জবি: বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের দীর্ঘ পথচলা শেষে সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা। তবে দ্বিতীয় সমাবর্তনের জন্য নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁদের অনেকে। রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনাবাসিক হওয়ায় তাঁদের মেসভাড়া, খাবার ও যাতায়াতসহ দৈনন্দিন ব্যয় বহন করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সমাবর্তনের ফি অনেক শিক্ষার্থীর সামর্থ্যের বাইরে বলে মনে করছেন তারা। কেউ কেউ বলছেন, সমাবর্তনের ফি তাদের প্রায় এক মাসের খরচের সমান। ফলে অর্থাভাবে সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আগামী ২০২৭ সালের ৩০ জানুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে এ সমাবর্তন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। সমাবর্তনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা ও রেজিস্ট্রেশন ফি উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্নাতক (সম্মান), বিবিএ বা সমমানের ডিগ্রিধারী এবং ২০১৬-১৭ থেকে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্নাতকোত্তর, এমবিএ বা সমমানের ডিগ্রিধারীরা সমাবর্তনে অংশ নিতে পারবেন। এ ছাড়া এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী এবং প্রফেশনাল বা সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের যেসব শিক্ষার্থী বা গবেষক অন্তত একটি ডিগ্রি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেছেন, তাঁরাও নির্ধারিত শর্তে সমাবর্তনে অংশ নিতে পারবেন।
সমাবর্তনে অংশগ্রহণের জন্য স্নাতক (সম্মান), বিবিএ ও সমমানের ডিগ্রিধারীদের রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। এর সঙ্গে মূল সনদের জন্য দিতে হবে আরও ৫০০ টাকা। অন্যদিকে, স্নাতকোত্তর, এমএ, এমএসএস ও সমমানের ডিগ্রিধারীদের রেজিস্ট্রেশন ফি ছয় হাজার টাকা এবং মূল সনদ ফি ৫০০ টাকা।
এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ছয় হাজার ৫০০ টাকা এবং মূল সনদ ফি এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর মাস্টার্স পর্যায়ের প্রফেশনাল ও সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ফি আট হাজার টাকা এবং মূল সনদ ফি ৮০০ টাকা। ক্ষেত্রবিশেষে এর সঙ্গে সার্ভিস চার্জও যুক্ত হবে।
প্রথম সমাবর্তনের তুলনায় বেড়েছে ফি
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনের তুলনায় দ্বিতীয় সমাবর্তনে অংশগ্রহণের ফি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্রথম সমাবর্তনে স্নাতক ও বিবিএ ডিগ্রিধারীদের রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল তিন হাজার টাকা এবং মূল সনদ ফি ৪০০ টাকা। স্নাতকোত্তর ও এমবিএ ডিগ্রিধারীদের জন্য এ ফি ছিল যথাক্রমে চার হাজার ও ৪০০ টাকা। এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল চার হাজার ৫০০ টাকা এবং মূল সনদ ফি ৪০০ টাকা। সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল ছয় হাজার টাকা এবং মূল সনদ ফি ৮০০ টাকা। এর সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ও মূল সনদ ফির মোট অর্থের এক শতাংশ সার্ভিস চার্জ যুক্ত ছিল।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৫৩তম সমাবর্তনে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক চার্জসহ মোট ফি ছিল তিন হাজার ৩২০ টাকা। সেই হিসাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তনে স্নাতক পর্যায়ের রেজিস্ট্রেশন ও মূল সনদ ফি মিলিয়ে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ বেশি।
ফি বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক পোস্টের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন অনেকে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মুজাহিদ বিল্লাহ এক ব্যঙ্গাত্মক পোস্টে লেখেন, ‘মনে হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সমাবর্তনের খরচ এবার বেশি। সমাবর্তনের টুপির জাহাজ আটকে গেছে, তাই টাকা বেশি লাগবে।’
সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থী তাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘দ্বিতীয় সমাবর্তনের রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে আমার এক মাসের খরচ হয়ে যায়। এ টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করব, নাকি মেসের খরচ চালাব? অনার্স শেষ করার পরপরই সমাবর্তন পাচ্ছি। কিন্তু এতে অংশ নেওয়াটা বুঝি স্বপ্নই থেকে যাবে।’
ফি পুনর্বিবেচনার দাবি জকসুর জিএসের
সমাবর্তনের রেজিস্ট্রেশন ফি নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, ‘আমরা দফায় দফায় কথা বলেছি, আমাদের দাবিগুলো জানিয়েছি। এমনকি সরাসরি স্মারকলিপিও জমা দিয়েছি। তারপরও যদি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্ব না পায়, তাহলে আর কতবার, কতভাবে বললে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়গুলো আমলে নেবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে হবে, তাঁদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনায় নিতে হবে এবং সমাবর্তনের ফি শিক্ষার্থীবান্ধব পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ বিষয়টির সুরাহা অবশ্যই করতে হবে।’
ফি পুনর্বিবেচনায় সিন্ডিকেট ও সমাবর্তন কমিটির সঙ্গে আলোচনা করবে উপাচার্য
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমিও বুঝতে পারছি। সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটু কষ্টসাধ্য। তবে সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সিন্ডিকেট ও সমাবর্তন কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। তা ছাড়া আমরা সমাবর্তনের গাউন ও টুপি দিয়ে দেব। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেচনায় এটি খুব বেশি হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’