বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৪ পূর্বাহ্ন

সাংবাদিক আলিফ হত্যা: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কি তবে মৃত্যুফাঁদ?

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫৪ সময় দেখুন
সাংবাদিক আলিফ হত্যা: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কি তবে মৃত্যুফাঁদ?

কাজী মামুনুর রহমান মাহিম
সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশের কাজ নয়; অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য তুলে ধরার দায়িত্বও। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিককে প্রাণ হারাতে হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ড সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করেছে।

সম্প্রতি জাগো নিউজের ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আলিফ সীমান্ত এলাকায় মাদক, চোরাচালান এবং অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধান করতেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশে তিনি তথ্য সংগ্রহ করতেন। ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজে তিনি বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে তথ্য প্রকাশ করতেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আগে আলিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তাঁর অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু, আগের হামলার ঘটনা এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের তথ্যগুলো হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করাই জরুরি।

গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলনজিয়া এলাকায়, শ্যামগঞ্জ–বিরিশিরি সড়কের পাশে গুলিতে নিহত হন আলিফ। তিনি বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর শরীরে ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর আগে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।

একজন সাংবাদিকের ওপর আগের হামলার পরও তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, আলিফের ঘটনা তা নতুন করে সামনে এনেছে। জনস্বার্থে অপরাধ ও অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করা সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব। আর সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের ওপর সংঘটিত অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

আলিফের হত্যাকাণ্ডে তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা ও তাঁদের দুই সন্তান অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকা আমাদের মানবিক ও পেশাগত দায়িত্বের অংশ।

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ২১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এ মামলায় দুজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে চার দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। অন্যদিকে, আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে, তদন্তে সাতজনের নাম পাওয়া গেছে; তবে তদন্তের স্বার্থে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

তদন্তের এই অগ্রগতি যেন দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়ায় রূপ নেয়, সেটিই এখন প্রত্যাশা। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আলিফের ওপর আগের হামলার ঘটনাটিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তদন্তাধীন কাউকে আগাম অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে, প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।

সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি অনুসরণ, আলিফের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার থাকা প্রয়োজন। এই দাবি শুধু একজন সাংবাদিকের জন্য নয়; পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেন আর কোনো সাংবাদিককে প্রাণের ঝুঁকিতে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য।

প্রথম আলোর ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এ হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গণতান্ত্রিক সমাজে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং জনস্বার্থ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা নয়; মানুষের জানার অধিকার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশও সুরক্ষিত রাখা। সাংবাদিকের ওপর হামলা কিংবা হত্যার ঘটনায় কার্যকর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে দায়মুক্তির আশঙ্কা বাড়ে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানোর অন্যতম উপায় হলো তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা, তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং সাংবাদিকদের নিরাপদে কাজ করার পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যেন ভয় ও প্রাণহানির আশঙ্কায় থমকে না যায়, সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের।

সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যার বিচার চাই। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক:
কাজী মামুনুর রহমান মাহিম
সাংবাদিক, আইন ও নীতি বিশ্লেষক।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর