রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০৯:৪৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

‘ওরা আমার বাচ্চাকে খুন করেছে’ নবজাতকের করুণ মৃত্যু বর্ণনায় মা

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময়: রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
  • ৩৯ সময় দেখুন
‘ওরা আমার বাচ্চাকে খুন করেছে’ নবজাতকের করুণ মৃত্যু বর্ণনায় মা


ঢাকা: ‘ওরা আমার বাচ্চাকে সবাই মিলে খুন করেছে।’ হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের অবহেলার কথা তুলে ধরে সারাবাংলাকে বলছিলেন জন্মের ১০ দিনের মাথায় নির্মমভাবে নিজের নবজাতক সন্তানকে হারানো মা আমাতুল মাকনুন। এমনকি ১০ দিন বয়সী সন্তানের হাত কেটে ফেলেও বাঁচাতে পারেননি সদ্য নাড়ি ছেঁড়া ধনকে।

আমাতুল মাকনুন বলেন, আমি একজন ভুক্তভোগী মা। গত ২৫ মে আমার একটা ফুটফুটে পুত্র সন্তান হয় সি-সেকশনে চট্টগ্রামের ‘সার্জিস্কোপ হাসপাতাল’-এ। কিন্ত বাচ্চার জন্মের সময় অক্সিজেন সমস‍্যা ও নিউমোনিয়া থাকার কারণে ওর লাইফ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। ওই হাসপাতালে লাইফ সাপোর্ট না থাকায় চট্টগ্রামের ‘শাজিনাজ হাসপাতাল’-এ নিয়ে যাওয়া হয়। যখন এই হাসপাতালে আনা হয় তখন বাচ্চার আর কোনো সমস‍্যা ছিল না। শাজিনাজ হাসপাতালের শিশু চিকিৎসক ডা. ফয়সাল আহমেদের তত্তাবধানে চিকিৎসা শুরু হয় আমার সন্তানের। কোরবানির ছুটিতে ওই চিকিৎসক ঢাকা যাওয়ায় ‘ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল’-এর শিশু চিকিৎসক ডা. আনোয়ার হোসেন এসে ওর চিকিৎসা চালিয়ে যান।

তিনি বলেন, প্রতিদিন দুইবার করে আমরা বাচ্চাকে দেখতে যেতাম, শুধু বিকেলে ভিজিটিং টাইমে দেখতে দিতো ১ থেকে ২ মিনিট। এর মধ‍্যে ওর অবস্থার উন্নতি হয়। ৫ম দিন আমাকে ডিউটি চিকিৎসক বলে ওকে এনআইসিইউ থেকে রিলিজ দিয়ে আমার সঙ্গে কেবিনে দিবে। ওইদিন আমি আমার বাচ্চার সঙ্গে অনুরোধ করে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় কাটিয়েছি। তখন হঠাৎ দেখলাম ওর বাম হাতে ব‍্যান্ডেজ করা। আমি জিজ্ঞেস করায় ডিউটি চিকিৎসক বলল কিছু না, নাথিং। পরেরদিন সকালে ডা. ফয়সাল আহমেদ ঢাকা থেকে আসায় আমাদের ডেকে বাচ্চাকে দেখালো যে, ওর বাম হাতের তলা পুরো কালো এবং ইনডেক্স ফিঙ্গার, রিঙ ফিঙ্গার কালো হয়ে গেছে, হাত গারো গোলাপি বর্ণের। আমি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিলাম, গতকাল দেখে গেলাম ভালো আজকে কেন এই অবস্থা। আমি বুঝে গিয়েছি কিছু ভুল করেছে, এটা স‍্যালুলাইড হয়ে গ‍্যাংগ্রিনের দিকে চলে যাচ্ছে। প্রথম থেকে এটা ডা. আনোয়ার বা ডিউটি চিকিৎসকদের দোষ। আমি যখন ডিউটি চিকিৎসকদের সঙ্গে রাগ করলাম ওরা উলটো আমাকে অনেক কাহিনী বুঝাচ্ছিলো। ওরা শুরুতে মানতে নারাজ, পরে ওরা ঠিকই স্বীকার করলো ওদের বিশাল বড় ক্রাইম হয়েছে।

রক্তনালী কেঁটে ফেলা হয়েছিল জানিয়ে মা আমাতুল মাকনুন বলেন, ওরা তখন বললো চট্টগ্রামে আমার বাচ্চার চিকিৎসা নাই, ঢাকা নিয়ে যান। আমরা সব ঠিক করে ফেললাম কিন্তু এরই মধ‍্যে চট্টগ্রামের আরও কিছু চিকিৎসক অন কলে এবং ‘পার্কভিউ হাসপাতালের’ ডা. মিনহাজকে (ভাসকুলার সার্জন) তারা ডাকালো এবং কিছু ট্রিটমেন্ট দিলো। তারা জানালো কিছুটা ভালোর দিকে, তখন কালো ভাবটা কিছুটা কমে যায়। এমনকি তারা বললো যে, তারাই পারবে এবং যেন আমরা ঢাকায় না যাই। ওইদিন আর গেলাম না। পরদিন দেখি বাচ্চার অবস্থা খারাপ, হাতের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তৎক্ষনাৎ ঢাকায় নিয়ে যাবো, এর আগে বললো ওর জার্নিটা ঠিকভাবে যাওয়ার জন‍্য একটু ওই জায়গা কেটে দিয়ে ছোট একটা সার্জারি করলে ও কম কষ্ট পাবে। তাতেও রাজী হয়ে আরেকজন পেডিয়াট্রিক সার্জারির ডা. আদনান ওয়ালিদকে তারা ডেকে অপারেশন করালো। তারপর আইসিইউ এম্বুলেন্সে করে সাড়ে ৩ ঘণ্টায় ঢাকায় গেলাম।

তিনি বলেন, পরে ইবনে সিনাতে ব‍্যান্ডেজ খোলার পর দেখলাম হাতের কব্জি পর্যন্ত গ‍্যাংগ্রিন, আর ওইটা থেকে পুরো বডিতে অনেকটায় ইনফিকটেড হয়েছে। ওর বডির ওরগ‍্যান কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। তারপর ইবনে সিনা হাসপাতাল বলল এই বাচ্চার রিস্ক নিবে না। পরে ঢাকায় এভারকেয়ার এ নিলাম। তারা বললো যেহেতু হাতটা গ‍্যাংগ্রিন হতে হতে উপরে উঠেছে তাই হাত কেটে ফেলে দিতে। এর মধ‍্যে ঢাকার কোনো ডাক্তার হসপিটাল বাদ রাখিনি, ওর চিকিৎসা কোথায় ভালো হবে খোঁজ নিতে। ওর বাঁচার চান্স ৫০-৫০, কিন্তু সঙ্গে এটাও বললো ‘শাজিনাজ হাসপাতাল’ যে অপারেশনটা করেছে, তাতে অনেক ভুল আছে। ‘শাজিনাজ হাসপাতাল’ ক্লিন করেনি এবং তারা চাইলেই ওখানে ফেইক স্কিন বসাতে পারতো। আর যেদিকে করার দরকার ছিলো ওদিকে অপারেশন করেনি, ৪ থেকে ৫টা রক্তনালী কেঁটে ফেলেছে।

নবজাতকের হাত কেটে ফেলা ও মৃত্যুর করুণ বর্ণনায় এই মা বলেন, আমরা এভারকেয়ারকে হাত কাটার পারমিশন দেই। এখানকার চিকিৎসকরা বলেই দিয়েছিলো ও অনেকটাই ইনফেকটেড। গত ৩ জুন এভারকেয়ারে আমার বাচ্চার অপারেশন হয়। ওর হাত ফেলে দেই। মন কে এই বলে বুঝ দেই ওইদিন যে, হাত ছাড়া না হয় আমার বাচ্চা বাচঁবে। কিন্তু পরেরদিন পুরো শরীরের কালার পরিবর্তন হয়ে গেলো, প্রেসার লো, পেট ও লিভার ফুলে গেলো এবং দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এ আমার নিষ্পাপ যোদ্ধা সন্তান মারা গেল।

হাসপাতাল ও চিকিৎসকের অবহেলা তুলে ধরে আমাতুল মাকনুন বলেন, ‘শাজিনাজ হাসপাতালে ডা. আনোয়ার হোসেন এবং ডিউটি চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে আমার বাচ্চা মারা গেলো। আমি জিজ্ঞেস করাতেও আমার সঙ্গে ওরা লুকোচুরি করেছে। শেষ দুইদিন ডা. আনোয়ার আসেনই নাই, দেখাও করেনি। আর যখন থেকে দেখেছে আমার বাচ্চার হাতে সমস‍্যা ওরা হাতের কোনো পরীক্ষা বা কোনো প্রকার টেস্টও করায়নি। এমনকি রিলিজের সময় ভুলভাল মনগড়া সামারি লিখে দেয়। অপারেশনটাও ভুল করেছে, যেটার কোনো লিখিত ব্রিফ ওরা করেনি। এতো কিছুর পরও ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি বিল নিয়েছে। ঈদের বন্ধে হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসকরা সবাই ছুটি কাটায়, জুনিয়ররা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হাসপাতালগুলো মানুষ খুন করে, নিষ্পাপ শিশুদের খুন করে। ঢাকার ইবনে সিনা ও এভারকেয়ার বারবার আমাদেরকে এটাই বলছিলো অনভিজ্ঞ মানুষ আর ভুল ট্রিটমেন্টে আমার বাচ্চার অবস্থা এমন হয়েছে। ওরা আমার বাচ্চাকে সবাই মিলে খুন করেছে। এই হাসপাতালে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং সব কিছুতে তাদের লুকোচুরি।

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানা এলাকায় বসবাসকারী এই মা আরও বলেন, আপনাদের বাচ্চা এভাবে ভুল চিকিৎসায় মারা গেলে কি করতেন? যে যুদ্ধ ওকে বাচাঁতে গিয়ে আমরা সবাই করেছি, তাতে করে বই লিখলেও হয়তো বইয়ের পাতা শেষ হবে না। এদিকে, সন্তান হত্যার বিচারের দাবি জানিয়েছেন আমাতুল মাকনুন।

অভিযোগের বিষয়ে ‘শাজিনাজ হাসপাতাল’ সারাবাংলাকে জানায়, শিশুটি গত ২৫ মে রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়। সে ছিল ৩৬ এর অধিক সপ্তাহের নবজাতক, যার জন্মের পর থেকেই শ্বাসকষ্ট ছিল এবং নিউমোনিয়া সন্দেহে এনআইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন ছিল। ভর্তির সময়ই শিশুটির ডান পায়ের তালুতে কাটা দাগ ও বাম হাতের উপরের অঙ্গে উল্লেখযোগ্য ফোলা বিদ্যমান ছিল, যা পূর্ববর্তী হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরের সময় থেকেই ছিল। ফোলাটি কাঁধ থেকে হাত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে ফোলাভাব ধীরে ধীরে কিছুটা কমলেও হাতের ফোলা উল্লেখযোগ্যভাবে থেকে যায় এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়।

ভর্তির পর হাসপাতালের প্রটোকল অনুযায়ী বাইরের ক্যানোলা (বাম হাতে) অপসারণ করা হয়। এরপর বাম হাতে আর কোন ক্যানোলা করা হয়নি এবং ডান হাত ও দুই পায়ে ক্যানুলা করে পরবর্তী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়। ভর্তির প্রথম দিন থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালু করা হয়। গত ৩০ মে হাত ফুলে লালচে ভাব হলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়। পরদিন সকালে হাতের ফোলা আরও বৃদ্ধি পায় এবং রক্ত সঞ্চালনের অবনতির লক্ষণ দেখা দেয়। সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরিবারকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত রাখা হয় এবং তাদের সম্মতি ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই চিকিৎসা এগিয়ে নেওয়া হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, রোগীর অবস্থা বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা-ভিত্তিক একটি উচ্চতর কেন্দ্রে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত রোগীর পরিবার ও চিকিৎসক দলের সম্মিলিত আলোচনার ভিত্তিতে হয়। কিন্তু রেফারকৃত হাসপাতালে না গিয়ে অন্য হাসপাতালে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থায় ৪ দিন পরে শিশুটির মৃত্যু ঘটে। পরবর্তী কেন্দ্রের চিকিৎসা সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল বিবরণ আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিকট উপলব্ধ নয়। আমরা গভীরভাবে দুঃখিত যে শিশুটিকে শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। রোগী আমাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিক নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা যথাসময়ে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ পেশাগত সতর্কতা, আন্তরিকতা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চিকিৎসা পরিচালনা করেছে।





Source link

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
Ads by coinserom