ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের একবছর পূর্ণ হয়েছে ৯ সেপ্টেম্বর। গত ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ২৮টির মধ্যে ২৩টি পদে জয় পায়। প্যানেলটির ভিপি হিসেবে সাদিক কায়েম এবং জিএস হিসেবে এস এম ফরহাদসহ দায়িত্ব নেন অন্যান্যরা।
নির্বাচনের আগে ‘১২ মাসে ৩৬ সংস্কার’ স্লোগানে আবাসন, খাদ্যের মান ও নিরাপত্তাসহ শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে একবছর পর এসব প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সহযোগিতা ও ডাকসু নেতাদের কর্মকাণ্ড ঘিরে ক্যাম্পাস জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ইশতেহার ও বাস্তবতার চিত্র
ইশতেহারে ঘোষিত ৩৬টি সংস্কারের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হলেও দৈনন্দিন মৌলিক সংকটগুলোর বড় অংশ এখনো রয়ে গেছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
আবাসন সংকট: প্রথম বর্ষ থেকে বৈধ সিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রথমবর্ষে ভর্তির পর অনেক শিক্ষার্থীকে এখনো হলের বাইরে বাধ্য হয়ে বেশি খরচে থাকতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হল প্রশাসনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, হলটির ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ৮৪ জন, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ৯১ জন এবং ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ১৪১ জন অস্বচ্ছল শিক্ষার্থী হলে সিট প্রাপ্তির শর্ত পূরণ করলেও তাদের সিট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সংকট দূরীকরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের বরাদ্দের বাইরে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার বড় একটি উন্নয়ন প্রকল্প যুক্ত করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ আবাসন সংকট দূর হবে।’
হলের খাদ্যের মান: বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও ক্যাফেটেরিয়ায় স্বাস্থ্যকর খাবারের মান নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। সম্প্রতি কয়েকটি হলে খাবারের নিম্নমানের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
জিএস ফরহাদ জানান, ফুড সেফটি অথরিটি দিয়ে হলগুলোতে খাবার পরীক্ষা করতে প্রতিবার প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়, যা নিয়মিত করতে প্রশাসনিক বাধা রয়েছে। আর মেস সিস্টেমের কারণে ‘মিল ভাউচার’ চালু করা সম্ভব হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা: বহিরাগত, মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের উপদ্রব এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে চলাচলে ভয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েই গেছে।
এ ছাড়া ছাত্রী হলে প্রবেশের সময়সীমা এক ঘণ্টা বাড়ানো, মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর, ভর্তিপ্রক্রিয়ায় অনলাইন পেমেন্ট, কমনরুম সংস্কার ও মেডিক্যাল সেন্টারের কিছুটা আধুনিকায়ন হলেও অনাবাসিক ছাত্রীদের প্রবেশাধিকার ও ‘গার্ডিয়ান লাউঞ্জ’ চালুর প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।
প্রশাসন ও ডাকসুর পালটা-পালটি অভিযোগ
ইশতেহার বাস্তবায়ন পুরোপুরি না হওয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতাকে দায়ী করেছেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ। সাদিক কায়েম সারাবাংলাকে বলেন, ‘বরাদ্দ নয়, শুধু অনুমতির ক্ষেত্রেও অনেক সময় সহযোগিতা মেলেনি।’
তবে এ অভিযোগ নাকচ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে জানান, খাবারের মানোন্নয়নে পুষ্টিবিদদের দিয়ে কমিটি করা হয়েছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত চালু করা হবে। অন্যদিকে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, ডাকসুর জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে বেশি অর্থই দেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে বিতর্ক: জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল, মারামারি ও সিট দখলের সংস্কৃতি বন্ধ রয়েছে। তবে ভোটের আগে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি দূর করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরবর্তী সময়ে স্বয়ং ভিপি সাদিক কায়েম, জি এস এস এম ফরহাদ, এজিএস মহিউদ্দিন খানসহ বিভিন্ন নেতারা জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেয়। এর বাইরেই নানা বিতর্কিত কার্যক্রমে অংশ নেওয়ায় সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া, সাদিক কায়েম নিজেই আগামী মেয়র নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থী ঘোষিত হয়েছেন। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে রয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। এর বাইরে উচ্ছেদ অভিযান, বিরোধী মতের শিক্ষকদের হেনস্তা, ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমার মাঠে শিশুদের কানে ধরিয়ে সাজা দেওয়া, সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়েরের হিজড়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়ানোসহ বিভিন্ন ‘মব কালচারের’ ঘটনায় ডাকসু নেতাদের জড়িয়ে পড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধি ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীবান্ধব কিছু পদক্ষেপে প্রশংসিত ডাকসু
প্রতিশ্রুতির শতভাগ বাস্তবায়ন না হলেও একবছরে একগুচ্ছ প্রশংসনীয় ও শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নজর কেড়েছে ডাকসু। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর, বিভিন্ন হলে নিয়মিত বিনামূল্যে হাইজিন প্রোডাক্ট সরবরাহ, বাসে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন শিক্ষার্থী বান্ধব কর্মসূচির পদক্ষেপগুলো বেশ প্রশংসিত হয়েছে।
এর বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ভর্তিপ্রক্রিয়ায় অনলাইন পেমেন্ট চালু, কমনরুম সংস্কার, বাসের ট্রিপ সংখ্যা বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ এবং সর্বশেষ শিক্ষক মূল্যায়নের অনলাইন ওয়েবসাইট তৈরির উদ্যোগ ক্যাম্পাসে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট সামি’ আয়োজন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে নতুন ডিজিটাল রিসোর্স সংযোজনে ডাকসুর ভূমিকা সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে।
পরবর্তী নির্বাচন ঘিরে নেই আলোচনা
বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ চলতি মাসের ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হচ্ছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে বর্তমান কমিটি সর্বোচ্চ ৯০ দিন বহাল থাকবে, যার পর সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী সারাবাংলাকে বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত ডাকসুর পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।’ এমনকি ঢাবি উপাচার্য ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামও সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন আয়োজন হওয়া উচিত। এ নির্বাচন হতেই হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুই কর্ণধার এমন আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বাস্তবে এর কোনো চিহ্ন নেই। আর বর্তমান ডাকসু একবছর পার করলেও নির্বাচন আয়োজনে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।