দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্রে একজন বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকের অভিনয় করার সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলেছে। মাহবুব আলম, তাঁর কোরিয়ান ভক্তদের কাছে মাহবুব লি নামে পরিচিত, তিনি এখন দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র জগতের একটি বিখ্যাত মুখ। তার জীবন আমাদের জন্য অধ্যবসায় এবং কঠোর পরিশ্রমের উদাহরণস্বরূপ।
বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মাহবুব, ১৯৯৯ সালে চাকরির সন্ধানে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমানোর আগে নারায়ণগঞ্জের সরকারী তোলারাম কলেজের ছাত্র ছিলেন। মায়ের চিকিৎসার খরচ বহন করার জন্য তিনি দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমান। তিনি আরএমজি কারখানায় অভিবাসী শ্রমিক হিসাবে প্রথমে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি খুব বাজে কাজের পরিবেশ পূর্ণ একটি টেক্সটাইল কারখানায় নিযুক্ত ছিলেন। মাহবুব দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমিক সংঘে যোগদান করেন অভিবাসী শ্রমিকদের তাদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করার জন্য। তার মা তিনি কোরিয়া আসার সাত মাস পরেই মারা যান, কিন্তু মাহবুব তার ভাগ্য পরিবর্তন করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন। সহ কর্মীদের সাথে কর্মশালা এবং সামাজিক প্রচারে অংশ নিতে শুরু করেছিলেন। স্থানীয় পত্রিকাগুলো যখন সবকিছু উপেক্ষা করছিল, তখন মাহবুব বিষয়গুলি নিজের হাতে নেন।
প্রচারের ক্ষেত্রে এবং সারা দেশের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যে, মাহবুব দক্ষিণ কোরিয়ার আরএমজি কারখানাগুলির অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি তুলে ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা শুরু করেছিলেন। এই ডকুমেন্টারিগুলি দক্ষিণ কোরিয়ার অনেকগুলি জাতীয় টেলিভিশন স্টেশনগুলিতে প্রচারিত হয়েছিল। ২০০৪ সালে, মাহবুব নিজে এবং ১০ জন অভিবাসী শ্রমিকের উদ্যোগে দক্ষিণ কোরিয়ায় “অভিবাসী শ্রমিকের টেলিভিশন” নামক একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন শুরু করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারা ২০০৬ সালে একটি চলচ্চিত্র উৎসবেরও আয়োজন করেন, মাহবুব সেই উৎসবের পরিচালক হিসাবে কাজ করেছিলেন।
মাহবুব শর্টফিল্ম “দ্য রোড অফ রিভেঞ্জ” এর মাধ্যমে তার অভিনয়ের সূচনা করেছিলেন এবং দ্রুত তার প্রথম ফিচার ফিল্ম “বান্ধবী” এর প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন করেন।
“বান্ধবী” ২০০৯ সালে রিলিজ হওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার একটি চলচ্চিত্র যা শিন ডং–ইল পরিচালিত । এটি একটি হতাশাগ্রস্ত ও বিদ্রোহী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সম্পর্কে, যে বাংলাদেশ থেকে আসা একজন অভিবাসী শ্রমিকের সাথে বন্ধুত্ব করে, যিনি তার বকেয়া বেতন ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলেন। “ বান্ধবী ” মাত্র তিন কোটি টাকার বাজেটে নির্মিত হয়েছিল। এই ছবিতে অভিবাসী শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয় চিত্রিত হয়েছে। বিবিসির একটি সাক্ষাৎকার অনুসারে, মাহবুব ‘ বান্ধবী ‘তে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করতে ১.৫ মাসের মধ্যে ১৩ কেজি ওজন কমিয়েছিলেন।
মাহবুব দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের পূর্বে একটি কঠিন সময় কাটাচ্ছিলেন। জীবনে সফলতা অর্জনের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষার কারণে এই অভিনেতা, অভিবাসী কর্মী হয়েও সম্মানিত অভিনেতা হয়ে উঠেছেন। মাহবুব এখন দক্ষিণ কোরিয়ার একজন সুপরিচিত অভিনেতা। তিনি “মাই ফ্রেন্ড এন্ড হিজ ওয়াইফ,” “হোয়ার ইজ রনি,” “দ্যা সিটি অফ ক্রেন,” “পেইনড,” “ইউ আর মাই ভ্যাম্পায়ার,” “পারফেক্ট প্রোপোজাল,” এবং “আসুরা: সিটি অফ ম্যাডনেস” এর মতো ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। তিনি বেশ কয়েকটি টিভি শো এবং বিজ্ঞাপনেও অভিনয় করেছেন। ৪০ বছর বয়সী এই অভিনেতা দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি চিত্তাকর্ষক ক্যারিয়ার তৈরি করেছেন, ১৫ টি ছবি, টিভি নাটক এবং বিজ্ঞাপনে উপস্থিত হয়েছেন। মাহবুব দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদন ও বিতরণকারী সংস্থা “এম ও এম ইন্টারন্যাশনালের” সিইও হিসেবে রয়েছেন। এছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়ায় তিনি “বাংলাদেশ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের” পরিচালক।
মাহাবুব দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকাকালীন বর্ণবাদের শিকার হন, “বান্ধবী” ছবিতে অভিনয়ের কারণে অনেক কোরিয়ান তাকে ফোন করে হত্যার হুমকিও দেয়। বর্ণবাদের কারণে অনেক পুরস্কার জেতার পরেও তিনি খুব কম কোরিয়ান ছবিতেই অভিনয় করার ডাক পান। একজন অভিনেতা হিসেবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং তার উদ্দেশ্যগুলি সফল করার জন্য তিনি নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
এরকম আরো অনুপ্রেরণামূলক ব্লগ পড়তে চাইলে, এখানে ক্লিক করুন।
Writer
Aqib Adnan Shafin
Content Writing Intern
YSSE.