নিজস্ব প্রতিবেদক : নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেছেন, দুর্নীতি একটি ক্যানসার, দুর্নীতির বিষয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ নয়। রোববার (২ জানুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, দুর্নীতি যেই করুক আমার কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। আঙুলে ক্যানসার হলে যেমন কেটে ফেলতে হয়, দুর্নীতিও তেমনি। এ সময় তিনি মামলাজট কমানো, বিচার বিভাগ থেকে দুর্নীতি দূর করা, বার ও বেঞ্চের মধ্যে সমন্বয়ে কাজ করার কথা বলেন।
নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল ছাড়াও বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলও বক্তব্য রাখেন।
উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীকে দেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এরপরের দিন ৩১ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় বঙ্গভবনে হাসান ফয়েজকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি। নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ৩০ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগের বিচারক হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছেন। তার নিয়োগ শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে কার্যকর হবে।
এর আগে দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়েছিলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। ৪৭ মাস প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন শেষে কাল ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যান তিনি। সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের স্থলাভিষিক্ত হলেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তিনি হচ্ছেন দেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি।
বিদায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হলো ৩১ ডিসেম্বর। সে হিসেবে বছরের শেষ দিনে অবসরে যান ২২তম প্রধান বিচারপতি। ৩১ ডিসেম্বর শুক্রবার হওয়ায় ৩০ ডিসেম্বর ছিল তার শেষ কর্মদিবস।
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং প্রধান বিচারপতির সহিত পরামর্শ করিয়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগ করিবেন।’
বর্তমানে আপিল বিভাগে পাঁচ বিচারপতির মধ্যে সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অবসরে যাওয়ায় আপিল বিভাগে রয়েছেন বিচারপতি ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এর মধ্যে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিলেন রাষ্ট্রপতি।
উল্লেখ্য, আবদুর গফুর মোল্লা ও নূরজাহান বেগম দম্পতির সন্তান হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর জন্ম ১৯৫৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার রমানাথপুর গ্রামে। তিনি ১৯৭২ সালে কুষ্টিয়া জেলার খোকসা জানিপুর পাইলট হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ১৯৭৪ সালে সাতক্ষীরার সরকারি পিসি কলেজ থেকে। এরপর বিএ পাস করেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে। তিনি এমএ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। এলএলবি পাস করেন ধানমন্ডি ল’ কলেজ থেকে।
হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আইনজীবী হিসেবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত হন ১৯৮১ সালে। জেলা আদালতে প্র্যাকটিস শুরু করেন ১৯৮১ সালের ২১ আগস্ট। ১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের সনদ লাভ করেন। আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ১৯৯৯ সালের ২৭ মে।
হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ২০০১ সালে হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০৯ সালের ২৫ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে এবং ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। বিচারপতি হিসেবে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। এছাড়াও তিনি সৌদি আরব সফর করেছেন।
তার বড় ভাই বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি থেকে অবসরে গিয়েছেন। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ইতিহাসে প্রথম দুই ভাই সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগে আসীনের নজির স্থাপন করেছেন।