সাব্বির আলিম দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা):
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা পৌর এলাকার কণ্ঠশিল্পী ও শিক্ষীকা পুতুল (২২) ও তার পরিবার চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান শরীফ বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ, পরে পুলিশি আঁতাত ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তারা দাবি করেছেন, পুতুলকে মিথ্যা স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় ফাঁসিয়ে প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে গত সোমবার (৬ অক্টোবর) সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের ইউটিউব চ্যানেল ‘ফিফটিন মিনিটস’-এ প্রকাশিত ৩৩ মিনিটের এক ভিডিও প্রতিবেদনে জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান শরীফ ও তার ভাই টরিকসহ দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠে। ওই ভিডিওতে পুতুল নিজেই শরিফুজ্জামানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও প্রতারণার কথা উল্লেখ করেন।
ভিডিও প্রকাশের একদিন পরেই স্থানীয়রা বলছেন, পুতুলের বাড়িতে পুলিশের অভিযান ও স্বর্ণ মামলায় গ্রেফতারের ঘটনা রহস্যজনক। মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টায় দর্শনা থানা পুলিশ পুতুলকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। এ সময় পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় ঐ বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবার বলছে, তিনটি রুমের আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে, চাল-ডাল মাটিতে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে—এটি তারা রাজনৈতিক প্রভাব দেখানোর পরিকল্পিত হামলা হিসেবে দেখেন।
পুতুল অভিযোগ করেছেন, “শরিফুজ্জামান শরীফ দীর্ঘদিন ধরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক রেখেছেন। তার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় আমাকে নিয়ে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কের চেষ্টা করেন; আমি বাধা দিলে তিনি আমাকে ধর্ষণ করেন। আমি বিয়ের দাবি করলে তিনি হুমকি দেন। ২৩ সেপ্টেম্বর আমি চুয়াডাঙ্গা আদালতে মামলা করলে আদালত চত্বরে তার লোকজন এসে আমাদের ভয় দেখায় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়—শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় ফাঁসায়।”
পুতুল বর্তমানে দর্শনা গার্লস হাই স্কুল ও পূর্ব রামনগর বিদ্যালয়ে সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে কর্মরত এবং সম্প্রতি মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।
পুতুলের বড় ভাই মিতুল বলেন, “আমার বোন সত্য কথা বলেছে, তবুও আজ তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। শরিফুজ্জামান শরীফ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় পুলিশ তার কথানুযায়ী কাজ করছে।”
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ নভেম্বর দর্শনা সীমান্ত থেকে বিজিবি একটি নারীকে—জানা যায় নাম আসমা বেগম—তিনটি স্বর্ণের বারসহ আটক করে। পরে সে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন; তালিকায় পুতুলের নামও আছে। এ প্রেক্ষিতে পুলিশ পুতুলকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালতে প্রেরণ করে।
তবে পুতুলের পরিবার ও এলাকাবাসী দাবি করে, পুতুল শিক্ষকতা করেন এবং কখনোই স্বর্ণ চোরাচালান বা অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না; তাদের মতে, পুতুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক। একাধিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী বলেন, “পুতুল আমাদের এলাকায় গানের শিক্ষক; আমরা কখনো শুনিনি তিনি কোনো অবৈধ কাজে জড়িয়েছেন। হঠাৎ করে স্বর্ণ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহজনক।”
চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান শরীফের ব্যক্তিগত নম্বরে যোগাযোগের প্রচেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি।
দর্শনা থানার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শামসুল বলেন, “আমি মামলার তদন্তকারী। ভাঙচুরের অভিযোগ সত্য নয়। পুলিশ আইনগতভাবে পুতুলকে গ্রেফতার করেছে; গ্রেফতারের সময় কোনো সমস্যা হয়নি—সে (পুতুল) হাসিমুখেই আমাদের গাড়িতে উঠে থানায় এসেছে।”
দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদ মুহম্মদ তিতুমীর বলেছেন, “বিজিবির অভিযোগে চারজনের নাম ছিল। আসমা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে পুতুলসহ দুজনের নাম উল্লেখ করে। শরিফুজ্জামান শরীফের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা আমার জানা নেই।”
ঘটনাটি এখন চুয়াডাঙ্গাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসী বলছেন—পুলিশের ভূমিকা, রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা মিলিয়ে ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন, যেন কোনো নিরপরাধ মানুষ অন্যায়ের শিকার না হন।