ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র। সংগঠনটির বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রায় সম্পন্ন। এখন কেবল শীর্ষ পর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এবারের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল। কারণ, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে শুধু একটি সহযোগী সংগঠন পরিচালনা করলেই হবে না; আগামী জাতীয় নির্বাচন, তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ততা এবং সারা দেশে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের দায়িত্বও তাদের কাঁধে পড়বে।
চার ধাপে যাচাই
দলীয় সূত্র বলছে, সম্ভাব্য নেতৃত্ব নির্ধারণে অন্তত চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা ও রাজনৈতিক ত্যাগ। দ্বিতীয়ত, ছাত্রত্ব ও সাংগঠনিক যোগ্যতা। তৃতীয়ত, জেলা, মহানগর ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা। চতুর্থত, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, দলীয় শৃঙ্খলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আচরণ এবং বিতর্কমুক্ত অবস্থান।
বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগের মতো শুধু সিনিয়রিটির ভিত্তিতে নয়; কে আগামী কয়েক বছর সংগঠনকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন, সেটিই সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।’
কেন বিলম্ব?
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, কমিটি দিতে দেরি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী থাকায় প্রত্যেকের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার পর যাতে সংগঠনে বিভক্তি তৈরি না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, কয়েকজন পদপ্রত্যাশীকে নিয়ে একাধিকবার মতামত নেওয়া হয়েছে। জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক ছাত্রনেতাদের কাছ থেকেও অনানুষ্ঠানিক মূল্যায়ন সংগ্রহ করা হয়েছে।
ছোট কিন্তু কার্যকর কমিটি?
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, এবারের কেন্দ্রীয় কমিটি তুলনামূলকভাবে কার্যকর ও কর্মমুখী করার চিন্তা রয়েছে। অতীতে বড় আকারের কমিটি থাকলেও বাস্তবে সক্রিয় নেতার সংখ্যা সীমিত ছিল। এবার দায়িত্বভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ত্যাগী ও মাঠে পরীক্ষিত নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ঐকমত্য রয়েছে।
পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ
কমিটি ঘোষণার আগমুহূর্তে পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতাও বেড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরা এবং নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন অনেকে। তবে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে— ব্যক্তিগত লবিংয়ের চেয়ে সাংগঠনিক মূল্যায়নই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
যেসব নাম আলোচনায়
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে তারা হলেন— আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, ইজ্জাজুল কবির রুয়েল, খোরশেদ আলম সোহেল, আমান উল্লাহ আমান, সাফি ইসলাম, ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, এইচ এম আবু জাফর, মমিনুল ইসলাম জিসান, শরীফ প্রধান শুভ, মোস্তাফিজুর রহমান শুভ, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত এবং গণেশ চন্দ্র রায় সাহস।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া। অর্থনীতির ছাত্র ইয়াহইয়া এর আগে কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি।
আলোচনায় থাকা আরেক নাম ইজ্জাজুল কবির রুয়েল। বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী রুয়েল এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ হিসেবে পরিচিত রুয়েল।
আলোচনায় আছেন বর্তমান কমিটির সহসভাপতি এইচএম আবু জাফর। তিনি ঢাবি ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম-আহবায়ক ও এসএম হলের সাবেক সদস্য সচিব। বর্তমান কমিটির যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদায় প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভও রয়েছেন আলোচনায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র শরীফ এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন।
বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানও সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন। সংগীত বিভাগের ছাত্র আমান এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসানও সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র জিসান এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।
সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়ালও আলোচনায় থাকা নেতাদের একজন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র আউয়াল এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তিনি বিগত আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহসের নামও আলোচনায় রয়েছে। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এ ছাড়াও আলোচনায় আছেন ঢাকা কলেজের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন ইশরাক। তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ও আসন্ন কমিটির সভাপতি প্রার্থী ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল সারাবাংলাকে বলেন, ‘কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমাদের বর্তমান কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই নতুন কমিটি গঠন করা হবে। ছাত্রদল সবসময়ই একটি গতিশীল সংগঠন। কমিটি গঠনও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ।’
বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ও আসছে কমিটির আরেক সভাপতি প্রার্থী মমিনুল ইসলাম জিসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের জন্য বিগত প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রাম লড়াইয়ের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। সৃজনশীল কাজ, কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, গ্রুপিংয়ের বাইরে গিয়ে সংগঠন ও কর্মীদের জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান রাখার চেষ্টা করেছি। জুলাই আন্দোলনে সব ফ্রন্টে সামনে থেকে লড়াই করেছি। সহযোদ্ধাদেরও নামিয়েছি রাজপথে। ছয়বার আটক হয়েছি পুলিশের হাতে।’
তিনি বলেন, ‘রিমান্ড, গুম, ছাত্রলীগ পুলিশের হামলার শিকার ১৭ বার। প্রায় দুই বছর কারাবন্দি ছিলাম। এত কিছুর পরও নেতৃত্বের বেলায় বিগত তিনটি কমিটিতে আমি চরম বঞ্চিত হয়েছি। এবার দলের চেয়ারম্যান শ্রদ্ধাভাজন তারেক রহমান আছেন। আমি আশা করি উনার কাছে প্রকৃত তথ্য রয়েছে। এবার ত্যাগ-তিতিক্ষার লড়াই সংগ্রামের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এমন খাঁটি সোনা খুঁজে নেবেন। আমি আমার সাংগঠনিক অভিভাবকের কাছে সভাপতি বা শীর্ষ পদের দায়িত্ব পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।’
বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ও আসন্ন কমিটির সভাপতি পদে আরেক প্রার্থী সাফি ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখ সাড়িতে ছিলাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও সব গ্রুপকে সঙ্গে নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর মানসিকতা রয়েছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার জন্য আমি সভাপতি হিসেবে এই পদের যোগ্য মনে করি।’
আরেক সভাপতি প্রার্থী এইচএম আবু জাফর সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত ১৬ বছরে ফ্যাসিস্ট হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে অগ্রভাগে থেকে অংশগ্রহণ করেছি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পেটোয়া বাহিনীর হামলায় আহত অবস্থায় আমাকে তুলে নিয়ে গুম করেছে। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব বিষয় বিবেচনা করবেন বলে বিশ্বাস রাখি।’
শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, চূড়ান্ত তালিকা এখন অনুমোদনের টেবিলে। শীর্ষ নেতৃত্বের সবুজ সংকেত মিললেই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদ ঘোষণা করা হবে।
তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত— এবারের কমিটি শুধু ছাত্রদলের আগামী দুই বছরের নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে না; বিএনপির আগামী দিনের তরুণ নেতৃত্ব গঠনের ভিত্তিও তৈরি করবে। তাই এবারের কমিটি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের আগ্রহ যেমন বেশি, তেমনি নীতিনির্ধারকদের সতর্কতাও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
উল্লেখ্য, বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত সংগঠনটির বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১ মার্চ গঠিত এ কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির।