঝে পরকালের ভীতি তথা আখেরাতের জ্ঞানকেই মজবুত করেছিলেন। সে জ্ঞানের পিছনে ছিল কুর’আনের জ্ঞান। মক্কায় নাযিলকৃত সুরাগুলির আলোচ্য বিষয় হলো এগুলি। সে সময়ে মুসলিমদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন হয়েছে। কিন্তু সে নির্যাতন তাদের কুর’আনলব্ধ জ্ঞানকে আরো শানিত করেছিল। ধারালো করেছিল তাদের ঈমান ও উপলব্ধিকে।

বুদ্ধিবৃত্তিকে শানিত করে জিহাদমৃত্যুর মুখোমুখী দাঁড়িয়ে সত্যের সম্যক উপলব্ধির যে সামর্থ্য সৃষ্টি হয় -সেটি বক্তৃতায় বা ওয়াজে সৃষ্টি হয় না। ফলে মক্কায় যে কুর’আনী জ্ঞানের ভান্ডার গড়ে উঠেছিল সেটি আজও অতুলনীয়। মদিনার বুকে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল বস্তুত মক্কী আমলে অর্জিত জ্ঞানের সে শক্ত বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করেই। জ্ঞানের গভীরতম স্তরে পৌঁছার এ মারেফাত পীরের খানকাতে সৃষ্টি হয় না। ওয়াজের মাহফিলেও নয়। বাংলাদেশে যেরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে ওয়াজ বা ইজতেমা হয়, নবীজী (সা:)’র আমলে সেটি হয়নি। নবীজী (সা:) মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমায়েতে পবিত্র কুর’আনের আয়াত ভিত্তিক যে ওয়াজ দিতেন সেগুলিই জোগাতো তাঁর সাহাবাদের মাঝে আত্ম-উপলব্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তির সামর্থ্য। এটিই তো হলো বুদ্ধির প্রকৃত প্রয়োগ। ইসলামি পরিভাষায় এটিই হলো তাদাব্বুর, তাওয়াক্কুল ও তাফাক্কুর। অথচ বাংলাদেশে এটিরই মহা সংকট। দেশে মাদ্রাসা বাড়ছে, মসজিদও বাড়ছে। বাড়ছে নামাযীর সংখ্যাও। কিন্তু যা বাড়েনি বা বাড়ছে না -তা হলো তাদাব্বুর, তাওয়াক্কুল ও তাফাক্কুর। অর্থাৎ বাড়ছে না বুদ্ধিবৃত্তি তথা বিবেককে কাজে লাগানোর সামর্থ্য। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, বিচার ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণ জুড়ে যে বিবেকহীনতা -সেটিই প্রমান করে সমাজকে সভ্যতর করার কাজে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চেতনার রাজ্যে যেভাবে আগাছা বাড়ছে তাতেই প্রমানিত হয়, জ্ঞানের বীজ সেখানে যথার্থভাবে ছিটানোই হয়নি। অথচ একাজের দায়িত্বটি বিশেষ কোন নেতা বা দলের নয়, প্রতিটি মুসলিমের। কারণ, আল্লাহতায়ালার কাছে এজন্য সবাই দায়বদ্ধ। এ ব্যর্থতার জবাব সবাইকে আলাদা ভাবে দিতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে এভাবে পিছিয়ে থাকলে সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ যে অসম্ভব –সে হুশই বা ক’জনের? এতে ব্যর্থতাই যে দিন দিন গভীরতর হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? নানা রূপ ব্যর্থতার ইতিহাস গড়ে মুসলিম দেশগুলো কি সেটিই প্রমাণিত করছে না।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
Ads by coinserom